রাজস্ব আদায় বাজেট অর্থায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হতে পারে
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) জন্য বাজেট প্রণয়নের কাজ বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটের সার্বিক আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাজেট অর্থায়নের জন্য সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে।
আগামী অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রণীত হতে যাচ্ছে, তাতে অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বাজেটে বড় আকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ (এনবিআর) কর্তৃপক্ষকে বেশকিছু দিকনির্দেশেনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর করের হার না বাড়িয়ে, বরং করের আওতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। একইসঙ্গে আগামী বাজেট যাতে ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব এবং কর্মসংস্থানমূলক হয়, সেদিকে লক্ষ রাখার জন্য তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। এনবিআর চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) বছরের তুলনায় উচ্চাভিলাষী মনে হলেও তা অর্জন করা সম্ভব হবে, যদি আমরা এনবিআরের প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন করতে পারি। অটোমেশন ও ইন্টিগ্রেশনের বিষয়ে তিনি বলেন, বিআরটিএ, বিদ্যুৎ বিভাগ ও ডিপিডিসির মতো সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ডেটাবেজের সঙ্গে এনবিআরের সিস্টেমের পূর্ণ সমন্বয় সাধন করা হচ্ছে। এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেন, দেশে এক কোটিরও বেশি টিআইএনধারী থাকলেও তাদের মধ্যে নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন অর্ধেকেরও কম। এ গ্যাপ কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ইন-ফর্মাল সেক্টরে যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোকে করের আওতায় নিয়ে আসা হবে। কর ফাঁকি দেওয়ার সব ধরনের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বাজেট অর্থায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধক হচ্ছে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করতে না পারা। প্রতিবছর বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, বছর শেষে তা অর্জিত হয় না। এজন্য কাউকেই জবাবদিহি করতে হয় না। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বা হার খুবই কম। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের পুরো সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ গত অর্থবছরের পুরো সময়ের ঘাটতিকে ছাড়িয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সব মিলিয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা; আর সংস্থাটি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জন্য সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্যপূরণ হবে না বলেই মনে হচ্ছে। এজন্য নানাবিধ কারণ দায়ী। প্রথমত, গত দেড় বছর ধরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। এমনকি আমদানি-রপ্তানির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এসব খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ কমে গেছে। বেশকিছু বৃহৎ শিল্প-কারখানার মালিক দুর্নীতি এবং অন্যান্য অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে আছেন অথবা দেশের বাইরে চলে গেছেন। তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক গতিতে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। লার্জ ট্যাক্স ইউনিট (এলটিইউ) থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব আসছে না। টিআইএনভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে ট্যাক্স প্রদান করে না। দেশে টিআইএনধরীর সংখ্যা ১ কোটিরও বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই জিরো রিটার্ন দাখিল করেছে। বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ টিআইএন সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন; কিন্তু কাজ শেষ হয়ে গেলে তারা আর রিটার্ন দাখিল করেন না। গত বছর এনবিআরের কর্মকর্তারা আন্দোলন করেছেন। সেই সময় ট্যাক্স আদায় নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানিগুলো যখন ভালো চলে, তখন সেখান থেকে ভালো পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংক খাত ভালো চলছে না। অধিকাংশ ব্যাংক মুনাফা অর্জন করতে পারছে না। ফলে এ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ কমে গেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৭ শতাংশের মতো। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এটা সর্বনিম্ন ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও। এমনকি বিশ্বে যেসব দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। ক্রমশ এটা কমে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও অত্যন্ত কম। এটা যে কোনো বিচারেই উদ্বেগজনক। আমাদের যে কোনো মূল্যেই হোক, ট্যাক্স আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে। উল্লেখ্য, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো না গেলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সমস্যা সৃষ্টি হয়। সেই অবস্থায় উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হয়। আর তা সম্ভব না হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্র থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হয়। সরকার যদি ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক যদি নতুন টাকা ছেপে সরকারের অর্থ চাহিদা পূরণ করে, তাহলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা রোধ করা। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। বিশেষ করে সংস্থাটি ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সৃষ্ট যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে বলে মনে করছে। তবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করছেন, মূল্যস্ফীতির হার আগামী জুন মাস নাগাদ ডাবল ডিজিট অতিক্রম করে যেতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, এনবিআর সংস্কারের উদ্যোগের কারণে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় কমে গেছে। এটা আসলে ঠিক নয়; কারণ এনবিআর সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও রাজস্ব আদায়ে উদ্যোগ চলমান ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিল। তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনিয়োগ করেননি। ফলে রাজস্ব আদায় কমেছে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ট্যাক্সের হার না বাড়িয়ে ট্যাক্স নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে। এটাই সঠিক পন্থা বলে আমি মনে করি। আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ট্যাক্সের হার না বাড়িয়ে ট্যাক্স নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার চেষ্টা করেছিলাম। ট্যাক্স নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার একটি উপায় হচ্ছে ট্যাক্স প্রদানের যোগ্য, কিন্তু ট্যাক্স নেটওয়ার্কের মধ্যে আসেনি, তাদের দ্রুত ট্যাক্স নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসা। আমাদের দেশে অনানুষ্ঠানিক খাতে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা ট্যাক্স প্রদানের সামর্থ্য রাখেন, কিন্তু এখনো ট্যাক্স প্রদান করছেন না। এদের ট্যাক্স নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। থানা বা উপজেলা পর্যায়ে গেলে ছোট-বড় অনেক দোকানপাট দেখতে পাবেন। এদের আয় কিন্তু শহরের চেয়েও বেশি, কিন্তু তারা সরকারকে কোনো ট্যাক্স প্রদান করে না। আগামী অর্থবছরে অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকা এসব প্রতিষ্ঠান ট্যাক্স নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এটা করা গেলে নিশ্চিতভাবেই ট্যাক্স আদায়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। আমাদের দেশে যে ভ্যাট আরোপিত হয়, তা সঠিকভাবে আদায় হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায়কারী কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নেয়। যারা ভ্যাটদাতা তাদের মধ্যেও অসতর্কতা লক্ষ করা যায়। তারা ভ্যাট দিলেও যথাযথভাবে রসিদ গ্রহণ করেন না। ফলে আদায়কৃত ভ্যাট সরকারি কোষাগারে সঠিকভাবে জমা পড়ে না।
আমরা যখন এনবিআরকে ভাগ করার উদ্যোগ নিলাম, তখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। তারা মনে করেন, এনবিআর ভাগ করা হলে অনেকেই চাকরি হারাবে। এনবিআরের একশ্রেণির কর্মকর্তা তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কায় আন্দোলনে নামে। অর্থনীতির সূত্র মোতাবেক যারা ট্যাক্স পরিমাণ নির্ধারণ করে, তারা আদায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না। ঠিক একইভাবে যারা ট্যাক্স আদায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, তারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা পালন করবেন না। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই এ রীতি অনুসরণ করা হয়। আমাদের এখানে যিনি রাজস্বের হার নির্ধারণ করেন, তিনিই আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং পাকিস্তানেও ট্যাক্সে পরিমাণ বা হার নির্ধারণ করে এক দপ্তর। আর আদায়ের দায়িত্ব পালন করে অন্য দপ্তর। আমাদের এখানেও এমনটাই হওয়া উচিত। (অনুলিখন : এম এ খালেক)
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : গত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা; বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
