জলবায়ু পরিবর্তন : বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
ড. গোলাম মোস্তফা ও শাকিলুর জামান
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয় ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’। জলবায়ু পরিবর্তনসহ পরিবেশগত নানা সংকট মোকাবিলা এবং এ বিষয়ে বৈশ্বিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৭৩ সাল থেকে নিয়মিত এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। সে লক্ষ্যে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘Inspired by Nature. For Climate. For Our Future.’
জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান সময়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী বাস্তুতন্ত্র, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অন্যতম। বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত এবং অসংখ্য নদীতে বেষ্টিত হওয়ায় বাংলাদেশ বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং বিরূপ তাপমাত্রার মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ০.৫ শতাংশেরও কম হলেও দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের অসম বোঝা বহন করছে। বিশ্বব্যাংকের এক পূর্বাভাস অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির ৯ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রভাব হলো গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার ধরনে অনিয়ম। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা প্রায় ০.৫-১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়তে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি কৃষি, মানবস্বাস্থ্য, পানিসম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ ও তাপজনিত চাপের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১.৩-১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব হলো বন্যা। বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ অঞ্চল বন্যাপ্রবণ সমভূমি, যা দেশটিকে স্বাভাবিকভাবেই বন্যার ঝুঁকিতে ফেলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন বৃষ্টিপাতের অনিয়ম বৃদ্ধি করছে এবং অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়িয়ে তুলছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মারাত্মক বন্যা দেখা দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসও বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো প্রায়ই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে, যা লাখো মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। অধিক শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি প্রবেশের ঝুঁকিও বৃদ্ধি করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বাড়লে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি প্লাবিত হতে পারে; যার ফলে প্রায় ২-৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলে ইতোমধ্যে মাটি এবং মিঠা পানির উৎসে লবণাক্ততা বাড়ছে। লবণাক্ততার বিস্তার কৃষি উৎপাদন, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত কৃষি, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, লবণাক্ততার বিস্তার এবং বন্যা সরাসরি ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের সঠিক সমাধান করা না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে সামগ্রিক বৈশ্বিক শস্যের ফলন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। এ ছাড়া ভারতের এক গবেষণায় দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ধান উৎপাদন ১৫ শতাংশ এবং গম উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। জলবায়ু পরিবর্তন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও প্রভাব ফেলছে। দেশে প্রায় ৩.৫-৪ কোটি মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে, যারা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততার ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিবেশগত অবক্ষয়, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় এবং বন্যার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ তাদের বসতভিটা ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। গবেষণা বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ২ কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। এ অভ্যন্তরীণ অভিবাসন শহরাঞ্চলের জনজীবন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এসব প্রভাব কমাতে বাংলাদেশ বিভিন্ন প্রশমন ও অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়ালে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে গ্রামীণ এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা আরও ত্বরান্বিত করা দরকার। এক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প এবং শহরাঞ্চলে রাস্তার বাতি জ্বালাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। তাছাড়া বর্তমানে লোডশেডিংয়ের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে আইপিএসের ব্যবহার অনেকাংশে বেড়েছে। এ অবস্থায় আইপিএসের বিকল্প হিসাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ আইপিএসের ক্ষেত্রে ১০-১৫ শতাংশ বিদ্যুতের অপচয় ঘটে, যা জাতীয় গ্রিডে বাড়তি চাপ ফেলে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির আরেকটি অন্যতম উৎস হলো বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। গবাদিপশু ও পোলটি খামারের বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োগ্যাস উৎপাদন করা হলে একদিকে যেমন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমবে, তেমনি আবর্জনা পচে সৃষ্ট গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণও হ্রাস পাবে। তাছাড়া বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট থেকে উৎকৃষ্ট মানের জৈব সারও পাওয়া যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বনায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশমন কৌশল। গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং গ্রিনহাউজ গ্যাসের ঘনত্ব কমাতে সহায়তা করে। বনভূমি বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান বন সংরক্ষণ জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পরিবেশগত অবক্ষয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উপকূলীয় বনায়ন কর্মসূচি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমাতেও সহায়ক। জলবায়ু সহনশীল কৃষি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। খরা সহনশীল, বন্যা সহনশীল এবং লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন কৃষকদের পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে। এ ছাড়া টেকসই সেচব্যবস্থা এবং উন্নত কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা দরকার। বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রস্তুতি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন করেছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং কমিউনিটিভিত্তিক দুর্যোগব্যবস্থাপনা কার্যক্রম অতীতের তুলনায় দুর্যোগজনিত মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। তথাপি জলবায়ু ঝুঁকি বাড়তে থাকায় এসব ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসাবে বাংলাদেশ জলবায়ু নীতিতে ন্যায্যতা, অভিযোজন তহবিল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহায়তার দাবিতে COP সম্মেলনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ Climate Vulnerable Forum (CVF)-এর মতো আন্তর্জাতিক ফোরামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং টেকসই কৌশল উন্নয়নে সহায়তা করছে; কিন্তু অপর্যাপ্ত জলবায়ু তহবিল, কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকির কঠিন বাস্তবতা দেশের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু সহনশীলতা এবং অভিযোজন কৌশল অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার, জলবায়ু তহবিল বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কূটনৈতিক ও আমলাতাত্রিক সমস্যা নিরসন এবং কার্যকর ও টেকসই নীতি বাস্তবায়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে সামান্য অবদান থাকা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, বনায়ন, দুর্যোগ প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক ফোরামে সক্রিয় অবস্থান এবং কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে পারে। একটি টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়তে সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, এনজিও এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
প্রফেসর ড. গোলাম মোস্তফা : পরিচালক, পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
শাকিলুর জামান : সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা প্রেষণ, মাউশি; পিএইচডি গবেষক, পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
