Logo
Logo
×

ইসলাম ও জীবন

ছয় রোজায় এক বছর সিয়াম সাধনার সওয়াব

Icon

মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ছয় রোজায় এক বছর সিয়াম সাধনার সওয়াব

মাহে রমজান-রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহিমান্বিত মাস। তার অবসান হলেও শিক্ষার ধারা থেমে যায় না বরং একজন মুমিনের জন্য রমজান হলো এক প্রশিক্ষণকাল, যার প্রভাব বাকি ১১ মাসজুড়ে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। এ ধারাবাহিকতা রক্ষার অন্যতম সহজ, সুগভীর ও মহৎ উপায় হলো শাওয়াল মাসের ছয় রোজা।

আরবি চান্দ্র বছরের দশম মাস শাওয়াল। এ মাসের প্রথম দিন মুসলিম উম্মাহ উদ্যাপন করে ঈদুল ফিতর, আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার দিন। তবে এ আনন্দের পরই শুরু হয় নতুনভাবে ইবাদতের যাত্রা। ইসলামে ইবাদত শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অবিরাম প্রচেষ্টা।

মহান আল্লাহ বলেন : ‘আমি জিন ও মানবজাতিকে শুধু আমারই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’

(সূরা আয-যারিয়াত : ৫৬) এ আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইবাদত কোনো মৌসুমি বিষয় নয়; এটি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের দায়িত্ব। আবার আল্লাহতায়ালা আরও বলেন : ‘তোমার মৃত্যু পর্যন্ত তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করে যাও।’ (সূরা আল-হিজর : ৯৯)।

রমজানের রোজা ফরজ, কিন্তু শাওয়ালের ছয় রোজা সুন্নত নফল। এ নফল ইবাদতের মধ্যে লুকিয়ে আছে অপার রহমত ও ফজিলত। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন : ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর শাওয়ালের ছয় রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬৪)।

আলেমরা ব্যাখ্যা করেন, প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান অন্তত দশগুণ বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন : ‘যে একটি সৎকর্ম নিয়ে আসবে, তার জন্য থাকবে তার দশগুণ প্রতিদান।’

(সূরা আল-আন‘আম: ১৬০) রূপক হিসাবে বললে: রমজানের ৩০টি রোজা x ১০ = ৩০০ দিনের সওয়াব। শাওয়ালের ছয় রোজা x ১০ = ৬০ দিনের সওয়াব। মোট ৩৬০ দিনের সওয়াব-প্রায় পুরো এক বছরের সমান। সুনান আন-নাসাঈ-এও উল্লেখ আছে : ‘রমজানের রোজা দশ মাসের সমতুল্য এবং শাওয়ালের ছয় রোজা দুই মাসের সমান; এভাবেই তা এক বছরের রোজা হয়ে যায়।’ (হাদিস : ২২২৬)।

শাওয়ালের এ রোজাগুলোর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-এগুলো ফরজ রোজার ত্রুটি পূরণে সহায়ক। মানুষের রোজা সবসময় পরিপূর্ণ হয় না; কখনো অনর্থক কথা, দৃষ্টি বা আচরণের কারণে সওয়াব কমে যেতে পারে। যেমন ফরজ নামাজের ঘাটতি পূরণে নফল নামাজ রয়েছে, তেমনি রমজানের অপূর্ণতা পূরণে শাওয়ালের রোজা এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

অন্যদিকে, কোনো আমল কবুল হওয়ার একটি লক্ষণ হলো-এরপর আরও নেক আমল করার তাওফিক পাওয়া। তাই রমজানের পর শাওয়ালের রোজা রাখা এ সত্যের প্রতিফলন যে, আল্লাহতায়ালা বান্দার আমল কবুল করেছেন এবং তাকে আরও নেক কাজে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন।

শাওয়ালের ছয় রোজা পালন করার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ রোজাগুলো ঈদের দিন ছাড়া শাওয়াল মাসের যে কোনো দিনে রাখা যায়। একটানা ছয় দিন রাখা উত্তম, তবে আলাদা আলাদাও রাখা বৈধ। যারা রমজানের কাজা রোজা বাকি রেখেছেন, তারা আগে কাজা আদায় করবেন। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই এ রোজা সুন্নত।

রমজানের শিক্ষা আমাদের আত্মসংযম, তাকওয়া, সহমর্মিতা ও মানবসেবার পথে পরিচালিত করে। এ শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে কার্যকর রাখতে শাওয়ালের রোজা একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এটি মনে করিয়ে দেয়-ইবাদত শুধু রমজানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রতি মাস, প্রতিদিনই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ।

পরিশেষে বলা যায়, শাওয়ালের ছয় রোজা হলো এক অনন্য নেক আমল, যা অল্প কষ্টে বিপুল সওয়াব অর্জনের সুযোগ এনে দেয়। আসুন, আমরা সবাই এ সুন্নত আমলটি পালন করি এবং রমজানের অর্জিত তাকওয়াকে সারা বছর ধরে রাখার চেষ্টা করি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলার তাওফিক দান করুন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম