বাবা হারানোর কষ্ট বুকে চেপে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়ালেন হুসেইন
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০২:১৫ পিএম
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জীবনে বহু ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন গল্প লিখলেন ইরাকের ৩০ বছর বয়সি স্ট্রাইকার আয়মান হুসেইন। বুধবার ভোর ৪টায় বিশ্বকাপে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে শক্তিশালী নরওয়ের কাছে ১-৪ গোলে হারলেও দলের একমাত্র গোলটি তারই পায়ে। দল হেরে গেলেও ফুটবলের বড় মঞ্চে রেখে গেছেন কৃতিত্বের ছাপ। ইরাকের প্রধান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড বলেন, ‘সে এমন একজন খেলোয়াড় যাকে বক্সের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। আমি তার জন্য খুব খুশি ও গর্বিত।’
হুসেইন এমন এক ইরাকে বেড়ে উঠেছেন, যেখানে অস্থির সংকটময় পরিস্থিতিতে ফুটবল হয়ে উঠত ঐক্যের সোপান। ইরাকি খেলোয়াড়রা ছিলেন আধা-পেশাদার— দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটের কারণে তাদের জর্ডানে গিয়ে টুর্নামেন্ট খেলতে হতো। ওই সংকটে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল জয় উদযাপন করতে গিয়ে আত্মঘাতী বোমা হামলায় কয়েক ডজন মানুষ মারা গিয়েছিল।
২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত শিয়া-সুন্নি সংঘাতে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের মতো রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এই কঠিন সময়েই তরুণ হুসেইন ব্যক্তিজীবনে দুঃখজনক ঘটনার শিকার হন। ২০০৮ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে তার বাবা— ইরাকি সেনাসদস্য— বাড়ি তৈরির সরঞ্জাম কিনতে বের হলে আল-কায়েদার গুলিতে নিহত হন। এর কয়েক বছর পর হুসেইনের বড় ভাইকে অপহরণ করা হয়— যাঁর খোঁজ আজও পাননি তারা।
এক সাক্ষাৎকারে হুসেইন বলেন, 'আমি পরিবারের দেখাশোনা করতে ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মা রাজি হননি।' মায়ের উৎসাহেই শেষ পর্যন্ত ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর প্রথমবারের মতো ইরাককে বিশ্বকাপে পৌঁছে দিয়েছেন গোলমেশিন হুসেইন। ২০১৫ সালে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া এই স্ট্রাইকার এ পর্যন্ত দেশের হয়ে ৩৪টি আন্তর্জাতিক গোল করেছেন।
তবে বিশ্বকাপ প্রস্তুতিও নির্বিঘ্নে কাটেনি। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর শিকাগোর ও'হেয়ার বিমানবন্দরে প্রায় সাত ঘণ্টা আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের শিকার হন তিনি। সেই হেনস্তার জবাব যেন দিলেন মাঠেই— নরওয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত হেডে গোলরক্ষক ওরিয়ান নাইল্যান্ডকে পরাস্ত করে।
শূন্যে থাকা বলকে গোলে পরিণত করার নিখুঁত কারিগর এই হুসেইন। ইরাকের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তিনি ছিলেন দলের সেরা পারফর্মার। আন্তঃ-কনফেডারেশন প্লে-অফের মাধ্যমে টুর্নামেন্টে পৌঁছানোর পথে তিনি ১২টি গোল করেন— যা তার যেকোনো সতীর্থের করা গোলের দ্বিগুণেরও বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে জ্বলে উঠেছিলেন হুসেইন— মার্চ মাসে গুয়াদালুপে বলিভিয়ার বিরুদ্ধে ২-১-এর জয়সূচক গোলটি তারই, যা ইরাকের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা নিশ্চিত করে।
এই গোলমেশিন যদি বর্তমান ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তবে গ্রুপ-আই থেকে পরের পর্বে যাওয়ার স্বপ্ন হয়তো এখনো বাঁচিয়ে রাখতে পারবে ইরাক— যদিও এই গ্রুপে ফ্রান্স এবং সেনেগালও রয়েছে।

