ঘন ঘন প্রস্রাব কি শুধু বয়সের কারণ? যেসব লক্ষণ অবহেলা করা বিপজ্জনক
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০২:১৯ পিএম
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অনেকেই মনে করেন বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এটি সবসময় বার্ধক্যের কারণে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া ডায়াবেটিস, প্রোস্টেটের সমস্যা, মূত্রনালির সংক্রমণ কিংবা কিডনি রোগের মতো গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সজনিত কিছু পরিবর্তনের কারণে মূত্রথলির ধারণক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণকারী পেশিগুলো আগের মতো কার্যকর না-ও থাকতে পারে। এর ফলে বিশেষ করে রাতে বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।
শুধু বয়স নয়, থাকতে পারে নানা রোগ
হায়দরাবাদের যশোদা হাসপাতালের সিনিয়র ইউরোলজিস্ট ডা. এম. গোপীচাঁদের মতে, বয়স বাড়লে প্রস্রাবের কিছু পরিবর্তন দেখা দিলেও ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়াকে শুধুমাত্র বয়সের প্রভাব বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ভারতের জয়পুরের সিকে বিড়লা হাসপাতালের ইউরোলজি ও রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগের পরিচালক ডা. দেবেন্দ্র কে. শর্মা বলেন, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা যে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া বার্ধক্যের স্বাভাবিক অংশ। বাস্তবে এটি অনেক সময় এমন রোগের লক্ষণ হতে পারে, যার চিকিৎসা প্রয়োজন।
পুরুষদের ক্ষেত্রে বড় কারণ প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি
চিকিৎসকদের মতে, বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর একটি হলো বিনাইন প্রোস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া (বিপিএইচ) বা প্রোস্টেট গ্রন্থির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি।
প্রোস্টেট বড় হয়ে গেলে এটি মূত্রনালির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে বারবার প্রস্রাবের বেগ, দুর্বল প্রস্রাবের ধারা, রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব এবং মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
অতিসক্রিয় মূত্রথলিও হতে পারে কারণ
অতিরিক্ত সক্রিয় মূত্রথলি বা ওভারঅ্যাকটিভ ব্লাডার নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই দেখা যায়। এতে হঠাৎ প্রস্রাবের তীব্র চাপ, বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন এবং কখনো কখনো প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার সমস্যা দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও এটিকে স্বাভাবিক বার্ধক্যের অংশ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
ডায়াবেটিসেরও হতে পারে প্রাথমিক লক্ষণ
ঘন ঘন প্রস্রাব অনেক সময় নিয়ন্ত্রণহীন ডায়াবেটিসের প্রথম লক্ষণ হতে পারে।
রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে কিডনি অতিরিক্ত চিনি বের করে দেওয়ার জন্য বেশি কাজ করে। এর ফলে প্রস্রাবের পরিমাণ ও সংখ্যা বেড়ে যায়।
সংক্রমণ ও কিডনির রোগেও দেখা দিতে পারে
মূত্রনালির সংক্রমণ (ইউটিআই), মূত্রথলির পাথর, কিডনি রোগ, স্ট্রোক, পারকিনসনস রোগ, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসসহ বিভিন্ন স্নায়বিক রোগও ঘন ঘন প্রস্রাবের কারণ হতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, ব্যথা বা অন্যান্য জটিল উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন প্রস্রাবের সঙ্গে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত—
- হঠাৎ প্রস্রাবের তীব্র চাপ
- প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া
- প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়া
- প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া
- প্রস্রাব শুরু করতে সমস্যা হওয়া
- প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা
- রাতে বারবার ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে যাওয়া
- তলপেটে ব্যথা বা অস্বস্তি
- অতিরিক্ত পিপাসা বা অকারণে ওজন কমে যাওয়া
জীবনযাপনের কারণেও বাড়তে পারে সমস্যা
সব ক্ষেত্রে রোগই দায়ী নয়। অতিরিক্ত চা, কফি, কোমল পানীয়, অ্যালকোহল কিংবা অতিরিক্ত তরল পানও প্রস্রাবের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ ছাড়া কিছু ওষুধ, বিশেষ করে ডাইইউরেটিক জাতীয় ওষুধ, প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা ক্যাফেইন কমানো, রাতে অতিরিক্ত পানি পান এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যকর মূত্রথলি-সংক্রান্ত অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।
আধুনিক চিকিৎসায় রয়েছে কার্যকর সমাধান
চিকিৎসকদের মতে, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেশিরভাগ কারণই চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে—
- ব্লাডার ট্রেনিং বা মূত্রথলি নিয়ন্ত্রণের ব্যায়াম
- পেলভিক ফ্লোর থেরাপি
- জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
- প্রয়োজনীয় ওষুধ
- ডায়াবেটিস বা সংক্রমণের চিকিৎসা
- প্রোস্টেটের জন্য স্বল্প আক্রমণাত্মক চিকিৎসা পদ্ধতি
- বিশেষ ক্ষেত্রে রোবটিক সার্জারি
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, ঘন ঘন প্রস্রাব কোনো রোগের নাম নয়, এটি একটি উপসর্গ। তাই সমস্যার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করাই কার্যকর চিকিৎসার প্রথম ধাপ। বয়সের কারণে বলে অবহেলা না করে প্রয়োজন হলে দ্রুত ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
সূত্র: এনডিটিভি
