সংশ্লিষ্টরা কী বলছেন
কতটা ফেরত আসছে মেগা প্রজেক্টের লগ্নি
এ এম রুবেল
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিগত কয়েক বছর ধরে নাটক মানেই ছিল ইউটিউবে ভিউয়ের জোয়ার। কিন্তু চলতি বছর ডিজিটাল বাস্তবতায় শুধু ইউটিউবের ভিউ-ভিত্তিক গুগল অ্যাডসেন্স রেভিনিউ দিয়ে মেগা-বাজেটের নাটকের খরচ তোলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বিগত কয়েক বছর ধরেই দেশের সিনেমা ঈদকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, হাতেগোনা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিয়ে সপ্তাহ না পেরুতেই কোটি কোটি টাকা আয়ের ফাঁকা আওয়াজও সামনে আসছে। এমনকি দেশে মুক্তির পর সেগুলো বিদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিয়ে থাকছে আলোচনায়। কিন্তু বিদেশ থেকে দেশে কত টাকা আনতে পারছে সিনেমাগুলো সেই হিসাবে নেই কারও কাছে। অনেকেই মনে করছেন, দেশের প্রেক্ষাগৃহে লগ্নি উঠাতে না পেরে বিদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিয়ে কিছুটা আর্থিক ক্ষতি কমাতে চাচ্ছেন নির্মাতা-প্রযোজকরা।
তবে নির্মাতা-প্রযোজকদের মতে, স্টার সিনেপ্লেক্স বা যমুনা ব্লকবাস্টারের মতো দেশের মাল্টিপ্লেক্সের টিকিট বিক্রির টাকা দিয়ে লগ্নির টাকা উঠলেও আসল লভ্যাংশ বা প্রফিট মার্জিন আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার থিয়েটার রিলিজ থেকে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের এ সময়ে প্রবাসীদের দেওয়া টিকিটের মূল্য দেশীয় সিনেমার জন্য নতুন এক অক্সিজেন সিলিন্ডার হিসাবে কাজ করছে। তবে শুধু গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন নয়, গত ঈদের বেশ কিছু আলোচিত ও প্রশংসিত সিনেমা ওটিটিতে মুক্তি নিয়েও জোর আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেন পরিচালকরা।
তবে সিনেমার লগ্নি ফেরতের সবচেয়ে বড় উৎস এখন বিদেশের প্রেক্ষাগৃহ-এমনটাই মনে করছেন চিত্রনায়ক শাকিব খান। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে এবং প্রবাসী দর্শকরা যেভাবে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে টিকিট কেটে সিনেমা দেখছেন, তাতে বড় বাজেটের লগ্নির টাকা আন্তর্জাতিক বাজার থেকেই তুলে আনা সম্ভব হচ্ছে। বিশ্ববাজারই এখন আমাদের সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি।’
অভিনেত্রী জয়া আহসান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ওটিটি রিলিজ এখন শুধু বিনোদনের নতুন মাধ্যম নয়, এটি প্রযোজকদের বিশ্ববাজার থেকে দ্রুত ও সরাসরি লগ্নি ফেরত পাওয়ার একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ক্ষেত্র তৈরি করেছে।’
চিত্রনায়ক আরিফিন শুভ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক চেইনে দেশের সিনেমা মুক্তি দেওয়ার পর সেখান থেকে যে রেভিনিউ আসছে, তা সিনেমার লগ্নি সুরক্ষায় বিশাল ভূমিকা রাখছে। ওটিটি রাইটস এবং আন্তর্জাতিক ডিস্ট্রিবিউশন-এ দুটি মিলেই এখন ঢালিউডের নতুন অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি হচ্ছে।’
অভিনেতা মোশাররফ করিম বলেন, ‘নাটক বা সিনেমার আয় এখন আর শুধু দেশীয় সিনেমা হল বা টেলিভিশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ওটিটি এবং অনলাইনের বিভিন্ন অ্যাপের কারণে প্রযোজকরা ভিউ-ভিত্তিক বা সাবস্ক্রিপশন মডেলের মাধ্যমে বড় অঙ্কের রিটার্ন পাচ্ছেন।’
অভিনেতা অপূর্ব বিষয়টি নিয়ে বলেন, ‘একটি ভালো নাটক বা ওয়েব ফিল্ম ওটিটি বা স্পন্সরশিপের মাধ্যমে খুব দ্রুত তার নির্মাণ খরচ বা লগ্নি তুলে নিয়ে আসতে পারে, যা পুরো ইন্ডাস্ট্রির জন্য আশাব্যঞ্জক।’
অভিনেত্রী নাজিফা তুষি বলেন, ‘ওটিটি এক মাধ্যম, যা ভালো কাজের আন্তুর্জাতিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করে। প্রযোজকদের জন্য ওটিটি একটি বড় আয়ের ক্ষেত্র তৈরি করেছে, কারণ সিনেমা হলে চলুক বা না চলুক, ভালো কনটেন্ট হলে ওটিটি রাইটস বা ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন থেকে লগ্নি ফেরত পাওয়া এখন অনেক বেশি সুরক্ষিত।’
অভিনেত্রী পূজা চেরী বলেন, ‘যে কোনো ভালো কাজ বিদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলে বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কাজ রিলিজ হলে প্রবাসীরা সহজেই টিকিট কেটে বা সাবস্ক্রিপশন নিয়ে বৈধভাবে তা দেখতে পারেন। এর ফলে প্রযোজকদের কাছে লগ্নির টাকা কম সময়ে এবং স্বচ্ছ উপায়ে ফেরত পান। এটা সত্যি ইতিবাচক।’
একাধিক প্রযোজক জানান, একটি ঈদের নাটক যদি ৫০ লাখ ভিউও পায়, ইউটিউব থেকে সেখান থেকে যে রেভিনিউ আসে তা দিয়ে মেকিং খরচের ২০ শতাংশও কভার করা যায় না। ফলে নাটক বা ওয়েব সিরিজের মূল ভরসা এখন ডিজিটাল স্ট্রিমিং ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন ফি। তবে দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর সাবস্ক্রিপশন রেট আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক কম হওয়ায়, শুধু দেশীয় দর্শক দিয়ে কোটি টাকার ইনভেস্টমেন্ট তুলে আনা কঠিন। এ ঘাটতি মেটাতে ওটিটিগুলোকে এখন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং আমেরিকার প্রবাসী বাঙালি দর্শকদের ওপর বড় আকারে নির্ভর করতে হচ্ছে।
এদিকে গত ঈদে করপোরেট স্পন্সরশিপের ক্ষেত্রেও একটি বড় ধরনের আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলো টেলিভিশন চ্যানেলের নাটকে লগ্নি করতে অনেকটাই অনিহা প্রকাশ করেছেন। তাদের কোটি কোটি টাকার বাজেট এখন চলে গেছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কো-স্পন্সরশিপ এবং সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের পেছনে। একটি মিডিয়া বায়িং এজেন্সি নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হোসেন বলেন, ‘ব্র্যান্ডগুলো এখন রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট এবং সুনির্দিষ্ট অডিয়েন্স ট্র্যাকিং চায়। টিভি নাটকে বিজ্ঞাপন দিলে কতজন মানুষ তা দেখল, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। কিন্তু ওটিটি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ডেটা অ্যানালিটিক্স খুব নিখুঁত। গত ঈদে ব্র্যান্ডগুলো কোনো মেগা-সিরিজের টাইটেল স্পন্সর হতে বা শীর্ষ ৫ জন ফেসবুক-ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সারকে দিয়ে ঈদের বিশেষ কনটেন্ট বানাতে যে বাজেট বরাদ্দ করেছে, তা টেলিভিশনের সামগ্রিক ঈদ বাজেটের চেয়েও বেশি।’
অভিনেতা-অভিনেত্রীর মুখে লগ্নি ফেরতে জয়জয়কার গল্প শোনা গেলেও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও পরিচালকদের কথা ভিন্ন সুর। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের বেশিরভাগ মেগা বাজেটের কাজের লগ্নি ফেরত পাচ্ছেন না প্রযোজকরা। যে কারণে নানা পন্থায় টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছেন তারা। সব মিলিয়ে বলা চলে, চটকদার প্রচারণার আড়ালে এখন টিকে থাকার মূল মন্ত্র-সঠিক ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন ও গ্লোবাল অডিয়েন্স মনোপলিকেই মনে করছেন নির্মাতা-প্রযোজকরা।
