ক্যাম্পাসে বিশ্বকাপের উন্মাদনা
রাশেদ আহমেদ রাফি
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গভীর রাত। আচমকা হলের বারান্দায় ভেসে আসে উল্লাসধ্বনি। কোনো কক্ষে জার্সি পরে শিক্ষার্থীরা টানটান উত্তেজনায় টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে আছেন, কোথাও আবার বড় পর্দার সামনে শত শত শিক্ষার্থীর সম্মিলিত চিৎকারে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। প্রিয় দলের গোল হতেই আলিঙ্গন, আতশবাজি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রসিকতা আর প্রতিপক্ষ সমর্থকদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি। চার বছর পরপর বিশ্বকাপ ফুটবল যেন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রূপ দেয় এক অনন্য উৎসবমঞ্চে। এবারের বিশ্বকাপ সামনে রেখেও ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নানা পরিকল্পনার কথা জানা যাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে লিখেছেন রাশেদ আহমেদ রাফি
বাংলাদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। জাতীয় দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় কোনো সাফল্য অর্জন করতে না পারলেও বিশ্বকাপ এলে দেশের মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়েন মূলত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের সমর্থনে। তবে এ আবেগের সবচেয়ে প্রাণবন্ত প্রকাশ ঘটে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে, যেখানে ফুটবল কেবল খেলা নয়; বরং এটি বন্ধুত্ব, পরিচয়, সংস্কৃতি এবং সম্মিলিত আনন্দের এক প্রতীক। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ক্রমশ বাড়ছে। যদিও এবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো বাংলাদেশের সময় গভীর রাত ও ভোরে অনুষ্ঠিত হবে, তবুও শিক্ষার্থীদের আগ্রহে কোনো ঘাটতি নেই।
পতাকা, জার্সি আর চিরচেনা বিভাজন
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দৃশ্যমান হয় ফুটবলের প্রভাব। শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল ছবি বদলে যায়, প্রিয় দলের পতাকা কিংবা জার্সির ছবি স্থান পায় বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিসা রহমান বলেন, ‘বিশ্বকাপের সময় ক্যাম্পাসের পরিবেশই বদলে যায়। কে ব্রাজিল, কে আর্জেন্টিনা-এটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়। মজার বিষয় হলো, বন্ধুত্ব নষ্ট না করেই সবাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপভোগ করে।’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর হোসেনের ভাষায়, ‘বিশ্বকাপের সময় ক্যাম্পাসে আলাদা একটা প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়। ক্লাসের ফাঁকে খেলার বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন নিয়ে বিতর্ক-সবকিছু মিলিয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা।’
বড় পর্দায় একসঙ্গে খেলা দেখার আনন্দ
বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন, আবাসিক হল কর্তৃপক্ষ কিংবা শিক্ষার্থী সংগঠনের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো বড় পর্দায় সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। ২০২২ বিশ্বকাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে ফাইনাল ম্যাচ উপভোগ করতে হাজারো শিক্ষার্থীর সমাগম ঘটেছিল। একইভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। সম্প্রতি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্রোহী হল প্রশাসনও বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ বড় পর্দায় প্রদর্শনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুনিরুল ইসলাম বলেন, ‘একাই বাসায় বসে খেলা দেখার চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বড় পর্দায় খেলা দেখার আনন্দ অনেক বেশি। গোল হলে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করি, আবার হারলেও সবাই মিলে আক্ষেপ করি।’
ডিজিটাল যুগে উন্মাদনার নতুন রূপ
আগে বিশ্বকাপের আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল টেলিভিশনের সামনে কিংবা ক্যাম্পাসের আড্ডায়। এখন সেই আলোচনার বড় অংশ স্থানান্তরিত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং এক্সে (সাবেক টুইটার) ম্যাচ-পূর্বাভাস, খেলোয়াড় বিশ্লেষণ, মিম এবং ট্রলের বন্যা বয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপেও চলে উত্তপ্ত বিতর্ক। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবিহা নওরীন বলেন, ‘বিশ্বকাপের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। খেলা নিয়ে যতটা উত্তেজনা থাকে, মিম নিয়েও ততটাই আনন্দ হয়।’ তবে অনেকেই মনে করেন, মজা ও সুস্থ প্রতিযোগিতার সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়। কারণ, খেলাকে ঘিরে অপ্রয়োজনীয় বিদ্বেষের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখাই প্রকৃত ক্রীড়াসুলভ মনোভাব।
সময় পার্থক্যের চ্যালেঞ্জ
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ম্যাচের সময়সূচি। উত্তর আমেরিকায় আয়োজিত হওয়ায় বেশিরভাগ ম্যাচ বাংলাদেশের সময় গভীর রাত কিংবা ভোরে অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এক ধরনের দ্বিধা তৈরি করবে। একদিকে ক্লাস, পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্টের চাপ; অন্যদিকে প্রিয় দলের খেলা দেখার তীব্র আগ্রহ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পরীক্ষা থাকলেও বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মিস করতে ইচ্ছা করে না। তবে এবার সময়ের পার্থক্য কিছুটা সমস্যার কারণ হতে পারে।’ তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ফুটবলপ্রেমীরা এসব বাধা খুব একটা গুরুত্ব দেন না। প্রয়োজন হলে ঘুমের সময় কমিয়েই তারা বিশ্বকাপ উপভোগ করেন।
সম্প্রচার অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্বকাপ সামনে এলেই সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এবারের আসরেও সম্প্র্রচার ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন সফল করতে সহজলভ্য সম্প্রচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষার্থী আশা করছেন, বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সম্প্রচার নিশ্চিত করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বলেন, ‘বিশ্বকাপের আনন্দ সবার কাছে পৌঁছাতে সহজ সম্প্রচার ব্যবস্থা জরুরি। বিশেষ করে হলে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।’
খেলার বাইরে সামাজিক বন্ধনের শক্তি
বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকগুলোর একটি হলো এটি সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে। রাজনৈতিক মতাদর্শ, বিভাগীয় পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত পার্থক্য ভুলে শিক্ষার্থীরা একত্রিত হন একটি সাধারণ আবেগকে কেন্দ্র করে। হলের ডাইনিং, ক্যাফেটেরিয়া কিংবা টিএসসির আড্ডায় ফুটবল হয়ে ওঠে আলোচনার প্রধান বিষয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের সমষ্টিগত উদ্?যাপন তরুণদের মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক সংযোগ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘খেলাধুলা মানুষের মধ্যে সামাজিক সংহতি তৈরি করে। বিশ্বকাপের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ সেই সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।’
ফুটবল সংস্কৃতির সম্ভাবনা
বিশ্বকাপকে ঘিরে তরুণদের এ ব্যাপক আগ্রহ বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতির শক্তিশালী ভিত্তির ইঙ্গিত দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করার সুযোগ রয়েছে। যদি এই আবেগকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে ভবিষ্যতে দেশের ফুটবল উন্নয়নেও তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিগুলোর মধ্যে বিশ্বকাপ ফুটবল এক বিশেষ স্থান দখল করে থাকে। রাত জেগে খেলা দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণবন্ত বিতর্ক, প্রিয় দলের জয়ে উচ্ছ্বাস কিংবা পরাজয়ের বেদনা ভাগাভাগি-এসব অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হয়তো নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ফুটবলের উন্মাদনা কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং প্রতিটি বিশ্বকাপ নতুন প্রজন্মকে শিখিয়ে দেয়-ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি আবেগ, বন্ধুত্ব, বৈচিত্র্য এবং সম্মিলিত আনন্দের এক বৈশ্বিক ভাষা। বিশ্বকাপের সেই ভাষায় কথা বলতে প্রস্তুত বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও। কারণ চার বছর পরপর ফিরে আসা এ উৎসব তরুণদের কাছে শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং স্মৃতি তৈরি করার এক দুর্লভ উপলক্ষ।
