পাবিপ্রবির ১৯ বছর : স্বপ্নও সম্ভাবনার আলোকবর্তিকা
বিএম মিকাইল হোসাইন
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা ও তারুণ্যের এক উজ্জ্বল নাম পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। দেখতে দেখতে কৈশোর পেরিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনার এ বিদ্যাপীঠ। গত ৫ জুন বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯ বছরে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ এ পথচলায় সীমাবদ্ধতা, সংগ্রাম, আন্দোলন, স্বপ্ন ও অর্জনকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। আজ এটি শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং হাজারো তরুণের স্বপ্ন, গবেষণা, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব, প্রতিবাদ ও ভালোবাসার প্রতীক।
একসময় সীমিত অবকাঠামো আর অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে পাঁচটি অনুষদের অধীনে ২১টি বিভাগে প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, ফার্মেসি ও পরিসংখ্যান বিভাগ; প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের অধীনে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, পুরকৌশল, স্থাপত্য ও নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ; ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে ব্যবসায় প্রশাসন ও ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ; মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি, সমাজকর্ম, ইতিহাস ও লোকপ্রশাসন বিভাগ এবং জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে রয়েছে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ।
বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘ইনস্টিটিউট অব ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট’। পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে ‘রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজি ট্রান্সফার সেল’ এবং ‘সেল ফর ন্যাশনাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল কোলাবোরেশন’। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে চালু হয়েছে অনলাইন পাবলিক অ্যাকসেস ক্যাটালগ সুবিধা। স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বই সংগ্রহ করতে পারছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ পেপারলেস প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে।
শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয় পাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা। সহশিক্ষা কার্যক্রম, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও তারা সমানভাবে সক্রিয়। ক্যাম্পাসজুড়ে প্রতিনিয়ত চলছে বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাহিত্যচর্চা, পরিবেশ আন্দোলন, গবেষণা কার্যক্রম ও ক্যারিয়ারভিত্তিক নানা আয়োজন। পাস্ট ডিবেটিং সোসাইটির আয়োজনে প্রায় প্রতিদিনই অনুষ্ঠিত হয় বিতর্কচর্চা। পথশিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান, শীতবস্ত্র বিতরণ, রক্তদান কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, পাবিপ্রবি প্রেসক্লাব, ইনকিলাব মঞ্চ, সলভার গ্রিন, রোভার স্কাউট, গ্রিন ভয়েস, আইইইই, পাস্ট বিসিএস জব হান্টার্স, পাস্ট বিজনেস ক্লাব, আগামীর সূর্য, পাস্ট ক্যারিয়ার অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিউরশিপ ক্লাব, ইয়ুথ ম্যাপার্স, পাস্ট ফিটনেস ক্লাব, রাহে নূর কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন, কনজিউমার ইয়ুথ বাংলাদেশ, শিখা অ্যাসোসিয়েশন, পাস্ট স্পোর্টস ক্লাব, পাস্ট ফুটবল ক্লাব, পাস্ট রিসার্চ সোসাইটি, পাস্ট বিজ্ঞান ক্লাব ও ডেটা সায়েন্স ক্লাবসহ অসংখ্য সংগঠন। এসব সংগঠন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, দক্ষতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনও দিন দিন সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। ব্যান্ড দল স্কেচ, অনিরুদ্ধ নাট্যদল, কণ্ঠস্বর আবৃত্তি সংগঠন, মৃদঙ্গসহ নানা সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। প্রতিবছর আয়োজিত পিঠা উৎসব, বৈশাখী অনুষ্ঠান, নাট্যোৎসব, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসজীবনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বরাবরই সোচ্চার। বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু, আন্দোলন-সংগ্রাম কিংবা সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে তাদের। পাবনা শহরের প্রাণকেন্দ্র ইছামতী নদী রক্ষার আন্দোলনেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সরব ভূমিকা দেখা গেছে।
প্রকৃতি ও আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস এখন দেশের অন্যতম নান্দনিক ক্যাম্পাস হিসাবে পরিচিত। ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে অনন্য নকশার প্রধান ফটক, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র হলো স্বাধীনতা স্তম্ভ বা স্বাধীনতা চত্বর। বিগত জুলাই আন্দোলনেও এটি ছিল পাবনাবাসীর অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ‘স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা’ নামের এ স্থাপনাটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৭১ ফুট এবং উচ্চতা ৫২ ফুট। ১৬ ফুট উচ্চতায় স্থাপিত নয়টি হাত প্রতীক করে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধকে। সর্বোচ্চ চূড়ায় একজন নারী ও একজন পুরুষের হাত থেকে উড়ে যাওয়া চারটি কবুতর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারটিও ব্যতিক্রমধর্মী স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মাহবুব হাসান ত্বহার নকশায় নির্মিত এ মিনার ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও বাঙালির আত্মত্যাগকে তুলে ধরে। মিনারের কালো দেওয়াল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নের প্রতীক, আর সাদা দেওয়াল ভাষা আন্দোলনের ন্যায়সংগত দাবি ও শুভ শক্তির প্রতিচ্ছবি বহন করে। মাঝখানের ৫২ ফুট উচ্চতার স্তম্ভটি আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সত্য ও ন্যায়ের বিজয়কে স্মরণ করিয়ে দেয়।
কেন্দ্রীয় মাঠের পাশ ঘেঁষে নির্মিত আনন্দ সরোবর লেক এখন শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রিয় জায়গা। লেকপাড়ে আড্ডা, ফটোসেশন, মাছ ধরা কিংবা সন্ধ্যার সময়ের নির্মল বাতাস শিক্ষার্থীদের ক্লান্তি দূর করে দেয়। লেকের পাশেই অবস্থিত ‘কবি বন্দে আলী মিয়া মুক্তমঞ্চ’। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র হিসাবে পরিচিত। স্থপতি বিজয় দাশ গুপ্তের নকশায় নির্মিত এই মুক্তমঞ্চে নিয়মিত নাটক, বিতর্ক, আবৃত্তি, সঙ্গীতানুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। খোলা আকাশের নিচে লাল সিরামিক ইটে নির্মিত এই মুক্তমঞ্চ দর্শকদের কাছে আলাদা সৌন্দর্য এনে দেয়। ১৯ বছরে পদার্পণ করতে যাওয়া পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর শুধু কিছু ভবন কিংবা শ্রেণিকক্ষের নাম নয়। এটি হাজারো তরুণের স্বপ্ন দেখার জায়গা, প্রতিবাদের জায়গা, ভালোবাসার জায়গা, আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার জায়গা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলা এ বিশ্ববিদ্যালয় একদিন বিশ্বদরবারে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, এমন প্রত্যাশাই শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী ও পাবনাবাসীর।
উপাচার্য বলেন
বর্তমান বিশ্বে শুধু সনদ নয়, দক্ষতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা এমন শিক্ষার্থী গড়ে তুলতে চাই, যারা চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং উদ্ভাবক, গবেষক ও নেতৃত্বদাতা হবে। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা, প্রযুক্তি, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করাই আমাদের লক্ষ্য। শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক, কারিগরি ও উদ্ভাবনী শিক্ষার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানবিক, নৈতিক ও সমাজসচেতন নাগরিক হিসেবেও গড়ে তুলতে চাই।
