Logo
Logo
×

ক্যাম্পাস তারুণ্য

খেলার মাঠ থেকে স্বপ্নের মঞ্চে

Icon

সালমা আখতার লিপি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ক্রিকেট ও ফুটবলের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বিভিন্ন খেলায় নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে পেশাদার ক্রীড়াবিদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। বিকেএসপি থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্লাব, স্কুল ও একাডেমিগুলো ধীরে ধীরে তৈরি করছে একটি কাঠামোবদ্ধ ক্রীড়া-পরিবেশ, যেখানে প্রতিভা খুঁজে পাওয়া এবং গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে।

মেসি, রোনালদো, নেইমার, এমবাপ্পে বা ইউসরা মারদিনির মতো বিশ্বতারকার গল্প যেমন অনুপ্রেরণা জোগায়, তেমনি নতুন প্রজন্মও এখন স্বপ্ন দেখছে মাঠ থেকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানোর। তরুণদের এই স্বপ্নযাত্রার কথাই লিখেছেন- সালমা আখতার লিপি

খেলাধুলা আজ আর শুধু অবসর বা বিনোদনের মাধ্যম নয়-এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনগঠনের ক্ষেত্র। বাংলাদেশের তরুণরা এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি খেলাধুলামুখী। ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, আর্চারি এবং বিভিন্ন ইনডোর গেমসে অংশগ্রহণ বাড়ছে। একইসঙ্গে বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের গল্প তরুণদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এই স্বপ্ন শুধু মাঠে ভালো খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি পেশাদার ক্যারিয়ার, পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করছে।

জীবন গড়ার অনুশীলন

খেলাধুলা একজন তরুণের জীবনে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। এটি শুধু শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় না, বরং মানসিক দৃঢ়তা, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক দক্ষতাও তৈরি করে। একজন খেলোয়াড় নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে শেখে কীভাবে চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কীভাবে দলগতভাবে কাজ করতে হয় এবং কীভাবে পরাজয়কে গ্রহণ করে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হয়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, খেলাধুলায় যুক্ত তরুণরা তুলনামূলকভাবে বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং মানসিকভাবে স্থিতিশীল থাকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে অনেক তরুণ এখনো পড়াশোনা ও খেলাধুলার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পেতে সংগ্রাম করে। তবে ধীরে ধীরে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খেলাধুলাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

কোত্থেকে শুরু করবে

বাংলাদেশে খেলাধুলা শেখার প্রধান কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো বিকেএসপি। এ প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া জীবনধারা গড়ে তোলার জায়গা। এখানে ছোটবেলা থেকেই খেলোয়াড়দের ফিটনেস, টেকনিক, মানসিক প্রস্তুতি এবং শৃঙ্খলার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিক্সসহ নানা খেলায় এখানে নিয়মিত কোচিং পরিচালিত হয়। বিকেএসপি ছাড়াও জেলা ক্রীড়া সংস্থা, স্থানীয় ক্লাব এবং স্কুলভিত্তিক ক্রীড়া কার্যক্রম তরুণদের প্রথম মঞ্চ হিসাবে কাজ করে। অনেক সময় একটি স্কুল টুর্নামেন্ট বা জেলা লিগ থেকেই ভবিষ্যতের জাতীয় খেলোয়াড় উঠে আসে।

নতুন প্রজন্মের উত্থান

বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। এই তরুণদের মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ নাম তৌহিদ হৃদয়। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে উঠে এসে তিনি ঘরোয়া লিগে ধারাবাহিক রান করে জাতীয় দলে জায়গা করে নেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চাপের মুহূর্তে স্থির থেকে ব্যাট করার ক্ষমতা তাকে আলাদা করে তুলেছে। নেতৃত্বের ভূমিকাতেও তাকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হিসাবে দেখা হচ্ছে। তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং অ্যাডজাস্ট করার ক্ষমতা এবং দায়িত্ব নিয়ে খেলা। আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ তরুণ পারভেজ হোসেন ইমন, যিনি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তার আগ্রাসী ব্যাটিং দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। ছোট বলেই বড় শট খেলার ক্ষমতা তাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। তবে শুধু আক্রমণাত্মক হওয়াই নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের খেলার মধ্যে পরিপক্বতাও আনছেন। অন্যদিকে তানজিদ হাসান তামিম ওপেনিংয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। শুরুতে ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এখন তিনি দায়িত্বশীল ইনিংস খেলছেন। পেস বোলিংয়ে নাহিদ রানা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন শক্তি। ঘণ্টায় ১৪৫ কিমি. বা এর বেশি গতিতে বল করার ক্ষমতা তাকে আলাদা মাত্রায় নিয়ে গেছে। তার উত্থান প্রমাণ করে, গ্রামাঞ্চল থেকেও বিশ্বমানের পেসার তৈরি হতে পারে।

নারী ক্রীড়ার নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াঙ্গন ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। ফুটবল, আর্চারি এবং অ্যাথলেটিক্সে নারীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। দিয়া সিদ্দিকী আর্চারিতে আন্তর্জাতিক পদক এনে প্রমাণ করেছেন, নারীরা শুধু প্রচলিত খেলাতেই নয়, নতুন ক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জন করতে পারে। নারীদের এ উত্থান ক্রীড়াঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। যদিও এখনো অনেক বাধা রয়ে গেছে, তবু নতুন প্রজন্মের নারীরা সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বতারকাদের গল্প

বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের জীবনে একটি সাধারণ বিষয় দেখা যায়-তারা কেউই সহজ পথে আসেননি। লিওনেল মেসি ছোটবেলায় শারীরিক সমস্যার কারণে বড় বাধার মুখে পড়েছিলেন, কিন্তু বার্সেলোনার লা মাসিয়া তাকে নতুন জীবন দেয় এবং তিনি ইতিহাস গড়েন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে বিশ্বসেরা করেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্বকাপ জিতে দেখিয়েছেন যে তরুণ বয়সই বড় অর্জনের বাধা নয়। ইউসরা মারদিনির গল্প আরও ভিন্ন-যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে পালিয়ে সমুদ্রে নৌকা ঠেলে বাঁচিয়ে রাখা জীবন থেকে তিনি অলিম্পিকে পৌঁছান।

ক্যারিয়ার হিসাবে ক্রীড়া

আধুনিক বিশ্বে খেলাধুলা এখন একটি বিশাল অর্থনৈতিক শিল্প। এখানে শুধু খেলোয়াড় নয়, কোচ, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পোর্টস অ্যানালিস্ট, সাংবাদিক, ম্যানেজার এবং ট্রেইনার-সব ক্ষেত্রেই ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশেও এই ক্ষেত্র ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। সঠিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং পরিকল্পনা থাকলে খেলাধুলা একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক পেশা হতে পারে।

স্বপ্নই প্রথম পদক্ষেপ

আজকের কোনো গ্রামের মাঠে ফুটবল খেলছে যে শিশু, কিংবা ক্রিকেট ব্যাট হাতে অনুশীলন করছে যে কিশোরী-তাদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে ভবিষ্যতের তারকা। মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে বা ইউসরা মারদিনির মতো বিশ্বতারকারা যেমন প্রমাণ করেছেন, সাফল্য কোনো জন্মগত সুবিধা নয়, এটি নিরন্তর পরিশ্রম ও স্বপ্নের ফল। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুযোগকে কাজে লাগানো, নিয়মিত অনুশীলন করা এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখা। কারণ প্রতিটি বড় সাফল্যের শুরুটা হয় একটি ছোট স্বপ্ন থেকে।

ফুটবলে নতুন বাস্তবতা

বাংলাদেশ ফুটবল এখন নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে দেশীয় প্রতিভার পাশাপাশি প্রবাসী ফুটবলারদের অংশগ্রহণ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। সবচেয়ে আলোচিত নাম হামজা চৌধুরী। ইংল্যান্ডের পেশাদার ফুটবল কাঠামোতে বড় হওয়া এই মিডফিল্ডার লেস্টার সিটির হয়ে উচ্চ পর্যায়ের ফুটবল খেলেছেন। তার খেলার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পজিশনাল ডিসিপ্লিন এবং ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধিমত্তা। তিনি বাংলাদেশের ফুটবলে এমন এক মানসিকতা নিয়ে এসেছেন, যেখানে পেশাদারিত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শমিত সোম কানাডার পেশাদার ফুটবল লিগের অভিজ্ঞতা নিয়ে মধ্যমাঠে সৃজনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। তার পাসিং এবং গেম রিডিং ক্ষমতা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ফাহমেদুল ইসলাম ইতালির ফুটবল পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন তরুণ, যিনি আধুনিক ইউরোপিয়ান ফুটবল স্টাইল শিখে বড় হচ্ছেন। দেশীয় পর্যায়ে শেখ মোরসালিন বয়সভিত্তিক দল থেকে উঠে এসে জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন এবং তার ড্রিবলিং দক্ষতা তাকে তরুণদের আইকনে পরিণত করেছে। নারী ফুটবলে সাবিনা খাতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম, যিনি গ্রামাঞ্চল থেকে উঠে এসে জাতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বহু সামাজিক বাধা অতিক্রম করেছেন। তার লড়াই শুধু খেলাধুলার নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম