সিন্ডিকেটে জিম্মি কিশোরগঞ্জের বাজার
চোখের জলে ভাসছে শত কোটি টাকার চামড়া
এটিএম নিজাম, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পশুর চামড়ার বাজার বৃহস্পতিবার থেকে বসেছে কিশোরগঞ্জ শহরের পৌর মার্কেট এলাকার মোরগ মহালে। বিশেষ সিন্ডিকেটের কারসাজিতে এখানে দাম মিলছে না পশুর চামড়ার। সরকার নির্ধারিত গরুর চামড়ার মূল্য প্রকারভেদে প্রতি ফুট ৬২-৬৭ এবং ঢাকার বাইরে ৫৭-৬২ টাকা ঘোষণা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০-৩০ টাকা দরে। এছাড়া খাসির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ এবং বকরির ২২ থেকে ২৫ টাকা সরকার নির্ধারিত মূল্য হলেও বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে। ট্যানারিশিল্পসংশ্লিষ্ট শক্তিশালী সিন্ডিকেট চামড়ার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করায় তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বাজার।
এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা কিশোরগঞ্জের পশু চামড়া বাজারের মৌসুমি ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীরা। চোখের জল ফেলে তারা বলছেন, এতে বিনিয়োগ করা পুঁজি ওঠা দূরের কথা, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরিবহণ খরচ মিলিয়ে যে ব্যয় হয়েছে, তাও পাচ্ছেন না তারা।
বিশাল পশু চামড়ার হাটটি ঘুরে দেখা যায়, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নরসিংদী, নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লাখ লাখ পশুর চামড়া নিয়ে এ হাটে এসেছেন মৌসুমি ব্যাপারীরা। কিন্তু ট্যানারি মালিকসংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট সরকার নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেকেরও কম দাম বলায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন এ চামড়ার হাট পরিদর্শনকালে দেখা যায়, ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবহণ খরচ ও লবণ দিয়ে নতুন করে প্রক্রিয়াজাতকরণের যে ব্যয়, তার ভয়ে পানির দরে ট্যানারি মালিকদের হাতে চামড়া তুলে দিয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ফিরছেন বাড়ি। হবিগঞ্জ জেলা থেকে ১২০০ পশুর চামড়া নিয়ে আসা আজিজ মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ভোর থেকে এসব চামড়া নিয়ে বসে আছেন তিনি। কিন্তু দুপুর নাগাদ কোনো ট্যানারি কারখানার মালিক কিংবা প্রতিনিধি কেউ কোনো দাম বলেনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৮শ চামড়া নিয়ে আসা আবদুল কদ্দুস জানান, সিন্ডিকেটের কারণে বাধ্য হয়ে তার এসব চামড়া ৫৭ থেকে ৬২ টাকা ফুটের স্থলে মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকা ফুট দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। এতে তার অন্তত তিন লাখ টাকা লোকসান গুনতে হবে।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌর সদরের বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ৩ হাজার পিস পশুর চামড়া নিয়ে আসা কবীর উদ্দিন বলেন, এখানে কোনো ট্যানারি কারখানার মালিক চামড়া কিনতে প্রকাশ্যে আসছেন না। তারা বাইরে থেকে কিছু দালাল ও সিন্ডিকেটের লোকজন পাঠিয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের হাতেই এখন জিম্মি ঐতিহ্যবাহী এই বিশাল চামড়ার হাট। যে চামড়া কিনতে সব মিলিয়ে তার ৪৫ টাকা ফুট খরচ পড়েছে, সেই চামড়া এখন মাত্র ২৫ থেকে ৩০ টাকা ফুট দরে বিক্রি করছেন। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী ইসলাম উদ্দিনও বরাবরের মতো এবারও ২ হাজার ৫শ চামড়া নিয়ে এ হাটে এসেছেন। এখন পর্যন্ত তার চামড়া বিক্রি হয়নি। তিনি বলেন, ‘সরকার পশুর চামড়ার ভালো দাম বেঁধে দিয়েছে। এমনকি ট্যানারি কারখানাগুলোকে চামড়া কিনতে ঋণ দিয়েছে। কিন্তু তারা দালালচক্র ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পানির দরে নামমাত্র কিছু চামড়া কিনে বাকি বিপুল পরিমাণ টাকা অন্য খাতে ব্যবহার করে মুনাফা লুটছে। আর আমরা চামড়া নিয়ে এখন পথে বসেছি।’
জানা যায়, আগামী বৃহস্পতিবারও এখানে পশুর চামড়ার হাট বসবে। তাই অনেকেই শেষ হাটে ভালো দাম পাওয়ার আশায় বুক বেঁধেছেন।
