Logo
Logo
×

নগর-মহানগর

রেলসেতুর পিলারের গোড়া থেকে মাটি কেটে বিক্রি

জড়িত স্থানীয় একটি চক্র

Icon

আমির হুসাইন স্মিথ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রেলসেতুর পিলারের গোড়া থেকে মাটি কেটে বিক্রি

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জে রেলসেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার তোলা -যুগান্তর

নারায়গঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জ-ইন্দ্রাকপুর এলাকায় রেলসেতুর পিলারের গোড়া থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এ কাজ করছে। এতে ঝুঁকিতে পড়ছে রেলসেতু। ভেকু দিয়ে মাটি কাটার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি নজরে আসলে মাটি কাটা বন্ধ করে দেয় প্রশাসন।

জানা যায়, চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড (সি আর ই সি) ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ সেতুটি নির্মাণ করে। আর নির্মাণ কাজ তদারকি করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট (সিএসসি-সেল)।

স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৫-৬ দিন ধরে স্থানীয় একটি চক্র সেতুর ৮৪ নম্বর পিলার থেকে ৮৭ নম্বর পিলার পর্যন্ত প্রায় ৬ ফুট ভেকু দিয়ে গর্ত করে মাটি কেটে বিক্রি করছিল। চক্রের সঙ্গে জড়িত কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার আবুবক্কর ও তার অনুসারীরা। চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুমতি আছে-এমন কথা বলে পিলারের গোড়ার মাটি ইটভাটায় বিক্রি করেছে তারা। স্থানীয়রা আরও জানান, কয়েকটি পিলারের গোড়া ও আশপাশের মাটি কেটে পার্শ্ববর্তী বোরহান হাজীর ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। তাদের এই অভিযোগের প্রমাণ ওই ইটভাটায় গিয়ে পাওয়া গেছে। ইটভাটার মধ্যে দেখা গেছে সেই মাটির বিশাল স্তূপ। ইটভাটার কর্মচারী সাব্বির হোসেন স্বীকার করেন, ভাটা মালিক বোরহান হাজী মাটি ক্রয় করেছেন। ওই মাটিই স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এ নিয়ে কথা হয় কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টুর সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এভাবে সরকারি স্থাপনার মাটি বিক্রি করা ঠিক না।’ মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা এস এম ফয়েজ উদ্দিন মাটি কেটে নেওয়া স্থান পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, ১৩ জুন সহকারী কমিশনার ভূমি (ফতুল্লা) সার্কেলকে পাঠিয়ে মাটি কাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবগত আছেন।

জানতে চাইলে ফতুল্লার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ইউএনও মহোদয়ের নির্দেশ পেয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। সেতুটি রেলওয়ের হলেও প্রকল্পটির দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনী। যারা মাটি কেটে নিচ্ছেন, তারা জানিয়েছেন-প্রকল্পের নির্মাণকারী সংস্থা চায়না কোম্পানির কাছ থেকে মাটি কাটার ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছেন তারা। এটি এই প্রকল্পের কাজেরই অংশ। যেহেতু এটি নিয়ে একটি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তাই আপাতত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

রেলওয়ে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, ‘রেলওয়ে কখনো এভাবে মাটি কাটার অনুমোদন দেয় না। যারা মাটি কাটছেন, তারা যদি কোনো অনুমোদন আছে বলে থাকেন, তবে সেই কাগজপত্র যাচাই করে দেখতে হবে।’

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানান, কাজের তদারকির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাদের কাছে মাটি কাটার বৈধ কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের কথায় সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে মাটি কাটা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। তাদের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অবগত আছি। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ সেতু নির্মাণ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি ছিল অস্থায়ী রাস্তা নির্মাণ করে মালামাল পরিবহণ করবে। পরবতীতে অস্থায়ী রাস্তার মাটি সরিয়ে নিবে। সে কারণেই অস্থায়ী রাস্তার মাটি কেটে নিচ্ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন হওয়ার কারণে মাটি পিলারের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় মনে হচ্ছে পিলারে নিচের মাটি কেটে নিচ্ছে-বিষয়টি এমন নয়। তারপরও আমরা মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছি। যেহেতু মাটি বসে গিয়েছে, সেখানে আমরা বৃক্ষরোপণ করব।’

স্থানীয়দের দাবি, এভাবে মাটি কেটে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে যারা ফেলেছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

পিলারের গোড়া থেকে অতিরিক্ত মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে-রেলপথমন্ত্রী : এ ব্যাপারে সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, পিলারের নিচের মাটি খুঁড়ে নেওয়া হয়েছে, বিষয়টা এরকম না। পিলারের গোড়া থেকে অতিরিক্ত মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ওখানে যখন ব্রিজ হয়েছে, কিছু প্রতিবন্ধকতা কিন্তু রাখা হয়, ছোট ছোট ব্যারিয়ার তৈরি করা হয়। সেখান থেকে মাটি সরানো হয়েছিল। মন্ত্রী আরও বলেন, এটা (মাটি) কনস্ট্রাকশনের অংশ হিসাবে থাকে, কিন্তু দীর্ঘদিন সরানো হয়নি। ওটা একটু উঁচু হওয়ায় ওখান থেকে আবার মই দিয়ে কিছু জিনিস চুরি হয়েছে বা হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে সার্বিক বিবেচনায় ওটা (মাটি) সরানো হয়েছিল। অতিরিক্ত মাটি ছিল, অবস্ট্রাকল তৈরি করার জন্য, কনস্ট্রাকশন কাজের সহায়ক হিসাবে। এখন ওখানে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম