Logo
Logo
×

নগর-মহানগর

টিকে থাকার লড়াইয়ে শিল্পীরা

বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে সার্কাস

ম্লান আলোয় লোকমঞ্চ পর্ব-১

মুহম্মদ আকবর

মুহম্মদ আকবর

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে সার্কাস

নীলফামারীর সৈয়দপুরের ‘দি গ্রেট রওশন সার্কাস’র একটি পরিবেশনা -সংগৃহীত

ইউরোপে সৃষ্ট সার্কাসশিল্প বিকাশের পথ ধরে, নানা দেশ ঘুরে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করে। এক সময় বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং যুক্ত হয় লোক ঐতিহ্যের তালিকায়। গ্রামীণ উৎসব কিংবা জনসমাগমের স্থানে বিশাল তাঁবু খাটিয়ে অ্যাক্রোবেটিকস, ক্লাউনের কৌতুক, জীবজন্তুর কসরত এবং রোমাঞ্চকর নানা খেলা নিয়ে দর্শককে আনন্দ দেয় ভ্রাম্যমাণ সার্কাস দলগুলো। কিন্তু আধুনিক বিনোদনের বিস্তার, আর্থিক সংকট, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, প্রদর্শনীর অনুমোদন না পাওয়া, অশ্লীলতা, জুয়াসহ নানা কারণে এই শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লোক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সব শিল্পের প্রতি কমবেশি নজর দেওয়া হলেও সার্কাসের মঞ্চে উঁকি দিচ্ছেন না পৃষ্ঠপোষকরা। ফলে ম্লান আলোয় ক্রমশ আবছা হচ্ছে এই সার্কাসের মঞ্চ। এমন বাস্তবতায় এসব শিল্পী সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছেন।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম যুগান্তরকে বলেন, সার্কাসের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পমাধ্যমগুলো নানা সংকটে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো মূল ধারার সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। আমরা এগুলোকে নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। এরই অংশ হিসাবে মঙ্গলবার দিনব্যাপী সার্কাস শিল্পবিষয়ক সেমিনার ও প্রশিক্ষণ হলো। সেমিনারে প্রবন্ধপাঠে লোক গবেষক ড. সাইমন জাকারিয়া বলেন, বাংলাদেশের সার্কাস আজ সংকটে। কিন্তু এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়; সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক, নৈতিক এবং নীতিগত সংকটও বটে। একদিকে সার্কাসে পশু প্রদর্শন নিয়ে আইনগত জটিলতা ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে সার্কাসের ঐতিহ্যগত কসরত প্রশিক্ষণ, দলজীবন ও মেলা সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। আবার সার্কাস মালিকদের বক্তব্যে শোনা যায়, অনুদানের চেয়ে অনুমোদন বেশি জরুরি মনে করছেন।

জানা যায়, সার্কাসের জন্ম ইতালির রোমে। কালের বিবর্তনে বাংলাদেশের লোক ঐতিহ্যে এটি ব্যাপকভাবে জায়গা করে নেয়। এর আগে তামাম ইউরোপ আমেরিকা ছড়িয়ে পরে এই শিল্প। পরে চীনের শৈল্পিক কসরত, রাশিয়ার ব্যালে, আমেরিকার কমেডি আর জীবজন্তুর বশ্যতা সব কিছু মিলেমিশে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভ্রাম্যমাণ সার্কাস তখন ছড়িয়ে যায় পুরো বিশ্বে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে এরকমই এক ইতালিয়ান সার্কাস দল উপস্থিত হয় ভারতের কেরালা রাজ্যে। ইউরোপ, আমেরিকা, চীন ও রাশিয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে কেরালায় আসা সার্কাসে লাগে নতুন হাওয়া। সেখানে নতুন উদ্যোগে তৈরি হয়ে সার্কাস দল ও সার্কাস স্কুল। যে কারণে কেরালাই ভারতের সার্কাস ইতিহাসের পুণ্যভূমি হয়ে আছে। এই হাওয়া ছড়িয়ে পড়ে অবিভক্ত ভারত বর্ষের এই পূর্ববঙ্গেও। এখানে সার্কাস দল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে। সার্কাস দলের নাম ‘দি লায়ন সার্কাস’। ব্রিটিশ পিরিয়ডে এই পূর্ববঙ্গে আরেকটি যে সার্কাস দলের অস্তিত্বের কথা জানা যায় সেটি হলো রাধিকা মোহন মোদক প্রতিষ্ঠিত ‘দি বেবি সার্কাস’। বেবি বা শিশু বেড়ে ওঠে বড়দের অনুকরণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশের আগে ও পরে মিলে সার্কাস শিল্প দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক যুগে এই শিল্পটি দুরাবস্থায় পড়েছে। সংকটে পড়েছেন এসব শিল্পীরা। ফলে নতুন করে সার্কাস শিল্পে আসার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না কেউ।

চলচ্চিত্র ও মঞ্চ নাটকে সার্কাস : পেশাজীবী সার্কাসশিল্পী তৈরি হলেও বিশ্বের বহু দেশে এই শিল্পের অবস্থা অতটা ভালো নয়। তাইতো ১৯২৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বিশ্বখ্যাত মূকাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দি সার্কাস’ কিংবা বাংলাদেশের নাট্য সংগঠন প্রাচ্যনাটের আলোচিত মঞ্চ নাটক ‘সার্কাস সার্কাস’-এ সার্কাসশিল্পীদের জীবনসংগ্রাম উঠে এসেছে। সেখানে অনিয়মিত প্রদর্শনী, দারিদ্র্য, প্রশিক্ষকের অভাব, দর্শক সংকট, চাঁদাবাজি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে একের পর এক সার্কাস দল হারিয়ে যাওয়ার করুণ সুর তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ সার্কাস মালিক সমিতির সভাপতি ও মানিকগঞ্জের বিউটি সার্কাসের মালিক আবিদ হাসান আরমান যুগান্তরকে জানান, অনুমতি জটিলতা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সংকটে সার্কাস শিল্প। তার জানামতে ঢাকার কেরানীগঞ্জ, দোহার, মানিকগঞ্জ, বরিশাল, সাতক্ষীরা, সৈয়দপুরসহ সারা দেশে ১৮টির মতো দল টিকে আছে। যাত্রাশিল্পী ও শিল্পের বিষয়ে সরকার আগ্রহ দেখাচ্ছে, অনেকে ভাতা দিচ্ছে কিন্তু সার্কাসশিল্পীদের জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ একজন দক্ষ সার্কাস খেলোয়াড় তৈরি করতে ১০ বছর পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দিতে হয়।

আরমান জানান, তার বিউটি সার্কাসে প্রায় ৯৯ জন শিল্পী ও কর্মী রয়েছেন। অন্য দলগুলোতে প্রায় এমন জনবল আছে। প্রদর্শনী থাকুক বা না থাকুক, তাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়। ফলে দীর্ঘ সময় শো না থাকলে লোকসানের পরিমাণ বেড়ে যায়। সার্কাস প্রদর্শনী চলাকালীন দলের প্রতিদিনের ব্যয় ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। খেলোয়াড়, কর্মী, পরিবহণ, জীবজন্তুর খাদ্য ও চিকিৎসা, প্রচার-প্রচারণা এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের বিপুল ব্যয় মেটাতে হয় মূলত টিকিট বিক্রির অর্থ থেকে। আয়োজক কমিটিকে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ কমিশনও দিতে হয়। দর্শক কমে গেলে লোকসান অনিবার্য হয়ে ওঠে। সৈয়দপুরের দি গ্রেট রওশন সার্কাস দলের মালিক আফতাব মিয়া বলেন, ৬ মাস ধরে কোনো প্রদর্শনী করতে পারছেন না। বড় জটিলতা অনুমতি না পাওয়া। ডিসি, এসপি, ইউএনও ও ওসি এসব জায়গা থেকে ক্লিয়ারেন্স আসতে সময় চলে যায়। কথা হয় দেশের দুই জেলার ডিসির সঙ্গে। নীলফামারী জেলার ডিসি মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, সার্কাস প্রদর্শনীর অনুমোদন এই সময় কেউ চাননি। তবে মেলার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ডিসি আবুসাঈদ বলেন, পুলিশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া আমরা অনুমোদন দেই না। কারণ এসবের নামে জুয়া, লটারি ও অশ্লীল কর্মকাণ্ড হয় কিনা খোঁজ নিয়ে অনুমোদন দেই।

সার্কাস উন্নয়নে প্রশিক্ষণ আধুনিকায়ন জরুরি : বাংলাদেশের সার্কাসশিল্পীরা অ্যাক্রোবেটিকস, রশি নৃত্য, ট্রাপিজ, আগুনের খেলা, ভারসাম্যের খেলা, মোটরসাইকেলসহ নানা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশনা করে থাকেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের নেই কোনো বীমা বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা। দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসা শেষে অনেককেই পেশা ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষতার দিক থেকে বাংলাদেশের সার্কাসশিল্পীরা আন্তর্জাতিক মানের শিল্পীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। কিন্তু আধুনিক প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত পোশাক, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অভাবে তারা পিছিয়ে রয়েছেন। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সার্কাস দলগুলোকে নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় থাকা দলগুলোকেও প্রশিক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সার্কাস দলগুলোর অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গেলে তারা অনুমোদন পেতে সমস্যার মুখে পড়ে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্পকলার মহাপরিচালক বলেন, যদি কোনো জেলায় অনুষ্ঠান করতে চায়, তাহলে দরখাস্ত বা আবেদন করতে হবে। আবেদন করলে আমরা প্রয়োজনীয় অনুমতি দিয়ে থাকি।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম