Logo
Logo
×

নগর-মহানগর

প্রক্রিয়া যাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনের হাতে

প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে আসছে নতুন নিয়ম

হুমায়ুন কবির

হুমায়ুন কবির

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে আসছে নতুন নিয়ম

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বদলিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, অনিয়ম, তদবির ও দুর্নীতির অভিযোগ আমলে নিয়ে সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও সিটি করপোরেশনসহ চার স্তরে পৃথক কমিটি করা হবে। প্রত্যেক কমিটিতে স্থানীয় পর্যায়ের দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তি সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবেন। কমিটিগুলো বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেবে। তাদের মাসে অন্তত একটি সভা করতে হবে। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের বিস্তারিত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে। নতুন নিয়ম বাস্তবায়ন হলে বদলির ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দীর্ঘ প্রশাসনিক ধাপ আর পার করতে হবে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের জটিলতা ও ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে। কিন্তু কমিটিগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালীদের দেওয়া হলে এই প্রক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘শিক্ষকদের বদলি এখন থেকে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে গঠিত কমিটির কাছে শিক্ষকরা আবেদন জমা দেবেন। কমিটিগুলো প্রতি মাসে একবার সভা করে আবেদনগুলো পর্যালোচনা করবে এবং বদলি অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’

তিনি বলেন, ‘অতীতে শিক্ষক বদলিকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। সেই সুযোগ বন্ধ করতেই বদলি কার্যক্রমকে স্থানীয় প্রশাসনের আওতায় আনা হচ্ছে। আমরা চাই দুর্নীতির সব পথ বন্ধ হয়ে যাক।’

এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, ‘শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে বদলি-পদায়নকে ঘিরে অস্থিরতা অনেকটাই কমে আসবে। এতে অনিয়ম ও দুর্নীতিও কমে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘যদিও দুর্নীতি ও তদবিরের সুযোগ কমাতে নতুন নিয়ম করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ের সদস্য নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে অতীতের মতো প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ, তদবির ও অনিয়মের সুযোগ থেকে যাবে। এতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের সুফল পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।’ নতুন নিয়মে দেখা যায়, একই উপজেলা বা থানার মধ্যে বদলির আবেদন প্রথমে উপজেলা বা থানা পর্যায়ের কমিটিতে বিবেচিত হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ের দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তি সদস্য থাকবেন। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সদস্য-সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটির অনুমোদনের পর উপজেলা বা থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বদলির আদেশ জারি করবেন। এছাড়া একই জেলার এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় বদলির আবেদন জেলা পর্যায়ের কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে। জেলা প্রশাসক এই কমিটির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা), জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তি সদস্য হিসাবে থাকবেন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বদলির আদেশ জারি করবেন।

বিভাগীয় পর্যায়ে বদলির ক্ষেত্রে, একই বিভাগের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলির আবেদন বিভাগীয় কমিটির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বাধীন এ কমিটিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি এবং দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তি সদস্য হিসাবে থাকবেন। বিভাগীয় উপপরিচালক (প্রাথমিক শিক্ষা) সদস্য-সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বদলির আদেশ জারি করবেন। এছাড়া সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরে কিংবা এক সিটি করপোরেশন থেকে অন্য সিটি করপোরেশনে বদলির জন্য কাজ করবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কমিটি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রাজস্ব) এই কমিটির সভাপতি থাকবেন। সদস্য হিসাবে থাকবেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (বিদ্যালয়), প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এবং দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) সদস্য-সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন।

জানা যায়, আগের নিয়মে নির্দিষ্ট সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বদলির আবেদন আহ্বান করত। আবেদনগুলো অনলাইনে জমা হওয়ার পর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা যাচাই করে জেলা পর্যায়ে পাঠাতেন। পরে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হয়ে আবেদনগুলো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পৌঁছাত এবং অধিদপ্তরের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর বদলি কার্যকর করা হতো। এই দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর নানা ধরনের অভিযোগ, তদবির ও আর্থিক লেনদেনের কথা সামনে আসে। অনেক শিক্ষক অভিযোগ করেন, কাঙ্ক্ষিত বদলি পেতে তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, যদি এসব পদে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে শিক্ষাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বা গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অন্যথায় বদলি প্রক্রিয়া পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অর্থাৎ নতুন নিয়মের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে কমিটিগুলোর নিরপেক্ষতা, সদস্য নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক নজরদারির ওপর।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম