রাজস্ব আদায়ের কঠিন অঙ্ক
লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিশাল এক রূপরেখা ঘোষণা করেছে। তবে এই ব্যয়ের সংস্থান করতে গিয়ে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সক্ষমতার নিরিখে এক কঠিন অঙ্ক হিসাবেই বিবেচিত হচ্ছে। রোববার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এই লক্ষ্যমাত্রা ১৮ শতাংশ বেশি হলেও, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির মতে, আদায়ের প্রকৃত বাস্তবতায় এই প্রবৃদ্ধির হার ৫৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। রাজস্ব আদায়ের এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি গঠন করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬.৮ শতাংশ, যা প্রস্তাবিত বাজেটে ৯.২ শতাংশে উন্নীত করার এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং সিপিডির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, অতীতের ধারাবাহিকতা ও রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতার অভাবে এই লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত দুরূহ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রাজস্ব আদায়ের চিত্র বলছে, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে বছরের শেষ তিন মাসেই ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে-যা কার্যত অসম্ভব। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হলে সরকারকে হয় বিশাল ঋণের জালে জড়াতে হবে, নতুবা উন্নয়ন প্রকল্প ও বাজেট বাস্তবায়ন থেকে পিছু হটতে হবে। অবশ্য সরকার এই পাহাড়সম লক্ষ্য অর্জনে ছয়টি কৌশল এবং ‘থ্রি আর’ (রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন) পদ্ধতির কথা ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টার মতে, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় এনে ক্যাশলেস সোসাইটি গঠন করতে পারলে রাজস্ব আদায় স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।
কর প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর, করনীতি ও প্রশাসন পৃথকীকরণ এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগগুলো অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক। বিশেষ করে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে কর জাল সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল সেবার ওপর ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তগুলো রাজস্বের নতুন উৎস তৈরি করবে। তবে শুধু কৌশলের ঘোষণা বা আইনি কড়াকড়ি যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। প্রথমত, কর প্রশাসনের অটোমেশন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে করদাতার হয়রানি কমে এবং স্বচ্ছতা বাড়ে। দ্বিতীয়ত, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া কর ফাঁকি ও জালিয়াতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তৃতীয়ত, বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের যে বিশাল চাপ তৈরি হয়েছে, তা সামলাতে অনুৎপাদনশীল খাতে নতুন ঋণ নেওয়া বন্ধ করতে হবে।
বলা বাহুল্য, একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সরকার যদি করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়াতে পারে এবং কর ফাঁকি রোধে প্রশাসনিক দক্ষতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে, তবেই এই কঠিন অঙ্ক মেলানো সম্ভব হবে। অন্যথায়, বিশাল বাজেটের এই স্বপ্নের কাব্য সম্পদের সীমাবদ্ধতায় কেবল কাগুজে দলিলেই বন্দি থেকে যাবে। সরকারের উচিত রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে একটি ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগনির্ভর কর কাঠামো গড়ে তোলা।
