ঝিনাইদহে পাটওয়ারীর ওপর হামলা, ডিম নিক্ষেপ
সংঘর্ষে আহত অন্তত ৫
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ঝিনাইদহে শুক্রবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এ সময় পিস্তল বের করছেন দলটির কর্মী আশিক -সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা, ডিম ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজ শেষে জেলা শহরের পুরাতন কালেক্টরেট মসজিদ চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। এতে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত পাঁচজন। এই হামলার জন্য নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপিকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে ছাত্রদল বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সর্বশেষ খবরে জানা যায়, ঘটনার পরপরই এনসিপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে পাটওয়ারী ঝিনাইদহ সদর থানায় মামলা করতে যান। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর রাত সোয়া ৯টার দিকে তার মামলা রেকর্ড করা হয়।
এ সময় থানার বাইরে বিক্ষোভ করছিলেন ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীরা। এদিকে দুপুরে সংঘর্ষ চলার একপর্যায়ে এনসিপির দুই কর্মীকে পিস্তল উঁচিয়ে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। পরে তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ পায়। তারা সদর উপজলার কাষ্টসাগরা গ্রামের মৃত বাদশার ছেলে আশিক ও মাস্টারপাড়ার সিয়াম বলে জানিয়েছে ছাত্রদল। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিকাল ৪টার দিকে শহরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে এই দুই অস্ত্রধারীকে শিবিরকর্মী বলে দাবি করেন। এদিকে রাতে থানার প্রধান ফটোকে শত শত ছাত্রদল যুবদল নেতাকর্মী অবস্থান নেয়। এ পর্যায়ে তারা গেট ভেঙে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। ইটপাটকেল বাঁশ লাঠি নিয়ে থানার প্রধান ফটকে হামলা করে তারা। দীর্ঘ সময় চলতে থাকে এ হামলা। থানার ভিতরে পুকুর পাড়ে বোমা সদৃশ্য দুটি বস্তু পাওয়া যায়। পরে পুলিশ বস্তু দুটি পানিতে ছুড়ে ফেলে দেয়। অবশেষে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে থানার গেট থেকে সরে যায় ছাত্রদল কর্মীরা। রাত ৯টা ৫০ মিনিটে বিশেষ পুলিশ পাহারায় থানা থেকে বের হন পাটওয়ারী।
ইবি ছাত্রদলের সভাপতি শাহেদ, জেলা সভাপতি ইমরান হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার রাসেল, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সৌমেনসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১১০ জনের নামে মামলাটি দায়ের করে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজা।
এদিকে থানার প্রধান ফটক ছেড়ে বিক্ষোভ মিছিলসহ বিএনপি কর্মীরা স্থানীয় পায়রা চত্বরে সমবেশ করেন। সেখানে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ। তারা এনসিপির কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুমার নামাজের পরপরই মসজিদ থেকে বের হয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল আহ্বায়ক শাহেদ আহমেদের সঙ্গে কথা বলেন পাটওয়ারী। এর পরপরই হামলা শুরু হয়। ডিম নিক্ষেপসহ পাটওয়ারীকে কিল-ঘুসি মারতে থাকে হামলাকারীরা। হামলাকারীদের হাতে ছিল লোহার রড, লাঠিসোঁটা ও হকিস্টিক। এ সময় দিগ্বিদিক দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে সাধারণ মানুষ। একপর্যায়ে নেতাকর্মী বেষ্টিত হয়ে বিক্ষোভ মিছিলসহ মসজিদ এলাকা থেকে বের হন তিনি। এরপর সোজা চলে যান সদর থানায়। ডিমে লেপটে যাওয়া পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় সদর থানার ওসির কক্ষে অবস্থান নেন তিনি।
জানতে চাইলে সেখানে বসেই নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি প্রত্যেকটা জুমা এক-এক মসজিদে পড়ি। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আমি ঝিনাইদহ ডিস্ট্রিক্ট কালেটরেটের বাসভবনের বিপরীতে কোর্ট মসজিদে জুমার নামাজ পড়ি। নামাজ শেষ করে বের হওয়ার পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক শাহেদ আমাদের প্রথমে বাধা দেন এবং আতঙ্কগ্রস্ত করেন। আমরা তখনো তাদের আইডেন্টিফাই করতে পারিনি। এরপর তারা সরাসরি এসে পরিচয় দেন তারা ছাত্রদলের লোক। একটু পর আমার ওপর ডিম ছুড়ে মারা হয় এবং আমাকে ঘুসি দেওয়া হয়। এরপরই তারা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে আমাদের ওপর। এরপর তারা হকিস্টিক দিয়ে আমাদের সবাইকে বেদম পিটুনি শুরু করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ওপর হামলার সময় ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপি, পুলিশ একসঙ্গে ছিল।’
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আরও বলেন, ‘আমাদের এখানে অনেকে বলছেন যে, এটার বিষয়ে উপরের মহল থেকে ইন্ধন রয়েছে। যিনি আইনমন্ত্রী, আসাদুজ্জামান, তার। এখানে যিনি বিএনপির জেলা সভাপতি, মজিদ নামে একজন আছেন, যিনি এখানে একজন চাঁদাবাজ এবং চাঁদাবাজদের গডফাদার, তিনি এখানে রয়েছেন এবং এই পৌর যে ছাত্রদল আছে, তারপর এখানে ছাত্রদলের যারা সভাপতি, সেক্রেটারি মোটামুটি সবাই এখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তারা আমাদের উপরে ডিরেক্টলি হামলা করেছেন। আমাদের কয়েকজন হসপিটালে চিকিৎসা নিয়েছে, কারও দুটা সেলাই, তিনটা সেলাই লেগেছে। আমরা সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়াতে পাবলিশ করছি প্রমাণস্বরূপ। ইনশাআল্লাহ আমরা আশা করি বাংলাদেশে আমরা তাদের বিচার করতে সক্ষম হব।’ তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে নাসীরুদ্দীন বলেন, ‘কোনো কমপ্রোমাইজ করব না। আমরা যেহেতু রক্ত দিয়েছি, রক্তের ওপর দিয়েই আমাদের জীবন চলতে হবে। আমরা আমাদের প্রোগ্রাম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মসূচি সবকিছুই চালিয়ে যাব। আমরা হামলায় ভীত নই।’
হামলার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ওপর হামলার কারণ হলো, কয়েক দিন আগে সীমান্তে নাগরিকদের হত্যা করা হয়েছে, আমি এটা নিয়ে শক্ত প্রতিবাদ করেছিলাম। তিস্তা নদীর দীর্ঘদিনের তাদের যে দাবি, সেটা নিয়ে আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। সম্প্রতি যে ধর্ষণগুলো হচ্ছে, সেটা নিয়ে আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। আমি বাংলাদেশে যে মাদক আছে সেগুলো বন্ধ করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলাম। তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এটা পার্সোনাল ইগোতে নিয়ে এ ধরনের হামলা, ইন্ধন দিয়েছেন বলে আমি মনে করি।’
ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল : ঝিনাইদহে এনসিপি কর্তৃক ছাত্রদলের ওপর অপবাদের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। শুক্রবার বিকালে জেলা ছাত্রদলের আয়োজনে শহরের শহীদ মিনার চত্বর থেকে এ বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে পায়রা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ইমরান হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার রাসেল, ইবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক শাহেদ আহমেদসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে বক্তারা বলেন, এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে কে বা কারা ডিম নিক্ষেপ ও হামলা করেছে তা আমাদের জানা নেই। অথচ ছাত্রদলকে দোষ দেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় ছাত্রদল। সেই সঙ্গে ঘটনার তদন্তের দাবি জানান বক্তারা।
মব করতেই ঝিনাইদহে গিয়েছিলেন পাটওয়ারী, অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার দাবি-ছাত্রদল সম্পাদক : জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত, সমালোচিত, মব ও সংঘাত উসকে দেওয়া ব্যক্তি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। শুক্রবার বিকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি মন্তব্য করেন। স্ট্যাটাসের সঙ্গে তিনি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গী দাবি করে দুই অস্ত্রধারীর কয়েকটি ছবি ও তাদের পরিচয় পোস্ট করেন।
তিনি আরও লিখেন, ‘শুক্রবার ঝিনাইদহে গিয়েছিলেন মব করার জন্য, কিন্তু সেখানে সাধারণ জনতা পাটওয়ারীকে ডিম নিক্ষেপ করেছে। এ সময় তার সঙ্গে থাকা সন্ত্রাসীরা সাধারণ জনতার উদ্দেশে গুলি করার চেষ্টা করে।’ অস্ত্রধারী দুজনের পরিচয় প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘অস্ত্রধারী দুজন শিবিরের সন্ত্রাসী। তাদের একজন সিয়াম উদ্দিন তুর্য (পাঞ্জাবি পরা)। তার বাবা জামায়াতের নেতা সল্টু মাস্টার (শিক্ষক, বদরগঞ্জ মাদ্রাসা)। আরেকজন আশিক (টি-শার্ট পরা)। তার বাবা বাদশা (মৃত)। তিনি শিবিরের নেতা।’ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আরও লিখেন, ‘অনতিবিলম্বে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কাছে অস্ত্রধারী এই দুজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতারের জোর অনুরোধ রইল।’
নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় জামায়াতের নিন্দা: ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর ওপর হামলা ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। শুক্রবার বাদ জুমা এ হামলার ঘটনা ঘটে। পরে এক বিবৃতিতে জামায়াত নেতা এই নিন্দা জানান।
বিবৃতিতে অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তাই বলে ভিন্নমতের কারণে হামলা, সহিংসতা ও অপমানজনক আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই ঘটনা রাজনৈতিক সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থি।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গনে সহিংসতা, উসকানি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। প্রত্যেক রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল রাখার জন্য সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সচেতন নাগরিকের প্রতি আহ্বান জানান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
