বিরোধী দলের জন্য অপেক্ষা না করার সিদ্ধান্ত সরকারি দলের
সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি বাজেট অধিবেশনেই
সবার মতামত নিয়ে সংশোধনের কাজটি সম্পন্ন করতে চাই -চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি
ফাইল ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সংশোধন নাকি সংস্কার-এই বিতর্কের মধ্যেই আসন্ন বাজেট অধিবেশনেই সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের কাজটি শেষ করতে চায় সরকারি দল বিএনপি। সদ্য শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নাম না দেওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত তা ভেস্তে যায়। এ অবস্থায় বিরোধী দলের জন্য অপেক্ষার নামে অযথা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটতে চান ক্ষমতাসীনরা।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। ওই কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্যের নাম দিতে বলা হয়। কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৬ বিধি অনুসারে এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা ১২ জনের নামের তালিকা ঠিক করেছি। ট্রেজারি বেঞ্চের এই ১২ জনের মধ্যে বিএনপি থেকে সাতজন এবং অন্য দল ও স্বতন্ত্রদের মধ্য থেকে পাঁচজন রাখা হয়েছে। এ সময় বিরোধী দলের কাছে পাঁচজনের নাম চেয়ে তিনি বলেন, তারা নাম দিলে আমরা এ কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধন এবং জুলাই সনদকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে চাই।
আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবের জবাবে বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদে জানান, তারা সংবিধান সংস্কার চান, তবে বর্তমানে যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তা মূলত সংশোধন প্রক্রিয়ার দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে আগে থেকেই মতপার্থক্য রয়েছে এবং তা এখনো বিদ্যমান। তিনি এজন্য আরও সময় নেন। জামায়াত-এনসিপি জোটের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটিতে পাঁচ সদস্যের নাম না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত আর এই কমিটি গঠন করা যায়নি।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি যুগান্তরকে বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে আমাদের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই। বর্তমান সংবিধানকে ভিত্তি ধরেই প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে চায় সরকারি দল। এই সংবিধানের অনেক কিছুই সংশোধন করতে হবে। এজন্য জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলের সদস্যদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা সব দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চাই। চাই সবার মতামত নিয়ে সংবিধান সংশোধনের কাজটি সম্পন্ন করতে। তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নাম পাওয়া গেলে আগামী অধিবেশনেই কমিটি গঠনের কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি দলের সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবে জামায়াত জোটের প্রকাশ্যে নেতিবাচক অবস্থান থাকলেও ভেতরে চলছে অন্য হিসাব। প্রস্তাবিত বিশেষ কমিটিতে নাম দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি তারা। জামায়াতের একাধিক নেতা মনে করেন, সংবিধান সংস্কারের বদলে সংশোধন কমিটিতে গেলে সরকারকে নিজেদের মতো করে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার বৈধতা দেওয়া হতে পারে। তাই ওই কমিটিতে না যাওয়ার পক্ষে জামায়াতের ভেতরে জোরালো মত রয়েছে। ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সর্বশেষ বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, কমিটিতে নাম দেওয়ার বিষয়ে জোটের নেতাদের মনোভাব নেতিবাচক।
এদিকে বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি থেকে পাঁচজন সদস্যের নাম পাওয়া না গেলে তাদের ছাড়াই সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, তারা সবার অংশগ্রহণে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে আগ্রহী। কিন্তু বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়া গেলে ‘একলা চলো নীতি’ গ্রহণ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশেষ কমিটি গঠন ও সংবিধান সংশোধন করা হবে। কারণ, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে সংবিধানের বেশকিছু সংশোধন প্রয়োজন।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেও সাংবিধানিক সংস্কারে ৩৫টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে দলটির ইশতেহারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসাবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন, একজন উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি, প্রধানমন্ত্রী পদে এক ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকার বিধান, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংসদে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, দুইজন ডেপুটি স্পিকার পদ সৃষ্টি, উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী রাখা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, দলনিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে সরকারি দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন সংসদ-সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন সম্ভব না হওয়ায় এ সম্পর্কিত কাজ অনেকটা পিছিয়ে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি বিরোধী দলকে নিয়েই কমিটি করতে এবং জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করতে। কিন্তু তারা সহযোগিতা না করলে আমরা তো বসে থাকতে পারব না। জাতির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং তা দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, বিরোধী দলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। ৭ জুন সংসদের দ্বিতীয় ও বাজেট অধিবেশন শুরু হবে। তখন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নাম দেওয়া না হলেও এই কমিটি গঠন করা হবে বলে জানান তিনি।
যদিও বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের নজির জাতীয় সংসদে রয়েছে। ২০১০ সালে নবম জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ১৫ সদস্যের কমিটিতে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে তিনজন সদস্যের নাম দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি তাতে সাড়া দেয়নি।

