অভিষেকেই বিশ্বজয় এক গোলরক্ষকের
পারভেজ আলম চৌধুরী
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কে যেন ঠিকই বলেছেন, স্বপ্নের কোনো প্রাচীর নেই। আকাঙ্ক্ষার মেয়াদ কখনো ফুরায় না। ভোজিনিয়া তার প্রমাণ। বয়স ৪০। এই বয়সে কেপ ভার্দের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই পাদপ্রদীপের আলোয় তিনি। ‘নোবডি’ থেকে ‘সামবডি’। স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য গোলশূন্য ড্র হওয়া ম্যাচের মহানায়ক এই দীর্ঘদেহী গোলপ্রহরী। এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট স্পেনকে আটকে দেওয়ার সিংহভাগ কৃতিত্ব ভোজিনিয়ার। নয়টি অকল্পনীয় সেভ তার মাথায় পরিয়ে দিয়েছে ম্যাচসেরার মুকুট। শেষ বাঁশি বাজার পর ভোজিনিয়ার দুচোখে প্লাবন। ছেলে নিজের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই জীবনের চেয়ে বড় চরিত্র হয়ে উঠল, অথচ সন্তানের ইতিহাস গড়ার মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হতে পারলেন না মা গ্যালারিতে বসে। ভিসা না পাওয়ায় আসতে পরেননি তিনি যুক্তরাষ্ট্রে।
ভোজিনিয়ার খুব ইচ্ছা ছিল, বিশ্বকাপে তার অভিষেকলগ্ন মা চাক্ষুষ করবেন স্টেডিয়ামে বসে। এই ম্যাচ ছিল কেপ ভার্দের গোলরক্ষকের ‘সারা জীবনের সঞ্চয়’। স্পেনকে রুখে দিয়ে ইতিহাস গড়ার পর দুচোখে অশ্রুর দীপ জ্বালিয়ে ভোজিনিয়া বলেন, ‘এ মুহূর্তের জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করেছি। একটাই দুঃখ-মা দর্শকসারিতে বসে আমার খেলা দেখতে পারলেন না। আমার দাদা-দাদি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারিনি।’
ভোজিনিয়া তার ডাকনাম। আসল নাম হোসিমার হোসে ইভোরা দিয়াস। পর্তুগিজ ভাষায় ভোজিনা শব্দের অর্থ দাদি।
১৩ বছর ধরে ভোজিনিয়া কেপ ভার্দের এক নম্বর গোলরক্ষক। আটলান্টিক মহাসাগরে ১০টি দ্বীপ নিয়ে মাত্র ৪,০০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের খুদে রাষ্ট্র কেপ ভার্দের জনসংখ্যা ছয় লাখেরও কম। ফিফা র্যাংকিংয়ে তাদের অবস্থান ৬৯তম। ২০২৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকার যে ১০টি দেশ খেলছে, তাদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। উলটোদিকে স্পেন ২০১০-এর চ্যাম্পিয়ন এবং এবারের অন্যতম ফেভারিট। এটি তাদের ১৭তম বিশ্বকাপ এবং টানা ১৩তম। সেই তারাই কেপ ভার্দের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই হোঁচট খেল। এতেই বোঝা যায়, ফুটবল অঘটন পছন্দ করে। আর সেই অঘটনের কেন্দ্রে থাকেন এমন একজন, প্রথম আবির্ভাবেই যিনি সব আলো কেড়ে নেন নিজের দিকে। ৯০ মিনিটের ম্যাচ কি না পারে। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ইনস্টাগ্রামে ভোজিনিয়ার অনুসারী ছিল মাত্র ৪৫ থেকে ৫০ হাজার।
সেটি এখন ৭০ লাখ।
গত পরশু রাতে আটলান্টায় কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ অভিষেক স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল করার পর ভোজিনিয়াকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল সব ক্যামেরা। ‘চল্লিশে চালশে’ প্রবাদবাক্য মিথ্যা প্রমাণ করে ভোজিনিয়া বললেন, ‘আমার কান্না নানা-নানির জন্য। দুর্ভাগ্যবশত আজ তারা এখানে ছিলেন না। কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তারাই ছিলেন আমার সব। মায়ের জন্যও কেঁদেছি। ভিসা না পাওয়ায় মা আসতে পারেননি। ভিসার জন্য অর্থ জোগাড় করতে পারিনি সময়মতো। ভীষণভাবে চেয়েছিলাম, মা স্টেডিয়ামে বসে আমার খেলা দেখবে। হলো না।’ নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই স্পেনের মতো ইউরোপের পরাশক্তিকে রুখে দেওয়ার রহস্য কী? ভোজিনিয়ার উত্তর, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ। এটাই আমাদের অস্ত্র। নিজেদের পরিবারের মতো আমরা দলটাকেও আগলে রাখি। এটাই আমাদের শক্তি। সবাই ভেবেছিল, আমরা বিশ্বকাপ উপভোগ করতে এসেছি। কিন্তু আমরা জানি, সম্মান আমাদের দলের প্রাপ্য। আশা করি, জয়ের মুখ দেখব। এমনকি দ্বিতীয় রাউন্ডেও যেতে পারি। এই ম্যাচে যা খেলেছি, এর থেকেও ভালো খেলার চেষ্টা করব।’
