পার্বত্যমন্ত্রীর পদত্যাগে ‘ঝড়’
পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ
সুশীল প্রসাদ চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগে পাহাড়ের রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো পার্বত্য জেলার অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ প্রতিবাদ-বিক্ষোভে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। তার পদত্যাগের ইস্যুটি তিন পার্বত্য জেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। এই ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ঝড়’ বইছে। স্থানীয় নেতাদের একের পর এক ফেসবুক পোস্টে উঠে আসছে ভেতরের নানা আজানা কাহিনী। মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা লুটপাটতন্ত্রে লাগাম টানতে গিয়েই অনেক রথী-মহারথীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন দীপেন দেওয়ান। সেই বিরোধ চরম আকার ধারণ করে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন ইস্যুকে কেন্দ্র করে। নির্লোভ ও সৎ হিসাবে পরিচিত দীপেন দেওয়ান বিতর্কিত লোকদের জেলা পরিষদে রাখার ঘোর বিরোধী ছিলেন। দীপেনের মন্ত্রিত্ব ছাড়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না তার অনুসারী ও দলের স্থানীয় বড় একটি অংশের নেতাকর্মীরা। দীপেনের মন্ত্রিত্ব পুনর্বহালের দাবিতে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নিজ দলের নেতাদের ষড়যন্ত্র ও তার ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তিনি। অনেকের বক্তব্য বিষয়টি অসুস্থতা নয়-মন্ত্রণালয় পরিচালনায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন ও রাঙামাটি জেলা বিএনপির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিতে দলের কিছু মহলের ষড়যন্ত্রে তার মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয় মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, এই মন্ত্রণালয়ে ইউএনডিপি, কানাডা ও জাইকার বছরজুড়ে ব্যাপক বরাদ্দ চালু রয়েছে। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু লোভনীয় প্রকল্প রয়েছে। এর বাইরে জিওবি ফান্ডের বরাদ্দও কম নয়, প্রায় ১১শ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই টাকার বেশির ভাগই লুটপাট হয়। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের অধীনে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ অনুমোদন দিতে পারেন মন্ত্রী নিজেই। মহল বিশেষ এটাকে সুযোগ হিসাবে কাজে লাগিয়ে লুটপাটে উদ্যোগী হয়ে উঠেন। এছাড়া প্রায় ৩০ হাজার ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীর জন্যও কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এতদিন যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব টাকা লুটেপুটে খাওয়া হতো। মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দীপেন দেওয়ান সব প্রকল্প জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ নেন। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর হন। এ নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের সঙ্গে মন্ত্রীর দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। সম্প্রতি তিন পার্বত্য জেলা (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) পরিষদ পুনর্গঠন এবং সেখানে চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। তার শেষ পরিণতি দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ।
প্রতিবাদ বিক্ষোভ : মঙ্গলবার সকাল থেকেই দিনব্যাপী বিলাইছড়ি উপজেলা সদরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ এবং কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়ায় রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৫টায় রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন দীপেন দেওয়ানের অনুসারীরা। শহরের কলেজগেট থেকে একটি মিছিল বের করে রাজবাড়ী জেলা শিল্পকলা একাডেমি হয়ে প্রধান সড়ক ঘুরে আবার কলেজগেট এলাকায় গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের দাবি, দীপেন দেওয়ানকে চাপের মুখে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ। এ সময় জিয়া পরিষদের জেলা সভাপতি মানস মুকুর চাকমা, জেলা মহিলা দলের আহ্বায়ক নুর জাহান বেগম পারুল, জেলা তাঁতীদলের সভাপতি মো. সফি, সাধারণ সম্পাদক মো. শাকিল, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু, পৌর বিএনপির সহসভাপতি মো. বাচ্চু মিয়া, জেলা বিএনপির নেতা মো. ছাবের, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সুমন, জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক জাবেদ ও শিবলী শান্তি চাকমাসহ বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
সকালে বিলাইছড়িতে কর্মসূচি চলাকালে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক জয়সিন্ধু চাকমা, সিনিয়র সাংগঠনিক সম্পাদক ধনমনি চাকমা, উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক শান্তি রায় চাকমা, উপজেলা বিএনপির উপজাতীয় বিষয়ক সম্পাদক দীলিপ কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মো. মামুন, তাঁতীদলের সভাপতি মো. কামাল, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মিলন চাকমা, উপজেলা বিএনপির ইমন চাকমাসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। এ সময় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বলেন, দীপেন দেওয়ান একজন সৎ, সাহসী, শিক্ষিত এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী জননেতা। তিনি অন্যায়কে কখনো প্রশ্রয় দেননি। ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি রাঙামাটি আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয়। কিন্তু কিছু কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রমূলক ভুল তথ্যের কারণে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এটা বিলাইছড়ি উপজেলা বিএনপি কোনোভাবে মানবে না। তাই সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে পুনরায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রীর পদে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দাবি জানান তারা।
বিএনপি নেতার ফেসবুক পোস্ট : পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যেই ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির উপজাতিবিষয়ক সহসম্পাদক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মনীষ দেওয়ান। মঙ্গলবার সকালে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি দাবি করেন, রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নের সুপারিশকে কেন্দ্র করেই পদত্যাগ করতে হয়েছে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে।
পোস্টে মনীষ দেওয়ান লিখেছেন, ‘এ মুহূর্তে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে সত্যকথনের জরুরি দরকার। দীপেন দেওয়ান তার মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন শুধু একটি কারণে। তিনি আসন্ন রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন আমাকে।’ তিনি লেখেন, ‘পার্বত্য মন্ত্রী (প্রতিমন্ত্রী) ব্যারিস্টার মীর হেলাল চেয়েছিলেন, দীপেন তালুকদার দিপু, সভাপতি, জেলা বিএনপিকে। যিনি জুলাই আন্দোলনে ছয় মাস রাঙামাটি থেকে আত্মগোপনে ছিলেন এবং ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও কুখ্যাত আওয়ামী নেতাদের প্রশ্রয় দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন এটি রাঙামাটিবাসী সবাই অবগত আছেন।’ মনীষ দেওয়ান আরও লেখেন, ‘খুবই দুঃখজনক যে সুপারিশের এই দ্বন্দ্বে আমাদের পূর্ণ মন্ত্রী, পাহাড়ি-বাঙালির প্রিয় নেতা, সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত দীপন দেওয়ান হেরে গেছেন। শুধু তাই নয়, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে। আমি এ বিচারের ভার দেশপ্রেমী পার্বত্যবাসী ও দেশবাসীর উদ্দেশে নিবেদন করলাম।’ নিজের পরিচয় দিয়ে ফেসবুক পোস্টে মনীষ দেওয়ান লেখেন, ‘আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১৭ ডিসেম্বর ৭১-এ রাঙামাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারী, ৭১-এ শহীদ জিয়ার সহযোদ্ধা, ৩৬ জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির যোদ্ধা।’
অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল : স্থানীয়রা জানান, রাঙামাটি জেলা বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভক্তি ছিল, যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও প্রকাশ্য ছিল। যদিও নির্বাচনের সময় তা চাপা রাখেন দীপেন বিরোধীরা। বর্তমানে তা আবার প্রকাশ্য হতে শুরু করেছে। জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারের নেতৃত্বাধীন অনুসারীরা দীপেন দেওয়ানের বিরুদ্ধে ছিলেন সক্রিয়। একটা সময় তারা দীপেন দেওয়ানকে দলীয় কার্যালয়েও ঢুকতে দেননি। দীপেন দেওয়ান সংসদ-সদস্য নির্বাচিত ও পার্বত্যমন্ত্রী হওয়ার পর বিরোধী পক্ষ চুপ হয়ে যায়। কিন্তু এতে দীপেন দেওয়ান সমর্থন ও অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়াই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয় বলে দাবি করেন দীপেন অনুসারীরা।
তবে দলীয় কোন্দল বা বিরোধের বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করে দীপন তালুকদার বলেন, আমাদের দলে কোনো রকম কোন্দল নেই। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের বিষয়টি তার একান্ত ব্যক্তিগত। যে বিষয়টি তিনি তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন, সেটুকুই জানি। এর বাইরে কী কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন, তা আমার জানা নেই।
দীপেন অনুসারী জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভুট্টো বলেন, দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ বিএনপির ও পাহাড়ের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটা পাহাড়ি-বাঙালি সবার জন্য ক্ষতিকর। বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত ও ১৯ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব ফেরত দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
