Logo
Logo
×

শেষ পাতা

সরবরাহের কাজ পেতে ফের সক্রিয় আওয়ামী সিন্ডিকেট

তেল কিনতে সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন জ্বালানিমন্ত্রী

Icon

শাহেদ সিদ্দিকী

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তেল কিনতে সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন জ্বালানিমন্ত্রী

জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। ফাইল ছবি

বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি করা বিভিন্ন দেশের (জিটুজি) ১০টি কোম্পানির কাছ থেকে ১৬ লাখ টন জ্বালানি তেল কিনবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য অনুযায়ী এই তেলের দাম পড়বে প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার বা প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার মতো। এই তেল কেনার দাম নিয়ে সমঝোতা করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের নেতৃত্বে বড় একটি দল আগামী ২০ জুন সিঙ্গাপুরে যাচ্ছেন।

অভিযোগ আছে, যেসব কোম্পানি বিপিসির নিয়মিত দরপত্রে অংশ নিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে তাদের বেশির ভাগ কোম্পানিই কোনোরকম প্রতিযোগিতা ছাড়া জি-টু-জি ফর্মুলায় ২০ হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিতে চাইছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা তেল সরবরাহকারী সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় আছে। তারাই সরকারদলীয় বিভিন্ন সংসদ-সদস্যকে বাগে এনে এই ব্যবসা করছেন।

সরকারি সূত্র জানায়, জিটুজি ভিত্তিতে তেল ক্রয়ের দাম সমঝোতা করতে এবারই প্রথম কোনো জ্বালানিমন্ত্রী দেশের বাইরে যাচ্ছেন। সাধারণত জ্বালানি সচিব পর্যায়ের দল এই সমঝোতায় বিদেশ যান। এ ব্যাপারে জানতে বারবার চেষ্টা করেও জ্বালানিমন্ত্রীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই মন্ত্রী সমঝোতায় নিজে অংশ নিচ্ছেন। যাতে দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়। জ্বালানিমন্ত্রী ২০ জুন সিঙ্গাপুর যাবেন। দেশে আসবেন ২২ জুনের পর। ওই সমঝোতা বৈঠকে অংশ নিতে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানও যাচ্ছেন। তার সঙ্গে যাচ্ছেন জ্বালানি বিভাগের একজন যুগ্মসচিব এবং বিপিসির কমার্শিয়াল বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা।

জানা গেছে, জিটুজি ভিত্তিতে তেল কেনার প্রক্রিয়ায় তেলের দাম নিয়ে কোনো সমঝোতা হবে না। প্ল্যার্টসের দামের ফর্মুলা অনুযায়ী বিপিসি ওই তেলের দাম পরিশোধ করবে। জ্বালানিমন্ত্রীর নেতৃত্বে সমঝোতা হবে প্রিমিয়াম বা জাহাজ ও ইন্স্যুরেন্সসহ অন্যান্য খরচের হিসাব নিয়ে। আগামী জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ লাখ টনের পরিশোধিত তেল দরপত্রের মাধ্যমে কেনার প্রক্রিয়া অনেকটা সম্পন্ন করেছে বিপিসি। এতে প্রতি ব্যারেল পরিশোধিত তেলের প্রিমিয়াম হবে ১৩ দশমিক ১৮ সেন্ট থেকে ১৪ দশমিক ৭৮ সেন্ট। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধকালীন জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বিবেচনা করে ওই প্রিমিয়াম চেয়েছে তেল সরবরাহকারীরা। এখন যুদ্ধ নেই। আগামী শুক্রবার যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি হতে পারে। এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের বড় পতন হয়ে গেছে। এখন সেই প্রিমিয়াম অনেক কমে আসবে বলে মনে করছে বিপিসির কর্মকর্তারা। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ব্যারেলে প্রিমিয়াম ছিল সাড়ে ৫ ডলারের মতো।

সরকারি কর্মকর্তারা জানান, বছরে দেশের জ্বালানি তেল আমদানি করে সরবরাহ দেওয়া হয় ৭০ লাখ টনের মতো। এর মধ্যে অর্ধেক তেল কেনা হয় দরপত্রের মাধ্যমে। বাকি অর্ধেক জিটুজি পদ্ধতিতে সমঝোতা করে। জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়ার জন্য ১০টি দেশের সঙ্গে জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসির চুক্তি আছে। তার আওতায় ওইসব দেশের সরকারি-বেসরকারি কোম্পানি বছরের জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর দুই ভাগে তেল সরবরাহ দেয়। এবারের সমঝোতায় যে ১৬ লাখ টন জ্বালানি তেল কেনার সমঝোতা হবে সে সমঝোতায় অংশ নেবে-ইনক, পেট্রোচায়না, এনআরএল, আইওসিএল, পিটিটি, ইউনিপ্যাক, বিএসপি, কেপিসিটি ও কিউ ট্রেডিং, পেটকো মালয়েশিয়া। এর মধ্যে দরপত্রের একটি প্যাকেজে ইউনিপ্যাক জুলাই- ডিসেম্বর মেয়াদে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়ার কাজ পেয়েছে। বাকি আরও একটি প্যাকেজে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে বিটল এশিয়া। এই দুটি কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট হচ্ছেন ডা. এজাজ হোসেন। এবারের জিটুজি সমঝোতায় ওই ১০ কোম্পানির মধ্যে ওকিউ এবং বিএসপির ও স্থানীয় এজেন্ট ডা. এজাজ। এর অর্থ হচ্ছে আগামী ৬ মাসেও তার কোম্পানিগুলো বেশির ভাগ তেল সরবরাহ দেওয়ার ব্যবসা করবে।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, গত ১৭ বছর ডা. এজাজ আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের অংশীদার করে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন। এখন বিএনপির কয়েকজন সংসদ-সদস্যের সঙ্গে সখ্য করে যথারীতি তেল সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সংশ্লিষ্টদের নজর রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসি এই সিন্ডিকেট ভাঙছে না। এ বিষয়ে বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেও অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।

বিপিসির সাবেক চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাংবাদিকদের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য প্রিমিয়াম নেওয়া হয়েছে ১০ ডলারের বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্ত, পুনঃযাচাই-বাচাইয়ের কারণে সেই একই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাত্র ৫ ডলারে প্রিমিয়ামে তেল দিতে সম্মত হয়। এতে করে বছরে দেশের অর্থ সাশ্রয় হয়েছে এক হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মানে হচ্ছে সরবরাহকারী সিন্ডিকেট মিলেমিশে তেল সরবরাহে লুটপাটের আয়োজন করেছে।

১৬ লাখ টন তেলের মধ্যে ওই ১০ কোম্পানির (জিটুজি) কত তেল সরবরাহ করবে তাও স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভালো সরবরাহকারীর রেকর্ডসহ বিভিন্ন সূচক দেখে ওই তেল সরবরাহের বরাদ্দ দেওয়া হবে বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে।

সরকারি অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা জানান, দেশের স্বার্থ দেখতে হলে জিটুজি চুক্তিতে প্রথমে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক-এমওইউ, দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক, সংশ্লিষ্ট দেশের একাধিক সরবরাহকারীর নামের তালিকা, কারিগরি কমিটি গঠন করে কোম্পানি নির্বাচন এবং জিটুজি চুক্তি আরও যাচাই-বাছাই করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু বিপিসির তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওই প্রক্রিয়ায় চুক্তি হয়নি। সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর নির্দেশে কোনো নিয়ম না মেনে বেশির ভাগ জিটুজি চুক্তি হয়েছিল। তাই এগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করার দাবি জানান সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দামে স্বস্তি ফিরছে। মার্চ-এপ্রিলে যুদ্ধকালীন ৩০ হাজার টনের পরিশোধিত তেল কিনতে সরকারকে দিতে হয়েছিল ৫ কোটি ডলার। এখন সেটি সাড়ে তিন কোটি ডলারে নেমে এসেছে। সর্বশেষ প্ল্যার্টস ফর্মুলা অনুযায়ী বিপিসি এখন ডিজেল কিনছে প্রতি লিটার ১৬৩ টাকায়। এর মধ্যে এনবিআরের আমদানি শুল্ক আছে ৩৬ টাকা।

গত ১৪ জুনের হিসাব অনুযায়ী দেশে এখন অকটেন ৫১ হাজার ৭৮ টন, পেট্রোল ২৮ হাজার ৮৩২ টন, জেট ফুয়েল ৫২ হাজার ৯০৪ টন, ডিজেল ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৫৩৭ টন এবং ফার্নেস অয়েল আছে ৯৪ হাজার ৮৫৮ টন। এই তেল দিয়ে ৩২ দিনের বেশি চাহিদা মেটানো যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পরপর বিতরণ কোম্পানিগুলো অব্যবস্থাপনার কারণে তেলের এই মজুত ৭ দিনে নেমে এসেছিল। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ডিজেলের মজুত ১ লাখ ৩০ হাজার টনে নেমে এসেছিল, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম