Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

অন্যমত

চামড়াশিল্পে প্রাণ ফেরাতে হবে

Icon

আবু আহমেদ

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চামড়াশিল্পে প্রাণ ফেরাতে হবে

দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চামড়াশিল্প। প্রতিবছর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু কেন জানি এ শিল্পটি আলোর মুখ দেখছে না। পবিত্র ঈদুল আজহা বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় মৌসুম। কারণ ঈদুল আজহায় দেশে প্রচুর পশু কোরবানি করা হয়ে থাকে। ফলে সারা বছরের চামড়াজাত কাঁচামালের প্রায় অর্ধেক আসে এই ঈদে। অথচ প্রতিবছরই এ সময়টিতে চামড়া নিয়ে দেখা যায় তেলেসমাতি কাণ্ড। জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। এ বছরও পুরোনো সিন্ডিকেটের সেই একই চিত্র বিদ্যমান। যুগান্তরে প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা যায়, লবণযুক্ত চামড়ার দাম এ বছর প্রতি বর্গফুট দুই টাকা বাড়ানো হলেও মাঠপর্যায়ে সেই দাম পাননি মাদ্রাসা, এতিমখানা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এ কারণে চরম লোকসানের মুখে দেশের কোথাও কোথাও ব্যবসায়ীরা চামড়া সড়কে ফেলে দিয়েছেন। কেউ ফেলেছেন নদীতে। কেউ আবার রাগে-ক্ষোভে ময়লার ভাগাড়ে ফেলেছেন। অথচ একই সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ছে, ট্যানারিগুলো লাখ লাখ চামড়া সংগ্রহ করছে। এরপরও কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস। সারা দেশের এ চিত্র অভিন্ন।

কিন্তু চামড়াশিল্পে এ হতাশার কারণ কী? এ অবস্থার জন্য দায়ী হলো-সাভারে স্থানান্তরিত চামড়া শিল্পনগরীর কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা অর্জনে ব্যর্থতা, লবণ ও কেমিক্যালের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতার অভাব। সরকারি দাম ঘোষণা, মাঠপর্যায়ে দাম না পাওয়া, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, মাদ্রাসা ও এতিমখানার বঞ্চিত হওয়া এবং কোথাও কোথাও চামড়া নষ্ট হওয়ার মতো হতাশাজনক ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ব্যাংক ঋণ নিয়ে। অধিকাংশ ব্যবসায়ী খেলাপি ঋণের আওতায় চলে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন করে তাদের অর্থায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে কাঁচা চামড়া কেনার জন্য প্রয়োজনীয় নগদ অর্থের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় চামড়া শিল্পে স্থবিরতা বাড়ছে। এবারের কুরবানির ঈদেও এর কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। দেশে প্রায় ৯০ লাখ গবাদিপশু কুরবানি হয়েছে। সরকারি হিসাবে গত বছরের তুলনায় প্রায় এক লাখ কম। তবে বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ কম হবে। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরা শুরু থেকেই ৭৫ থেকে ৮০ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় কুরবানির সংখ্যা কমতে পারে। এ বছর ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। এই হিসাবে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে কুরবানির দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সেই চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। ছোট আকারের চামড়া বিক্রি হয়েছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায় এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। ফলে এ শিল্পের প্রতি সবার মধ্যেই একটা হতাশা কাজ করেছে।

পরিবেশ দূষণের কথা চিন্তা করে ট্যানারি শিল্পকে ঢাকার বসতিপূর্ণ এলাকা হাজারীবাগ থেকে সরিয়ে সাভারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু বহু বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এ প্রকল্পটি পরিপূর্ণতা পায়নি। এটা অসমাপ্ত অবস্থায় রয়েছে। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে যে প্লান্ট বসানোর কথা ছিল, সেটা পুরোপুরি বসানো হয়নি। কী কারণে, কী উদ্দেশ্যে বসানো হয়নি, তা আমার জানা নেই। কুরবানির ঈদে কোটি কোটি টাকার চামড়া আসে। অথচ এ সময় এটা নিয়ে চলে টালবাহানা। ঈদুল আজহার সময়ে প্রাপ্ত চামড়াগুলোকে সঠিক দাম দিয়ে ক্রয় করে ট্যানারি শিল্পের মাধ্যমে ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে চামড়াশিল্প দাঁড়িয়ে যেত। এ চামড়াকে ভিত্তি করে এখানে একটা চামড়াশিল্প ব্যাপকভাবে গড়ে উঠতে পারত, যেখানে বহু লোকের কর্মসংস্থান হতো। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হতো। কিন্তু সেটা হয়নি। সাভারে স্থাপিত চামড়াশিল্পের যে প্লান্ট অর্থাৎ পরিবেশ দূষণ রোধ করার যে ব্যবস্থা, সেটা না করলে এই চামড়া ইউরোপ-আমেরিকায় বিক্রি হবে না। কারণ চামড়ার একটা কমিটি আছে। সেই কমিটি যদি সার্টিফাই না করে, তাহলে এ চামড়া তারা কিনবে না। ট্যানারি প্লান্ট থেকে এ চামড়া পরিপূর্ণ দূষণমুক্ত হলে তবেই তারা সার্টিফিকেট দেবে। আর তখনই কেবল তাদের কাছে চামড়া বিক্রি করা যাবে, অন্যথায় নয়। দূষণমুক্ত না হলে শুধু চামড়াই নয়, চামড়ার তৈরি পণ্যও রপ্তানি করা যাবে না। মোটকথা, যে জিনিস পরিবেশসম্মত উপায়ে উৎপাদন হয়নি, সে জিনিস তারা কিনবে না, সেটা পণ্য হোক বা কাঁচা চামড়া। সুতরাং এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমাদের এগোতে হবে। যেভাবেই হোক, চামড়াশিল্পে প্রাণ ফেরাতে হবে।

চামড়াশিল্পের পাশাপাশি আমাদের বিনিয়োগেও একটা স্থবিরতা লক্ষ করা গেছে। তবে নতুন বাজেট ঘোষিত হওয়ায় বিনিয়োগে খরা কিছুটা লাঘব হবে বলে আশা করা যায়। এ ব্যাপারে সরকারকে লিড নিতে হবে। অর্থাৎ চামড়াশিল্পের মতো বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সরকারি নেতৃত্ব আসতে হবে। যেহেতু প্রাইভেট সেক্টর এ ব্যাপারে এগিয়ে আসছে না, তাই সরকারকেই আসতে হবে। প্রাইভেট সেক্টরে ঋণ নেওয়ার কোনো প্রবণতা নেই। কারণ তাদের ক্ষুধা নেই। সুতরাং বিনিয়োগের ব্যাপারে সরকার লিড দিলে, সুদের হার কমালে প্রাইভেট সেক্টর এগিয়ে আসবে। ফলে কাজের পরিধি বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সরকারের একার দায়িত্ব নয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার দায়িত্ব প্রাইভেট সেক্টরেরও। কিন্তু প্রাইভেট সেক্টর উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসার প্রসার ঘটাতে পারেনি। বলতে গেলে তাদের ব্যবসায় সাফল্য আসেনি। সুতরাং সরকার এ ব্যাপারে এগিয়ে এলে, সুদের হার কমালে প্রাইভেট সেক্টরে একটা গতি আসবে, বিনিয়োগের খরা কাটবে, কর্মসংস্থান বাড়বে। ইতোমধ্যেই সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। সরকার যদি এভাবে এগোতে থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির জন্য শেয়ারবাজারেও একটা গতি আসবে, ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসবে। অর্থনীতি স্থবির হয়ে আছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৪ শতাংশ। এ থেকে উত্তরণ ঘটাতে নেতৃত্বটা দিতে হবে সরকারকেই। অর্থনীতি বিজ্ঞানও বলা আছে, অর্থনীতি যখন স্থবির হয়ে যায়, তখন ঘাটতি বাজেট করে হলেও এক্সপেনডিচারের ক্ষেত্রে, ডেভেলপমেন্ট এক্সপেনডিচারের ক্ষেত্রে সরকারকে নেতৃত্ব দিতে হয়। মানে পাবলিক সেক্টরে এক্সপেনডিচার বাড়িয়ে দিতে হয়। এখন ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল বাজেট ঘোষিত হয়েছে, সেটার বিরাট একটা অংশ থাকবে উন্নয়ন খাতে। ফলে অর্থনীতিতে একটা গতি আশা করা যায়। কিন্তু এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে হবে। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে সিকিউরিটাইজেশন করতে হবে। সিকিউরিটাইজেশন মানে হলো বান্ডেলিং করে মানুষের কাছে বিক্রি করে দেওয়া। অর্থনীতিতে এগুলোর কনসেপ্ট তো আছে। সুতরাং আমাদেরকে শুরুটা করতে হবে। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের কিছু বিদেশি একাউন্টিং ফার্ম আছে। তাদের দায়িত্ব দিলে তারাই দ্রুততার সঙ্গে এগুলো করে দিবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ করতে পারলে আমরা কেন পারছি না? এখন আমরা যদি সামগ্রিকভাবে দরিদ্র থাকার জন্য ইচ্ছা পোষণ করি, তাহলে তো আমাদেরকে কেউ উপরে নিতে পারবে না। আমাদের নিজেদের দোষেই তো আমরা দরিদ্র আছি। আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস করতে ১২ দিন লাগে, অন্য দেশে লাগে ৪ দিন। কী দুর্ভাগা দেশ আমাদের! অন্য দেশ ৪ দিনে পণ্য খালাস করতে পারলে আমাদের কেন ১২ দিন লাগবে? আমাদের কি সেই সক্ষমতা নেই? অবশ্যই আছে, শুধু ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন। সবার মাঝে সেই সদিচ্ছা জাগ্রত হোক, সেই প্রত্যাশাই করি। (অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার)

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম