মৎস্য খাতে বরাদ্দ কমানো : খাদ্যনিরাপত্তার অশনিসংকেত
ড. ইয়ামিন হোসেন
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত উন্নয়ন বাজেটে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা থেকে কমে মাত্র ৭০৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে এ খাতের উন্নয়ন বিনিয়োগ। একটি কৃষিনির্ভর ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য এটি নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। বর্তমানে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। জেলে, মৎস্যচাষি, হ্যাচারি মালিক, ফিড ব্যবসায়ী, পরিবহণ শ্রমিক, বরফকল, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা-সব মিলিয়ে এ খাত একটি বিশাল অর্থনৈতিক চেইন তৈরি করেছে। এই খাতের উন্নয়ন শুধু মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি নয়; বরং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে মাছের গুরুত্ব অপরিসীম। এমন খুব কম পরিবারই পাওয়া যাবে, যারা নিয়মিত মাছ গ্রহণ করে না। মাছ আমাদের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, উচ্চমানের প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের অন্যতম সহজলভ্য উৎস হচ্ছে মাছ। তাই মৎস্য খাতকে শুধু একটি উৎপাদন খাত হিসাবে দেখলে ভুল হবে; এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তারও অন্যতম ভিত্তি।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে একটি অনন্য অবস্থান তৈরি করেছে। অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় ও চাষভিত্তিক মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম। এ অর্জন হঠাৎ করে আসেনি। গবেষণা, সম্প্রসারণ কার্যক্রম, উন্নত প্রযুক্তি, সরকারি সহায়তা এবং চাষিদের নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই এ সাফল্য এসেছে। কিন্তু উন্নয়ন বাজেট কমে গেলে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, রোগব্যবস্থাপনা, নিরাপদ মাছ উৎপাদন এবং মূল্যশৃঙ্খল উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমগুলো বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন, রোগব্যাধির প্রকোপ, খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মৎস্য খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। মাছের উৎপাদন ব্যয় কমানো, উন্নতমানের পোনা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি চালু করা, রপ্তানিযোগ্য নিরাপদ মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং ক্ষুদ্র মৎস্যচাষিদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বিকল্প নেই। এছাড়া বাংলাদেশে এখন নীল অর্থনীতি (Blue Economy) নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করছে। সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মৎস্যপণ্যের অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অপরিহার্য। উন্নয়ন বাজেট কমানো হলে সেই লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থনীতির ভাষায়, মৎস্য খাতে বিনিয়োগ ব্যয় নয়; বরং এটি একটি উচ্চফলনশীল সামাজিক বিনিয়োগ। কারণ এ খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে একইসঙ্গে খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। তাই উন্নয়ন বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা দরকার। সরকারের দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারকদের প্রতি বিনীত আহ্বান থাকবে-প্রস্তাবিত বাজেট পুনর্মূল্যায়ন করে মৎস্য খাতের উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়ানো হোক। কারণ আজকের বিনিয়োগই আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। অন্যথায়, যে খাতটি বাংলাদেশের পুষ্টি ও অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসাবে কাজ করছে, সেটি ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় মৎস্য খাত কোনো প্রান্তিক খাত নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা এবং জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই মৎস্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যা নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন :
মাছ যদি দেশের প্রধান প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস হয়, তাহলে এ খাতে উন্নয়ন বিনিয়োগ কেন কমবে?
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মৎস্য খাতের ঝুঁকি বাড়ছে; তাহলে অভিযোজনমূলক বিনিয়োগ কীভাবে নিশ্চিত হবে? গ্রামীণ অর্থনীতিতে কোটি মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল এ খাতকে দুর্বল করলে কর্মসংস্থানের বিকল্প কী হবে? রপ্তানিমুখী মৎস্যপণ্য উৎপাদন ও নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে?
আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তার প্রভাব আগামী দশকজুড়ে দেশের খাদ্যব্যবস্থা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে। তাই মৎস্য খাতের উন্নয়ন বাজেটকে ব্যয় হিসাবে নয়, বরং জাতীয় পুষ্টি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসাবে দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের খাবারের থালায় মাছের উপস্থিতি এ খাতের গুরুত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তাই মৎস্য খাতকে শক্তিশালী করা মানে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা।
প্রফেসর ড. ইয়ামিন হোসেন : অধ্যাপক ও গবেষক, ফিশারিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
