Logo
Logo
×

বাতায়ন

নির্বাচন ২০২৬ : উসকানি থেকে সাবধান

Icon

ব্রি. জে. এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.)

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন ২০২৬ : উসকানি থেকে সাবধান

এ দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদী আমলের পুরোটা সময় নির্বাচনের নামে এক ধরনের প্রহসনের মধ্য দিয়ে গেছে। ভোট ছিল, কিন্তু ভোটের মালিক ছিল না জনগণ। কখনো প্রশাসনের নগ্ন পক্ষপাত, কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছত্রছায়ায় কেন্দ্র দখল, কখনো রাতের আঁধারে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা, আবার কখনো বিরোধীদের আগেই মাঠছাড়া করে দেওয়া-এ ছিল তথাকথিত নির্বাচনি সংস্কৃতি। মানুষ এসব দেখেছে, বুঝেছে, কিন্তু বারবার চেপে গেছে। এ দীর্ঘ অবমাননা, ভোটাধিকার লুণ্ঠন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পর যে রক্তক্ষয়ী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তা শুধু একটি শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটায়নি; এটি মানুষের মনোজগতে এক গভীর পরিবর্তন এনেছে। বিপ্লবের সময় মানুষ আশাবাদী ছিল যে, নতুন ব্যবস্থায় সত্যিই রাজনীতি শুদ্ধ হবে, নির্বাচন হবে পবিত্র, আর রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস হবে জনগণের ভোট।

এ প্রত্যাশা কোনো আবেগপ্রবণ কল্পনা ছিল না; এটি ছিল রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ন্যায্য দাবি। তরুণরা, শিক্ষার্থীরা, সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমেছিল এ আশায় যে, তারা আর একটি সাজানো নির্বাচন দেখবে না, আরেকটি ভোট চুরির নাটকের সাক্ষী হবে না। তারা চেয়েছিল এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে ভোট মানে হবে মর্যাদা, যেখানে নাগরিক মানে হবে মালিক, আর রাষ্ট্রযন্ত্র মানে হবে সেবক। সেই স্বপ্নের ভেতরেই ছিল একটি পরিশুদ্ধ রাজনৈতিক সংস্কৃতির বীজ-যেখানে ক্ষমতা নয়, নৈতিকতা হবে রাজনীতির মানদণ্ড।

অবশ্য এটাও মনে রাখতে হবে যে, বিপ্লব-পরবর্তী সময় ইতিহাসে বরাবরই সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়। কারণ তখনই পরাজিত শক্তি নতুন রূপে ফিরে আসার চেষ্টা করে। এবারও চেষ্টা করবে স্বাভাবিকভাবেই। এ কারণে দেশের বাতাসে আবারও নির্বাচনি প্রকৌশলের গন্ধ অনেকেই পাচ্ছেন। তাদের মতে, এই গন্ধ আগের মতো প্রকাশ্য নয়, বরং অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও প্রতারণামূলকভাবে। পতিত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার সহযোগী ও সুবিধাভোগীদের কাছে মনে হতে পারে, পুরোনো কায়দায় আর ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব নয়। তাই তারা বেছে নিতে পারে নতুন পথ-আইন, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিকতার মুখোশ পরে ধীরে ধীরে প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা।

আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এটা মনে রেখে যে, এ নতুন প্রকৌশল শুরু হয় অনেক আগেই, ভোটের দিনের বহু আগে। প্রথমে তৈরি করা হয় একটি বয়ান-অতীত ভুলে যেতে হবে, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আপস দরকার, স্থিতিশীলতা সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। এ কথাগুলো শুনতে আকর্ষণীয়, কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে দায়মুক্তির রাজনীতি। যারা বছরের পর বছর ভোট চুরি করেছে, মানুষকে গুম-খুন করেছে, রাষ্ট্রকে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করেছে-তাদের নৈতিক জবাবদিহি ছাড়াই আবার গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা চলতে পারে। এরপর শুরু হয় প্রশাসন ও নির্বাচন সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নীরব প্রভাব বিস্তার-খোলাখুলি নির্দেশ নয়, বরং চাপ, প্রলোভন, পদোন্নতি কিংবা ভয় দেখিয়ে আনুগত্য নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে চালু করা হয় বিভাজনের রাজনীতি, যা যে কোনো গণআন্দোলন বা বিপ্লবের শক্তিকে ভেতর থেকে দুর্বল করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। বিপ্লবে যারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাদেরই একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে গুজব, সন্দেহ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চরিত্র হননের আশ্রয় নেওয়া হয়। কে কখন কী বলেছে, কার পেছনে কারা আছে, কে কার মাধ্যমে প্রভাবিত-এসব প্রশ্নকে ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দিয়ে বিশ্বাসের জায়গায় বিষ ঢেলে দেওয়া হয়। এতে করে আদর্শিক বিতর্ক নয়, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও অবিশ্বাসই মুখ্য হয়ে ওঠে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এ কাজে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করার সুযোগ থাকে। ভুয়া তথ্য, কাটাছেঁড়া ভিডিও, প্রসঙ্গহীন বক্তব্য ও উদ্দেশ্যমূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করা সম্ভব হয়। মানুষকে ব্যস্ত রাখা হতে পারে এ তর্কে-কে প্রকৃত দেশপ্রেমিক, কে বিদেশি এজেন্ট, কে বিপ্লবের আসল উত্তরাধিকারী। এসব লেভেলিংয়ের খেলায় জনগণ যখন জড়িয়ে পড়লে ধীরে ধীরে মূল প্রশ্নটি আড়ালে চলে যায় : নির্বাচন কি স্বচ্ছ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি নিরপেক্ষ থাকছে এবং জনগণের ভোটাধিকার কি সত্যিই সুরক্ষিত?

এ পারস্পরিক সন্দেহের পরিবেশ কারসাজিকারীদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক। বিভক্ত সমাজে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না, ঐক্য ভেঙে গেলে নৈতিক চাপও দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষ যখন একে অপরকে সন্দেহ করতে শুরু করে, তখন ক্ষমতার আড়ালে থাকা শক্তিগুলো নির্বিঘ্নে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পায়। গণমাধ্যমের একটি অংশও এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতীতের অপরাধকে হালকা করে দেখানো, বিপ্লবকে বিশৃঙ্খলা হিসাবে উপস্থাপন করা এবং জনগণের ন্যায়সংগত উদ্বেগকে উগ্রতা বা চরমপন্থা বলে চিহ্নিত করা-এসবের মাধ্যমে জনমতকে ধীরে ধীরে নিরুৎসাহিত ও বিভ্রান্ত করা হয়। মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন তারা অনিয়মকে ‘অপরিহার্য’ বলে মেনে নিতে শুরু করে। এ ক্লান্তিই নির্বাচনি প্রকৌশলের সবচেয়ে বড় পুঁজি। আমাদের দেশে বিগত স্বৈরাচারের সহযোগী অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত গণমাধ্যম নতুন বয়ান তৈরিতে ও নির্বাচনকে প্রভাবিত করার কাজে বিপুলভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠতে পারে।

অবস্থা যদি এমন হয়, তবে করণীয় কী? এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আবারও জনগণের ওপর এসে পড়ে। বিপ্লব কোনো একদিনের ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। রাজপথে যে সাহস দেখানো হয়েছে, তা যদি ব্যালট বাক্সে, নাগরিক দায়িত্বে ও সচেতন অবস্থানে রূপ না নেয়, তবে সেই ত্যাগ বৃথা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। একটি মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন আজ শুধু একটি সাংবিধানিক দাবি নয়, এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার-শহীদদের রক্তের প্রতি, আহতদের যন্ত্রণার প্রতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষার প্রতি।

সতর্কতা মানে কখনোই আতঙ্কে আচ্ছন্ন হওয়া নয়; সতর্কতা মানে সচেতন থাকা, যুক্তিবোধকে সক্রিয় রাখা এবং প্রশ্ন করতে না ভয় পাওয়া। গণতন্ত্র টিকে থাকে প্রশ্নের ওপর, নীরবতার ওপর নয়। তাই কিছু পরিচিত মুখ হঠাৎ করে আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে, নির্বাচনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের সামনে যদি ব্যাখ্যা করা না হয়, স্পষ্ট অনিয়মকেও ‘তুচ্ছ’ বা ‘অপরিহার্য’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। কারণ, এগুলো শুধু অধিকার নয়, নাগরিক দায়িত্ব। অস্বাভাবিক ঘটনাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়াই কারসাজির প্রথম জয়।

একই সঙ্গে জনগণকে অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে সহিংসতা ও উসকানির ফাঁদ সম্পর্কে। ইতিহাস বলে, কারসাজিকারীরা প্রায়ই ইচ্ছাকৃতভাবে অস্থিরতা তৈরি করতে চায়, যাতে কঠোর দমনমূলক ব্যবস্থা ও অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপকে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে’ বৈধতা দেওয়া যায়। উত্তেজনা যত বাড়ে, নাগরিক অধিকার তত সংকুচিত হয়-এটাই তাদের কৌশল।

এছাড়া পুরোনো ও আবেগনির্ভর বয়ান-যেমন চেতনা, একাত্তর, মৌলবাদ ইত্যাদি নির্বাচনি স্বচ্ছতার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার ঢাল হিসাবে আবারও ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব শব্দ ও প্রতীকের আড়ালে মূল আলোচনাকে সরিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করা হয়, যেন মানুষ ভোটাধিকার ও প্রক্রিয়ার প্রশ্ন ভুলে আবেগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সতর্ক নাগরিকের কাজ হলো আবেগ নয়, বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং গণতন্ত্রের মূল প্রশ্নটিকে সামনে রাখা। দৃঢ় সংকল্প ছাড়া শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয়। এ সংকল্প মানে হলো, ভোটাধিকার রক্ষায় আপসহীন থাকা, কিন্তু পদ্ধতিতে শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল থাকা। নাগরিক সমাজ, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী মানুষ, নারী সমাজ এবং প্রবাসীরা সবাই যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখে, তবে কোনো গোপন কৌশল সফল হতে পারে না। ভোটার হিসাবে নিজের অধিকার জানা, অন্যকে সচেতন করা, অনিয়ম দেখলে নথিভুক্ত করা এবং প্রয়োজনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানো-এসবই গণতন্ত্র রক্ষার অংশ।

ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দিয়েছে-ফ্যাসিবাদ কখনো হঠাৎ ফিরে আসে না; এটি ফিরে আসে মানুষের নীরবতা, বিভ্রান্তি ও ক্লান্তির সুযোগ নিয়ে। আজ যদি সেই সুযোগ আবার দেওয়া হয়, তবে বিপ্লবের আত্মত্যাগের প্রতি তা হবে চরম অবমাননা। এ নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতা নির্ধারণের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদার পরীক্ষা। প্রশ্নটি কে জিতবে বা হারবে তা নয়, বরং নির্বাচনটি আদৌ জনগণের ছিল কিনা।

একটি মুক্ত, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা মানে একটি ভিন্ন ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করা-যেখানে আর কোনো নাগরিককে ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য রক্ত দিতে হবে না। এ দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। আজকের প্রজন্মকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে-তারা কি আবারও কারসাজির কাছে মাথা নত করবে, নাকি ঐক্য, সতর্কতা ও দৃঢ়তার মাধ্যমে তাদের স্বপ্ন রক্ষা করবে। ইতিহাস এ মুহূর্তকে মনে রাখবে এবং তার বিচার হবে নির্মম ও চূড়ান্ত।

ব্রি. জে. এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.) : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

hrmrokan@hotmail.com

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম