সাক্ষাৎকার
শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে পালটানো দরকার: ড. সলিমুল্লাহ খান
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব কামাল
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গতকালের পর
ড. সলিমুল্লাহ : টু লিড দ্য লিবারেশন... কোথায় উনি যাবেন, সেটা আপনি বলবেন কেন? আমি বলব কেন? তিনি একটা পার্টির নেতা, দেশকে স্বাধীন করার জন্য ডাক দিয়েছিলেন...
যুগান্তর : কিন্তু দেশে থাকা তো অসম্ভব ছিল তখন।
ড. সলিমুল্লাহ : আচ্ছা, আপনার সম্ভব-অসম্ভব, এটা আজকে আমার আলোচনার বিষয় নয়। আমার বক্তব্য হচ্ছে, উনি যেটা করেছেন, কী করতে পারতেন, সেটা আমি বলব না। যেটা করেছেন, সেটার রেজাল্ট হলো, মুক্তিযুদ্ধ তিনি বুঝতে পারেননি, ফলে দেশে এসে দেশটা চালানোর সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের এলিয়েনেট করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দেশ চালানোর ক্ষেত্রে কী কী ভুল করেছেন, যার কারণে আজ আমাদের এই অবস্থা-এটাই বলছি।
যুগান্তর : না, আমি যদি বলি যে ওইটাই একমাত্র বিকল্প ছিল, কারণ আমি একটু ব্যাখ্যা করি...
ড. সলিমুল্লাহ : আচ্ছা, আমি তার রণনীতি ব্যাখ্যা করার যোগ্য লোক নই। সেটা আপনি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করেন, যুদ্ধ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করেন। আমার বক্তব্য হচ্ছে রাজনীতি। আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছিল বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসনের জন্য, তারা নির্বাচনে জিতেছে। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনে জিতেছে। তারপর পাকিস্তান যদি স্বায়ত্তশাসন না দেয়, ছয় দফা না মানে, তাহলে আওয়ামী লীগ দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবে-এটাই আমরা জানতাম। কিন্তু অ্যাকচুয়াল স্বাধীনতাসংগ্রাম যখন শুরু হলো, পাকিস্তান আক্রমণ করল, তিনি যা দেখালেন, সেটা কোনো প্রস্তুতি নয়।
যুগান্তর : আচ্ছা ঠিক আছে। এখন আমরা একটু শিফট করি, হ্যাঁ? সেটা হচ্ছে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কী অবস্থায় আছে এখন? মানে পলিটিক্যাল কালচার?
ড. সলিমুল্লাহ : বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটো ঘটনাকে আপনার সমানভাবে দেখতে হবে। ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশের যে অংশ পাকিস্তানে ঢুকেছিল, যেটা বর্তমান বাংলাদেশের সীমানা, এটা কিন্তু বেশি বদলায়নি। তাই না? তখন মানুষের আকাঙ্ক্ষা কী ছিল? ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত থেকে মুক্ত হওয়ার সময় তারা মনে করেছিল স্বাধীন ভারতে তারা নিপীড়িত হবে। সেই নিপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য যে গ্যারান্টি, এটাকে বলে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন; কিন্তু সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা-এ আন্দোলন থেকেই মানুষ পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকেছিল। ওই ঘটনার র্যাশনালিটি হচ্ছে, ভবিষ্যতের ভারতে যেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তারা নিজেদের অধিকার ভোগ করতে পারেন-চাকরিতে অধিকার পান, শিক্ষায় পান, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পান। এটার ভয় থেকেই পাকিস্তান হয়েছিল।
কিন্তু পাকিস্তানে গিয়ে তারা আবারও একই বিপদে পড়ল। পাঞ্জাবিদের হাতে, পশ্চিমাদের হাতে তারা নিপীড়িত হলো, তখন তারা আবার মুক্তিযুদ্ধ করল। এজন্য আমি বলতে চাচ্ছি, ১৯৪৭ ও ১৯৭১ দুটোকে একই সমান্তরালে দেখতে হবে আমাদের। এ দুইয়ের মধ্যে আমাদের কাছে নিকটতর ঘটনা হচ্ছে ১৯৭১ এবং এটিতে আমাদের বেশি রক্তপাত হয়েছে। এটাকে আমরা বলি, এটার নাম-বাঙালি পরিচয়। ওইটাও বাঙালি পরিচয়, কিন্তু ওইটা বাঙালি মুসলমান পরিচয়। বাংলাদেশের মুসলমানরা কখনো ভুলেনি যে তারা বাঙালি। অনুরূপভাবে একাত্তরেও যখন মুক্তিযুদ্ধে মানুষ ধাবমান হয়েছে, তারা তাদের মুসলমানিত্ব বিসর্জন দেয়নি। আমি শুধু মুসলমান অংশের কথা বলছি-হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে। তো সেজন্য বলব, এ দুই মোমেন্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
অনেকে শুধু বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে বলেছে, বাংলাদেশ হচ্ছে শুধু ১৯৭১ ভিত্তিক। ১৯৪৭-এর ঘটনাকে তারা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করতে চেয়েছে, স্বীকার করতে চায়নি এবং সেটা করতে গিয়ে তারা গোটা ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের যেটুকু ঐতিহ্য, আমাদের সেটুকু অস্বীকার করেছে। অবশ্য সেটাকে নীরবতার মধ্য দিয়ে পালন করেছে। আপনাকে একটা উদাহরণ দিই-১৮৫৭ সালের ঘটনার ১৫০ বছর পূর্তি হয়েছিল ২০০৭ সালে। তখন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। কোনো রকমের সেলিব্রেশন রাষ্ট্র করেনি তখন। শুধু বামপন্থিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা মিটিং করেছিল। কিন্তু এর ৫০ বছর আগে ভারত ও পাকিস্তান-উভয় দেশেই বিভিন্ন পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা বের করেছিল।
১০ মে ১৮৫৭ স্মরণে, ১৯৫৭ সালের ১০ মে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল পাকিস্তান অবজারভার, ইত্তেফাক, আজাদ। আমি এই উদাহরণটা দিচ্ছি আপনাকে, কারণ আওয়ামী লীগ আমলে যে অন্যায়টা হয়েছে-তারা আমাদের ইতিহাসের যে দীর্ঘ ফাউন্ডেশন বা গোড়া, সেটা ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল। ফলে এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দুটোর মধ্যে একটা দোলাচল চলে। কেউ একটাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, কেউ বলে এরা বেশি বাঙালি, এরা মুসলমান-এসব ঠিক নয়। আওয়ামী লীগ আমলে যে অন্যায়টা হয়েছে, সেটার প্রতিকারস্বরূপ এখন একটা পালটা অন্যায় হচ্ছে। আমি এই অন্যায়টাকে জাস্টিফাই করার জন্য বলছি না, তবে আপনাকে জিনিসটা বুঝতে হবে।
যুগান্তর : হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। এখন কথাটা হচ্ছে, তাহলে কি এর মধ্য দিয়ে আমাদের মূল্যবোধের কোনো অবক্ষয় দেখছেন আপনি?
ড. সলিমুল্লাহ : আমাদের প্রথম মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে কীরকম, দেখুন-ভারত স্বাধীন হয়েছে আজ প্রায় ৮০ বছর। আমরা ৫৫ বছর নতুন করে স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু একটা সিম্পল ব্যাপার দেখেন-আমাদের দেশে ন্যূনতম ভালো একটা শিক্ষাব্যবস্থা কেন প্রবর্তিত হয়নি? সবার জন্য শিক্ষা-এই দাবি তো সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই উঠেছে। কিন্তু আজ বাংলাদেশে আপনি নিজেই বলেন, ইংরেজি বুঝতে পারে বা ইংরেজিতে ভালো জ্ঞান আছে কজনের? আসলে আমাদের শিক্ষার মধ্যে একটা বৈষম্য তৈরি হয়েছে। অল্প লোকই ইংরেজিতে শিক্ষিত হয়েছে, ফলে দেশের শতকরা তিন থেকে চার বা বড়জোর পাঁচ ভাগ লোক ইংরেজিতে স্বাক্ষর বা কথাবার্তা বলতে পারে না, শিক্ষিত লোকদের মধ্যেও না।
তার মানে, দেশটা দুভাগে ভাগ হয়েছে-একটা ইংরেজি জানা এলিট, আরেকটা ইংরেজি না জানা ম্যাস পিপল, তাই না? এটা হচ্ছে আমাদের প্রথম অবক্ষয়। দ্বিতীয় হচ্ছে কী, আপনি দেখেন দেশে ন্যূনতম ভালো চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। আপনি নিজেও সম্প্রতি কঠিন একটা রোগ থেকে মুক্ত হয়েছেন-আমি দোয়া করি, আপনি ভালো থাকেন। কিন্তু এই যে দেশের অসাধ্য সাধন, আপনার কত টাকা লেগেছে আপনি জানেন। আপনার অফিস আপনাকে সাপোর্ট না করলে, আপনার বন্ধুরা আপনাকে সাপোর্ট না করলে আপনি তো মারা যেতেন। তো এজন্য বলছি, এ দেশে ন্যূনতম চিকিৎসাব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়নি। আর ঢাকা শহরে যে যোগাযোগব্যবস্থা, এটা দেখলে সারা দেশের রাস্তা সংযোগের অবস্থা বোঝা যায়। তাহলে এগুলো হচ্ছে আসল মূল্যবোধ।
সবচেয়ে খারাপ মূল্যবোধ হচ্ছে, দেশে এখনো ব্যাপক দারিদ্র্য বিরাজ করছে। ভারতের জনসংখ্যা বলা হয় এখন ১৪০ কোটি, ৪০ কোটি লোক এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে। বাংলাদেশের জনগণ যদি আমরা সাড়ে ১৭ কোটিও ধরি, আমাদের তো সাড়ে সাত কোটিরও বেশি লোক দারিদ্রসীমার নিচে-আপনি সেই মাপকাঠি ব্যবহার করেন না কেন? সেজন্য বলছি, এটাও মূল্যবোধের বড় অবক্ষয়।
যুগান্তর : আচ্ছা, আপনি যেহেতু শিক্ষার কথা বললেন, তাহলে একটা প্রশ্ন স্ট্রাইক করল, সেটা হচ্ছে, বিজ্ঞান শিক্ষার সঙ্গে ধর্মের কি কোনো বিরোধ আছে?
ড. সলিমুল্লাহ : আমি তো কোনো বিরোধ আছে মনে করি না। কিন্তু কেউ কেউ তো মনে করে। এর কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশে যে উন্নতিটা হওয়া দরকার ছিল-এই উন্নতির প্রথম মাপকাঠি হওয়া উচিত ছিল অর্থনীতির সমৃদ্ধি, যেটাকে আমরা গ্রোথ বলি। একই সঙ্গে আরও একটা বিষয় দেখা দরকার-সেটা হচ্ছে, এই গ্রোথের বণ্টন অপেক্ষাকৃত সমাজের সব গোত্র-শ্রেণির এবং সব অংশের মধ্যে যাচ্ছে কি না। পাকিস্তান আমলে যে উন্নতিটা আইয়ুব খানের আমলে হয়েছিল, ওইটাতে তারা গুরুত্ব দিয়েছিল শুধু গ্রোথের ওপর। কিন্তু তারা বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দেয়নি, যার পরিণতিতে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেছে-মানে তারা আঞ্চলিক বৈষম্য তৈরি করেছিল। বর্তমান বাংলাদেশে আমাদের দেখা উচিত, বৈষম্যটা কত রূপ ধারণ করেছে। সমাজে কারা সুবিধা পাচ্ছে, কারা পাচ্ছে না। এই যে ধরেন, ১৯৭১ সালে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখ, এখন বলা হচ্ছে আড়াই কোটি। শহর সম্প্রসারিত হয়েছে, মানুষ বেড়েছে, অর্থনৈতিক উন্নতি অনেক হয়েছে, অনেক দালানকোঠা হয়েছে-কিন্তু মানুষের মধ্যে সেই স্বস্তিটা আসেনি কেন? এখনো ব্যাপক বেকারত্ব আছে কেন? এ জিনিসগুলো আমাদের বুঝতে হবে। এবং শিক্ষার বিপুল অংশ যে অপচয়িত হচ্ছে, এর প্রমাণ এই যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় একটি আসনের জন্য ২০০ ছেলেমেয়ে প্রতিযোগিতা করছে। রাষ্ট্রে যদি সম্পদের সমবণ্টন-মানে অপেক্ষাকৃত সাম্যভিত্তিক বণ্টন হতো, তাহলে অন্তত মানুষের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা লাভ করার আকাঙ্ক্ষা, তারা সরকারি চাকরি করবে, ব্যবসা করবে, তার নাগরিক অধিকার পাবে, সেগুলো হয়নি। দুটো বিষয় আমি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলি। একটা হচ্ছে অর্থনৈতিক গ্রোথ আন্তর্জাতিক ব্যবসার সঙ্গে কত বেশি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলো আমদানি-রপ্তানি ও বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমে। আরেকটা প্যারালাল আইডিওলজি আছে, এটাকে বলা হয় হিউম্যান রাইটস। যার মানে হচ্ছে, মানুষের ন্যূনতম অধিকার রক্ষা করতে হবে। কিন্তু কই সিভিল রাইটসের কথা আর কেউ বলে না।
হিউম্যান রাইটসের মধ্যে লুকিয়ে ফেলেছেন এটা। হিউম্যান রাইটস মানে হচ্ছে, ওই যে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার অধিকার। আর সিভিল রাইটস হচ্ছে, নিজের দেশ নিজে শাসন করার অধিকার। আমাদের রাজনীতিতে এই আকাঙ্ক্ষা তো আসবেই। পৃথিবীর সব দেশই স্বাধীন হচ্ছে। ভারত স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে, ব্রুনাই স্বাধীন হয়েছে ১৯৮৪ সালে। অর্থাৎ কলোনিয়ালিজম থেকে নিউকলোনিয়ালিজমের কথা যদি আপনি বলেন, তাহলে আপনি রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়েছেন, কিন্তু আর্থিকভাবে হননি। আপনি নানাভাবে নগ্ন রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাচ্ছেন দক্ষিণ আমেরিকায়। ভেনিজুয়েলার পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল আমি নিয়ে নেব, কিন্তু তার জন্য তো ছুতোর অভাব হয়নি। সাদ্দামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল উইপনস অব ম্যাস ডেস্ট্রাকশন তৈরি করেছে, ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে বলছে, ড্রাগ ট্রাফিকিং করছে। সে ড্রাগ ট্রাফিকিং করছে কি করছে না, এটা আমার বিবেচ্য নয়, কিন্তু এই যুক্তি দিয়ে যেটা করা হচ্ছে, আপনার তেলটা দখল করে নিচ্ছে। এই যে নিউকলোনিয়াল যুগ চলছে, যেখানে অলরেডি বলপ্রয়োগের রাজনীতি আবার শুরু হয়েছে, পৃথিবীর এই টালমাটাল অবস্থায় আমাদের মতো ছোট দেশে অনেকটা নিরাপদে চলতে হলে আমাদের সম্পদ যেটা আছে, এটার সদ্ব্যবহার করতে হবে। সেটা আমরা করিনি। সদ্ব্যবহার মানে, এর সুবণ্টন। আমরা কি শিক্ষা ক্ষেত্রে যথেষ্ট বরাদ্দ করেছি? যা বরাদ্দ হয়, তারও অপচয় হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যারা প্রধান শিক্ষক, এত বছর আন্দোলনের পর তাদের দশম গ্রেডে বেতন দেওয়া হবে!
যুগান্তর : আমি একটু সাপ্লিমেন্ট করি, সেটা হচ্ছে দেখেন, আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে যে বাজেট, সেটা জিডিপির বোধহয় ১.৭২ শতাংশ। অথচ ইউনেস্কোর প্রেসক্রিপশন হচ্ছে ৪ থেকে ৬ পার্সেন্ট রাখতে হবে।
ড. সলিমুল্লাহ : ইউনেস্কোর প্রেসক্রিপশন ৬, আগে ছিল ৪। এখানে একটা পয়েন্ট বলা দরকার। কথা হচ্ছে, স্বাধীনতার পরে সব দেশে একটা প্রধান দাবি ছিল যে, নিরক্ষরতা দূর করতে হবে। কারণ নিরক্ষরতা দূর না করলে আধুনিক শিল্পকারখানার শ্রমিক হতে পারবেন না আপনি। আপনি মেশিন চালাতে পারবেন না। নিরক্ষরতা দূর করা দরকার মানে হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করা দরকার। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা কতটুকু পর্যন্ত, এটা নিয়ে একটা কনফিউশন আছে।
যুগান্তর : আবার শিক্ষাতেই চলে আসি। মানে আমাদের শিক্ষা সিস্টেমের খোলনলচে পালটানোর ব্যাপার
আছে কি?
ড. সলিমুল্লাহ : অবশ্যই। আমার কথাটা শেষ করতে দিন। জাতিসংঘের কথা আপনি বলছেন, সামান্য ত্রুটি আছে বলেই তো আমি কথা বলছি। বলা হচ্ছে, যদি আপনি নিরক্ষরতা দূর করতে চান, তাহলে আপনার জিডিপির কমপক্ষে শতকরা ৬ ভাগ খরচ করতে হবে। এটা হলো ১৯৬৮ সালে ইউনেস্কো বলেছিল। এটা সাজেশন, আইন নয়। কিন্তু যারা নিরক্ষরতা দূর করেছেন, যেমন কিউবা, তারা শতকরা ১০ থেকে ১১ ভাগ খরচ করেছে। আমাদের এটা খরচ করা কি অসম্ভব ছিল? পাকিস্তান আমলে আমাদের একটা দাবি ছিল, এটা যেন করা হয়, কিন্তু বৈষম্যের কারণে হয়নি বলে আমরা মনে করি। পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানে এর বেশি খরচ করা হয়নি। তো মহাত্মা গান্ধীর সময় বলা হয়েছিল, প্রাথমিক শিক্ষা হবে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত, তিনি এর নাম দিয়েছিলেন বুনিয়াদি শিক্ষা। একটু গণিত জানবে, পাটিগণিত জানবে, একটু অক্ষরজ্ঞান থাকবে। কিন্তু পৃথিবীর সব দেশে মনে হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা মানে হচ্ছে ১২ বছর পর্যন্ত পড়া। এটাকে বুনিয়াদি শিক্ষা বলা হয়। এলিমেন্টারি অ্যান্ড ফান্ডামেন্টাল এডুকেশন। আমাদের দেশে সোজা কথায় এলিট শ্রেণি নিজেদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ান এবং দরকারমতো তাদের বিদেশে পাঠান। নিজেরা মুখে জনগণকে বলেছে, শিক্ষার ব্যাপক প্রসার করতে হলে মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কোনো প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় যে দাবি উঠেছিল-সর্বত্র নিরক্ষরতা দূর করতে হবে, মাতৃভাষার মাধ্যমে অন্তত প্রাথমিক অর্থাৎ বুনিয়াদি শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে, সেটা ভারত সরকারও পালন করেনি, পাকিস্তানও পালন করেনি। বাংলাদেশ তো বলাই বাহুল্য।
যুগান্তর : আচ্ছা, আমি একটু সমস্যাটা অন্যভাবে দেখছি। ফিনল্যান্ডে ছিলাম মাস তিনেক আগে। ওদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একটা স্টাডি করলাম। ওখানে শিক্ষা গ্রহণ করাটাই বড় কথা নয়, এটা সুশিক্ষা হচ্ছে কি না, দ্যাট ম্যাটারস। যেমন ধরুন, আমাদের এখানে যিনি শিক্ষিত হচ্ছেন, তার অ্যানালিটিক্যাল মাইন্ড গ্রো করছে কি না, তার একটা ক্রিটিক্যাল থিংকিং-এর মন আছে কি না, নাকি সে জিপিএ-৫ পেয়ে বা একটা ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি নিয়ে মনে করছে বিরাট কিছু, এসব কি দেখা হচ্ছে? এই যে একটা মডার্ন আউটলুক তৈরি করা, বিজ্ঞানমনষ্ক শিক্ষিত তৈরি করা, একটা গ্লোবাল অ্যাটিটিউড তৈরি করা-আমি দেখছি শিক্ষাটার অনেক অভাব আছে এখানে। এগুলো রিস্ট্রাকচারালাইজ করা দরকার আছে কি?
ড. সলিমুল্লাহ : অ্যাবসোলিউটলি দরকার আছে। শিক্ষা নিয়ে যখনই আমরা কথা বলি, আমাদের তিনটা কথা বলতে হবে। প্রথম কথা হচ্ছে, শিক্ষার ভাষা কী হবে। মানে কোন ভাষার মাধ্যমে আপনি পড়বেন? এটা মৌলিক প্রশ্ন। এটা শিক্ষার্থীর মাতৃভাষায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেমন বিচারব্যবস্থায় যিনি বিচারপ্রার্থী এবং যিনি বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন, তাদের মাতৃভাষায় বিচার হওয়া দরকার। বিচারককে তার ভাষা শিখতে হবে। উলটো করলে হবে না। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার বিষয়বস্তু কী হবে। শিক্ষায় কী পড়াবেন? এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্যের সঙ্গে আরও একটা বিষয় জড়িত আছে, বিধেয়। সেটা হচ্ছে, কত বছর তাকে পড়াতে হবে। রাষ্ট্র সবটুকু শিক্ষা দিতে পারবে না। কোন শিক্ষাটা রাষ্ট্রকে দিতে হবে-মানে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় খরচ হবে, কোন শিক্ষাটা প্রাইভেটে হবে-এটার একটা ভাগাভাগি দরকার। আমি বলছি আমাদের যে রিস্ট্রাকচারিং দরকার, সেটাই হচ্ছে এটা। শিক্ষার অধিকার সর্বজনীন করতে হবে। সবাইকে দিতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কতটুকু সর্বজনীন হবে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, এটা সারা পৃথিবীতেও আছে, বুনিয়াদি শিক্ষা হচ্ছে ১২ বছরের স্কুল। মানে আমাদের দেশে যেটাকে উচ্চমাধ্যমিক বলি, সেই পর্যন্ত। কারণ উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত না পড়লে তার পক্ষে আধুনিক মেশিন বোঝা সম্ভব নয়। এটা হলো জেনারেল এডুকেশন। এর মধ্যে কোনো গ্রুপিংয়ের দরকার নেই। শিক্ষামাত্রই হবে এখানে জগৎকেন্দ্রিক এবং নীতিকেন্দ্রিক। শিক্ষার আরও একটা দিক হচ্ছে, নৈতিকতা। এটা বিভিন্ন ধর্মে শিক্ষা দেওয়া হতো আগে।
