স্বাধীনতা: উচ্চারণে সহজ, বাস্তবে কতটা অর্জিত?
“স্বাধীনতা”— শব্দটি উচ্চারণে যত সহজ, এর প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি ততটাই কঠিন। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার বয়স এখন ৫৫ বছর পেরিয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক। ভূখণ্ডের স্বাধীনতা পেলেও আমরা কি সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে পেরেছি?
স্বাধীনতা শুধু একটি পতাকা, মানচিত্র বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির নাম নয়। এটি মানুষের মর্যাদা, মতপ্রকাশের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। এই মানদণ্ডে বিচার করলে দেখা যায়, আমাদের অগ্রগতি যেমন অস্বীকার করা যাবে না, তেমনি অপূর্ণতাও কম নয়।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখনো বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার সীমাবদ্ধতা প্রশ্ন তুলছে স্বাধীনতার গভীরতা নিয়ে। নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক, দলীয়করণ, এবং ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা— এসব কি সেই গণতান্ত্রিক চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়েছিলেন?
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি— সবই বাস্তব সাফল্য। কিন্তু একইসাথে আয়বৈষম্য, বেকারত্ব এবং দুর্নীতির বিস্তার সাধারণ মানুষের প্রকৃত মুক্তিকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যদি সবার জীবনে সমান স্বস্তি না আনে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির উচ্চকণ্ঠ উপস্থিতি। অতীতে যারা এই রাষ্ট্রের জন্মের বিরোধিতা করেছিল, আজ তাদের মধ্যে কেউ কেউ নতুন পরিচয়ে, নতুন ভাষায় সক্রিয়। এটি কি কেবল রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ, নাকি আমাদের জাতীয় চেতনার দুর্বলতা? স্বাধীনতার চেতনা যদি সমাজের গভীরে প্রোথিত হতো, তবে কি এই ধরনের শক্তি এতটা দৃশ্যমান হতে পারত?
এখানেই মূল সংকট— আমরা স্বাধীনতাকে স্মরণ করি, উদযাপন করি, কিন্তু তা কি যথেষ্টভাবে ধারণ করি? স্বাধীনতা কেবল অতীতের গৌরব নয়, এটি বর্তমানের দায়বদ্ধতা। এটি রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দাঁড়িয়ে আমাদের আত্মসমালোচনা জরুরি। কারণ স্বাধীনতা একদিনে অর্জিত হলেও, এর পূর্ণতা অর্জন একটি চলমান প্রক্রিয়া।
শেষ পর্যন্ত সত্যটি সরল—স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক নিজেকে নিরাপদ, মর্যাদাবান এবং স্বাধীন মনে করে। তার আগ পর্যন্ত স্বাধীনতা শুধু উচ্চারণে সহজ একটি শব্দ, বাস্তবে নয়।
আজিজুর রহমান কিরন, সাংবাদিক
ইমেইল: azizur.kiron@gmail.com
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)