সংশোধন নয়, সংবিধান এখন সন্ধিক্ষণে—সংস্কার কি এড়ানো সম্ভব?
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম
সংশোধন নয়, সংবিধান এখন সন্ধিক্ষণে—সংস্কার কি এড়ানো সম্ভব?
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সাম্প্রতিক আলোচনা প্রমাণ করছে—সংবিধান প্রশ্নটি আর শুধু আইনি বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন সরাসরি রাজনৈতিক বৈধতা, জনগণের ম্যান্ডেট এবং রাষ্ট্র কাঠামোর ভবিষ্যতের প্রশ্ন। “সংশোধন নাকি সংস্কার”—এই দ্বিধা আজ বাস্তব সংকটে রূপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সংসদীয় আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো “জুলাই জাতীয় সনদ” এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও তার অধিবেশন নিয়ে অচলাবস্থা। বিরোধী পক্ষের দাবি—সংবিধান সংস্কারের জন্য যে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং রাজনৈতিক অনীহা স্পষ্ট। অন্যদিকে সরকারপক্ষ এই প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ বা অপ্রয়োজনীয় বলে দেখাতে চাইছে।
এখানেই মূল দ্বন্দ্ব। একপক্ষ বলছে—জনগণের গণভোটের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে রায় এসেছে, তাই একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। অন্যপক্ষ বলছে—সংসদই সার্বভৌম, তাই সংশোধনের মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। এই বিতর্কের মধ্যেই আসল প্রশ্নটি প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে: সংবিধান কি বর্তমান রাষ্ট্র বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
জুলাই সনদের পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একটি গণঅভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকার, একাধিক সংস্কার কমিশন, জাতীয় ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা—সব মিলিয়ে একটি “নতুন সামাজিক চুক্তি” তৈরির ইঙ্গিত সেখানে ছিল। এমনকি গণভোটের মাধ্যমেও জনগণের মতামত নেওয়ার দাবি উঠে এসেছে এবং তা বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে কেবল ধারাবাহিক সংশোধন কি যথেষ্ট?
সংবিধান সংশোধন সাধারণত ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রিত একটি প্রক্রিয়া। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই এটি সম্ভব। কিন্তু সংস্কার একটি ভিন্ন বিষয়—এটি রাজনৈতিক ঐকমত্য, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন এবং জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের প্রশ্ন তোলে। আর ঠিক এই জায়গাটিতেই বাংলাদেশ বারবার পিছিয়ে গেছে।
সামাপ্রতিক সময়ে সংসদীয় উত্তেজনা আসলে একটি গভীর অস্বস্তির প্রতিফলন। বিরোধীদল সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন চায়, কারণ তারা মনে করে বর্তমান কাঠামোতে আস্থা সংকট রয়েছে। সরকারপক্ষ সংশোধনের পথেই থাকতে চায়, কারণ সেটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। কিন্তু রাষ্ট্র কি এই দ্বন্দ্বে আটকে থাকতে পারে?
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—যদি এই বিতর্ক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সংবিধান আবারও একটি দলীয় দলিলে পরিণত হবে। তখন এটি জনগণের চুক্তি নয়, ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, সংবিধানকে যখনই দলীয় প্রয়োজন অনুযায়ী বদলানো হয়েছে, তখনই তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। আজকের প্রেক্ষাপট আরও সংবেদনশীল, কারণ এখানে “সংস্কার বনাম সংশোধন” শুধু শব্দের পার্থক্য নয়—এটি রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণের প্রশ্ন।
এখন প্রয়োজন একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত।
যদি সংশোধনের পথেই হাঁটা হয়, তাহলে তা হতে হবে সীমিত, স্বচ্ছ এবং সর্বদলীয় আলোচনার ভিত্তিতে।
আর যদি সংস্কারের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা হতে হবে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, গণভোট এবং একটি স্বাধীন সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে।
দ্বিধা নিয়ে এগোনো যাবে না। সংবিধান কোনো রাজনৈতিক সুবিধার খাতা নয়; এটি রাষ্ট্রের আত্মা। সেই আত্মাকে বারবার খণ্ডিত করে টিকিয়ে রাখা যায় না। আজকের সংসদীয় বিতর্ক তাই শুধু একটি প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন নয়—এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভিত্তি কোন পথে গড়ে উঠবে, সেই সিদ্ধান্তের মুহূর্ত।
এখন সময়—সংশোধনের আড়াল থেকে বেরিয়ে সত্যিকারের সংস্কারের সাহস দেখানোর।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)