Logo
×

Follow Us

সম্পাদকীয়

টার্নওভার ট্যাক্স ২.৫%: রাজস্বের সহজ পথ, না ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ?

Icon

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২০ পিএম

টার্নওভার ট্যাক্স ২.৫%: রাজস্বের সহজ পথ, না ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ?

টার্নওভার ট্যাক্স ২.৫%: রাজস্বের সহজ পথ, না ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ?

আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের ওপর ন্যূনতম কর বা টার্নওভার ট্যাক্স ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই করের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো— লাভ হোক বা লোকসান, নির্দিষ্ট হারে কর দিতে হবে। ফলে এটি সরাসরি ব্যবসার মুনাফার সাথে নয়, বরং বিক্রয় বা লেনদেনের পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল। এখানেই বিতর্কের মূল।

এনবিআরের যুক্তি একদিক থেকে সহজবোধ্য। কর আদায়ে বড় ঘাটতি, করজালের বাইরে বিপুল সংখ্যক ব্যবসা, আর করযোগ্য আয় দেখানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা—এসব কারণে একটি “ন্যূনতম কর” নিশ্চিত করতে চায় সংস্থাটি। অর্থাৎ কেউ লাভ লুকালেও অন্তত লেনদেনের ভিত্তিতে কিছু কর আদায় হবে। রাজস্ব বাড়ানোর জন্য এটি একটি প্রশাসনিকভাবে সহজ পদ্ধতি।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই পদ্ধতি কতটা ন্যায্য এবং বাস্তবসম্মত?

টার্নওভার ট্যাক্সের মূল সমস্যা হলো— এটি লাভজনক ও অলাভজনক ব্যবসার মধ্যে পার্থক্য করে না। একটি ব্যবসা যদি ১০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করে কিন্তু মুনাফা থাকে মাত্র ১ শতাংশ, তাহলে ২.৫ শতাংশ টার্নওভার কর মানে লাভের চেয়েও বেশি কর। ফলে ব্যবসা চালানোই অলাভজনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে পাইকারি ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি, সুপারশপ, ওষুধ, ভোগ্যপণ্য; যেখানে মার্জিন কম, সেখানে এই কর মারাত্মক চাপ তৈরি করবে।

আরো বড় বিষয় হলো, এই কর মূলত সৎ ব্যবসাকেই বেশি আঘাত করবে। যারা নিয়মিত হিসাব রাখে এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন করে, তাদের ওপরই এই কর কার্যকর হবে। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকা বা আংশিক হিসাব দেখানো ব্যবসা তুলনামূলকভাবে কম চাপ অনুভব করবে। এতে করব্যবস্থার ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি আছে।

এখানে আরেকটি বাস্তবতা উপেক্ষা করা যায় না। বর্তমানে ব্যবসায়ীরা উচ্চ সুদহার, ডলারের চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার মতো বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। এই সময়ে টার্নওভার ট্যাক্স বাড়ানো হলে তা মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ব্যবসা বাড়তি করের বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিতে বাধ্য হবে।

তাহলে কি টার্নওভার ট্যাক্স প্রয়োজন নেই? প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেটির হার ও প্রয়োগপদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, একক হার না রেখে খাতভিত্তিক হার নির্ধারণ করা যেতে পারে। যেসব খাতে মার্জিন কম, সেখানে হার কম রাখা এবং উচ্চ মার্জিন খাতে তুলনামূলক বেশি হার নির্ধারণ করলে বাস্তবতা প্রতিফলিত হবে।

দ্বিতীয়ত, টার্নওভার ট্যাক্সকে স্থায়ী কর হিসেবে নয়, “ন্যূনতম বিকল্প কর” হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ আয়কর হিসাবের সঙ্গে তুলনা করে যেটি বেশি, সেটি প্রযোজ্য হবে। এতে লোকসানী ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে না।

তৃতীয়ত, ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। নির্দিষ্ট টার্নওভারের নিচে থাকলে এই কর প্রযোজ্য না করা হলে ব্যবসা টিকে থাকার সুযোগ পাবে।

চতুর্থত, করের হার বাড়ানোর আগে করের ভিত্তি বাড়ানোই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। এখনো বিপুল পরিমাণ ব্যবসা পুরোপুরি করজালের বাইরে। ডিজিটাল লেনদেন বাধ্যতামূলক করা, ই-ইনভয়েস চালু করা, ভ্যাট ও আয়কর তথ্য সমন্বয় করা—এসব পদক্ষেপ নিলে রাজস্ব বাড়বে, হার বাড়ানো ছাড়াই।

সবশেষে বলা যায়, টার্নওভার ট্যাক্স বাড়ানো রাজস্ব বাড়ানোর দ্রুত উপায় মনে হতে পারে, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা পরিবেশকে দুর্বল করতে পারে। লাভ-লোকসান বিবেচনা না করে কর চাপানো নীতিগতভাবে সহজ হলেও অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। করব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু রাজস্ব বাড়ানো নয়, বরং ব্যবসা টিকিয়ে রেখে টেকসই রাজস্ব নিশ্চিত করা।

অতএব, ১ শতাংশ থেকে সরাসরি ২.৫ শতাংশে লাফ দেয়া নয়, বরং ধাপে ধাপে, খাতভিত্তিক ও বাস্তবতাভিত্তিক সংস্কারই হতে পারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ। এতে রাজস্বও বাড়বে, আবার ব্যবসার চাকা থমকে যাওয়ার ঝুঁকিও কমবে।

আজিজুর রহমান কিরন 

সিনিয়র সাংবাদিক

মন্তব্য করুন