Logo
×

Follow Us

অন্যান্য

সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ও ডাটাবেজ: বাস্তবতা কতটা?

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম

সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ও ডাটাবেজ: বাস্তবতা কতটা?

সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ও ডাটাবেজ: বাস্তবতা কতটা?

সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ আবার আলোচনায় এসেছে। সরকারের যুক্তি, এতে ভুয়া সাংবাদিকতা কমবে, পেশার মান বাড়বে এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি হবে। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বাস্তবতা বিবেচনায় প্রশ্ন উঠছে, এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত হবে।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা ঐতিহ্যগতভাবে একটি উন্মুক্ত পেশা। বহু প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকের একাডেমিক পটভূমি সাংবাদিকতা নয়। কেউ ইতিহাস, কেউ রাষ্ট্রবিজ্ঞান, কেউবা অর্থনীতি বা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হয়েও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজেকে দক্ষ সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ফলে কঠোর শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করলে অভিজ্ঞতাভিত্তিক সাংবাদিকতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে পেশার মানোন্নয়নের পরিবর্তে একটি কৃত্রিম সীমারেখা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাংবাদিকতা মূলত দক্ষতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, নৈতিকতা ও মাঠের অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে; শুধু ডিগ্রি দিয়ে এই গুণগুলো নির্ধারণ করা কঠিন।

আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো দেশের গণমাধ্যম কাঠামোর বৈচিত্র্য। জাতীয় পর্যায়ের বড় সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে অসংখ্য পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল ও স্থানীয় প্রতিনিধি কাজ করছেন। এদের বড় অংশই নিয়মিত বেতনভুক্ত নন, অনেক ক্ষেত্রে সম্মানীভিত্তিক বা আংশিক সময়ের কাজ করেন। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে গেলে প্রথম প্রশ্নই হবে—কাকে সাংবাদিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে? স্থানীয় প্রতিনিধি, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, অনলাইন প্রতিবেদক— তাদের অবস্থান কী হবে? এই বাছাই প্রক্রিয়া যদি স্পষ্ট ও স্বচ্ছ না হয়, তাহলে এটি সহজেই বিতর্কের জন্ম দিতে পারে এবং নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কাও তৈরি করতে পারে।

“ভুয়া সাংবাদিক” সমস্যাটি অবশ্যই বাস্তব এবং দীর্ঘদিনের। পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, প্রভাব খাটানো বা ব্যক্তিস্বার্থে সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করার অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের মাধ্যমে সম্ভব নয়। কারণ ভুয়া পরিচয়ধারীরা প্রায়ই কোনো না কোনোভাবে কার্ড সংগ্রহ করে নেয়। এখানে মূল সমস্যা নিয়োগের স্বচ্ছতা, প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। এসব জায়গায় পরিবর্তন না এনে শুধু যোগ্যতা নির্ধারণ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।

ডাটাবেজ তৈরির ধারণা নীতিগতভাবে কার্যকর হতে পারে, যদি তা পেশাগত উন্নয়ন ও সহায়তার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। যেমন প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, কল্যাণ তহবিল, পেশাগত স্বীকৃতি বা জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এই ডাটাবেজ যদি অনুমোদন, নিয়ন্ত্রণ বা প্রবেশাধিকার সীমিত করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলতে পারে। সাংবাদিকতার শক্তি তার বহুমত ও স্বাধীনতা; অতিরিক্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সেই জায়গাকে সংকুচিত করতে পারে।

সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন অবশ্যই জরুরি। তবে তার পথ হতে পারে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা চর্চা, সম্পাদকীয় তদারকি, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভুয়া পরিচয় ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে পেশার মান স্বাভাবিকভাবেই উন্নত হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ও কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নীতিগতভাবে ইতিবাচক হলেও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে এটি নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সাংবাদিক সংগঠন, গণমাধ্যম মালিকপক্ষ, সম্পাদক ও মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা জরুরি। নিয়ন্ত্রণ নয়, পেশাগত উন্নয়ন— এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা হলে তবেই তা কার্যকর হতে পারে।

আজিজুর রহমান কিরন

সাংবাদিক ও বিশ্লেষক 

ই-মেইল : azizur.kiron @gmail.com

মন্তব্য করুন