বাজেট: প্রত্যাশা, বাস্তবতা ও জবাবদিহির পরীক্ষা
দুই দশক পর বিএনপির বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম
জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক কৌশল এবং জনগণের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তাই বাজেট ঘোষণার দিন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা। কারণ কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলনের মধ্যে পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে।
দুই দশকেরও বেশি সময় পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের অর্থনীতি নানা ধরনের চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ। ব্যাংকিং খাত আস্থার সংকটে ভুগছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় কম। শিল্পখাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের প্রথম বাজেটকে শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত সরকারের সক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং প্রশাসনিক দক্ষতার প্রথম বড় পরীক্ষা।
বাজেটে রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা হলো, রাজস্ব আহরণ প্রায় প্রতি বছরই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়। করদাতার সংখ্যা সীমিত, কর ফাঁকি ব্যাপক এবং অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো কার্যকরভাবে কর কাঠামোর আওতায় আসেনি। ফলে নতুন সরকারকে একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হবে। একদিকে রাজস্ব বাড়াতে হবে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।
এখানেই সবচেয়ে বড় নীতিগত প্রশ্নটি সামনে আসে। সরকার কি সহজ পথ বেছে নিয়ে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর আরও চাপ বাড়াবে, নাকি করের আওতা বিস্তৃত করে নতুন করদাতা সৃষ্টি করবে? অর্থনীতিবিদদের দীর্ঘদিনের পরামর্শ হলো, করহার বৃদ্ধির চেয়ে করজাল সম্প্রসারণ বেশি কার্যকর ও টেকসই সমাধান। কারণ অতিরিক্ত কর অনেক সময় বিনিয়োগ ও উৎপাদন নিরুৎসাহিত করে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন। জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ এবং বাজারে চাহিদার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার লড়াই করছে। এই অবস্থায় করের বাড়তি চাপ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে বিএনপি দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থেকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা করেছে। তারা সুশাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। ফলে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন প্রকল্প ঘোষণা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবায়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বরাদ্দের ঘাটতির চেয়ে বড় সমস্যা হলো অপচয় ও অদক্ষতা। অনেক উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের বহু বছর পরে শেষ হয়। প্রকল্প ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায় না। ফলে জনগণের করের অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
বিএনপি সরকারের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা হবে প্রশাসনিক সমন্বয়। প্রায় বিশ বছর পর রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণ যত ভালোই হোক, প্রশাসনিক বাস্তবায়ন দুর্বল হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে ধীরগতি রয়েছে, সেটি কাটিয়ে উঠতে না পারলে বাজেটের অনেক লক্ষ্যই কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
সামাজিক সুরক্ষা খাতও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সুবিধা পৌঁছে দেওয়া জরুরি। বরাদ্দ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
এছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলোর একটি। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই হারে বাড়ছে না। তাই এই বাজেটের সফলতা পরিমাপের অন্যতম মানদণ্ড হবে নতুন চাকরি সৃষ্টি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির হার।
সবশেষে বলা যায়, বিএনপির জন্য এই বাজেট একটি অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনার চেয়েও বেশি কিছু। এটি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রমাণ এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরীক্ষাপত্র। জনগণ বাজেটের আকার বা পরিসংখ্যান দেখে মুগ্ধ হবে না; তারা দেখতে চায় বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমেছে কি না, কর্মসংস্থান বেড়েছে কি না, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে কি না এবং করের অর্থের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না।
বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে সংসদে নয়, বাজারে; বক্তৃতায় নয়, বাস্তব জীবনে। আগামী এক বছরই বলে দেবে এই বাজেট অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে নিতে পেরেছে, নাকি এটি কেবল আরেকটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিন্তু অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির দলিল হয়ে থাকবে।
আজিজুর রহমান কিরন
সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
ই-মেইল : azizur.kiron @gmail.com
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)