Logo
×

Follow Us

অন্যান্য

তারেক রহমানকে কেন চীনের ‘ডাবল প্রায়োরিটি’?

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০১:৪১ পিএম

তারেক রহমানকে কেন চীনের ‘ডাবল প্রায়োরিটি’?

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফর শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফর নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক শক্তির নতুন সমীকরণের মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। বিশেষ করে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সাথে পৃথক আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ পাওয়াকে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতি একটি বিশেষ রাজনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

কূটনৈতিক প্রোটোকলে সাধারণত কোনো দেশের সরকারপ্রধান সফরে গেলে রাষ্ট্রপ্রধান অথবা সরকারপ্রধানের একজনের সাথে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়, অন্যজনের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু তারেক রহমানের ক্ষেত্রে দুই শীর্ষ নেতার সাথে পূর্ণাঙ্গ বৈঠকের আয়োজন চীনের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব যে বেড়েছে, তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত।

প্রশ্ন হলো, কেন এই গুরুত্ব?

প্রথমত, বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য প্রতিযোগিতা এবং উৎপাদন খাতের স্থানান্তরের যুগে বাংলাদেশ চীনা শিল্প বিনিয়োগের একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শ্রমঘন শিল্প, বৃহৎ ভোক্তা বাজার এবং বঙ্গোপসাগরীয় অবস্থান বাংলাদেশকে চীনের কাছে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

দ্বিতীয়ত, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। মোংলা বন্দর উন্নয়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের মতো প্রকল্পগুলো শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত গুরুত্বও বহন করে। বেইজিং জানে, আগামী দশকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের সাথে সম্পর্কের ভিত্তি আরো মজবুত করতে চায় চীন। বেইজিংয়ের কূটনৈতিক দর্শন হলো, যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে শক্তিশালী রাখা। তবে নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করার ক্ষেত্রে চীন সাধারণত আরও আত্মবিশ্বাসী থাকে, কারণ এতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বার্তা। নতুন সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলছে। এই অবস্থান চীনের জন্য ইতিবাচক। কারণ বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ায় এমন অংশীদার খুঁজছে, যারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পর্ক পরিচালনা করবে।

তবে এই সফরের গুরুত্ব শুধু চীনের আগ্রহে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি বড় সুযোগ। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি বৈদেশিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ফলে সম্পর্ককে আরো গভীর করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষ করে আরসিইপি, ব্রিকস এবং এসসিওর মতো বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রশ্ন এখন কেবল কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথেও জড়িত। এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের ক্ষেত্রে চীনের সমর্থন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে সুযোগের পাশাপাশি সতর্কতারও প্রয়োজন রয়েছে। চীনের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা যেমন জরুরি, তেমনি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য অংশীদারদের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যই হলো ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’। সেই নীতি থেকে বিচ্যুত না হয়েই জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

চীনের দেয়া এই ‘ডাবল প্রায়োরিটি’কে তাই কেবল কূটনৈতিক সম্মান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বাংলাদেশের প্রতি বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত আগ্রহের প্রতিফলন। এখন প্রশ্ন হলো, ঢাকা এই আগ্রহকে কতটা দক্ষতার সাথে অর্থনৈতিক সুযোগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধির বাস্তব অর্জনে রূপান্তর করতে পারে।

তারেক রহমানের এই সফর সেই পরীক্ষারই সূচনা। সফর শেষে কতগুলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কতটা নিশ্চিত হলো এবং দুই দেশের সম্পর্ক কতটা সমমর্যাদাপূর্ণ ও পারস্পরিক লাভজনক ভিত্তির ওপর দাঁড়ালো। কূটনীতির প্রকৃত সাফল্য সেখানেই।

আজিজুর রহমান কিরন

সাংবাদিক ও বিশ্লেষক 

ই-মেইল : azizur.kiron @gmail.com

মন্তব্য করুন