আধিপত্যের রাজনীতি থেকে আইনের শাসনে— সহিংসতা থামাতেই হবে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২৬, ০৪:১১ পিএম
দেশজুড়ে সাম্প্রতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতা একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে—রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায়নি। বরং স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার, প্রভাব প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে সংঘর্ষ যেন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। পাবনা, কিশোরগঞ্জ, শরীয়তপুর, কুষ্টিয়া কিংবা নাটোর— ভৌগোলিক বিস্তৃতি ভিন্ন হলেও সহিংসতার ধরন ও প্রেক্ষাপট প্রায় একই। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো একটি গভীরতর সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রত্যাশিত থাকে। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো ইঙ্গিত দিচ্ছে। ক্ষমতার কেন্দ্র দখলের পর স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পুরোনো ও নতুন নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, ত্যাগী বনাম সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর সংঘাত—এসবই এখন সহিংসতার ইন্ধন জোগাচ্ছে।
এই সংঘর্ষগুলোর অন্তর্নিহিত কারণ খুঁজতে গেলে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, স্থানীয় পর্যায়ে ‘ক্ষমতা’ মানেই অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ—চাঁদাবাজি, টেন্ডার, বাজার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলের ভেতরে কার্যকর সাংগঠনিক শৃঙ্খলার অভাব। তৃতীয়ত, আইনের শাসনের দুর্বল প্রয়োগ, যা অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সহিংসতা থামছে না, বরং ছড়িয়ে পড়ছে। এর মানে কেবল অভিযান বা গ্রেপ্তার দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব হচ্ছে না। যখন একটি সমাজে মানুষ বিশ্বাস করে যে রাজনৈতিক পরিচয়ই সুরক্ষার ঢাল, তখন আইন তার নিরপেক্ষতা হারাতে বসে। এই অবস্থাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে উদ্বেগের স্বর থাকলেও কার্যকর প্রতিকার এখনও দৃশ্যমান নয়। কেন্দ্রীয় নেতারা প্রায়ই দায় ঠেলে দেন স্থানীয় সংগঠনের ওপর। কিন্তু প্রশ্ন হলো—দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা কি কেবল স্থানীয় পর্যায়ের দায়িত্ব? কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দৃঢ় বার্তা ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ অনিবার্য—
প্রথমত, দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। যে-ই হোক, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকলে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে তাকে বহিষ্কার ও আইনের আওতায় আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হলে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটবেই।
তৃতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। সংঘর্ষপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও শিক্ষাগত উদ্যোগ নিতে হবে। সহনশীলতা, সহাবস্থান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক মূল্যবোধ পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাজনীতি যদি জনসেবার বদলে আধিপত্যের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। আজকের এই সহিংসতা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট।
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থা পুনর্গঠন। কারণ, নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কোনও উন্নয়ন টেকসই হয় না।
সময় এখন কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সহিংসতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এই আগুন একসময় সবাইকে গ্রাস করবে।
আজিজুর রহমান কিরন, সাংবাদিক
ইমেইল: azizur.kiron@gmail.com
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)