সড়কের রক্তাক্ত ঈদ, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই কারও
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:০২ পিএম
সড়কের রক্তাক্ত ঈদ, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই কারও
ঈদুল ফিতরের আনন্দ যখন ঘরে ঘরে পৌঁছানোর কথা, তখন সড়কে ঝরেছে রক্ত, নিভেছে অসংখ্য প্রাণ। সাত দিনের ছুটিতে সরকারি হিসাবে ৯২টি দুর্ঘটনায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর বেসরকারি সংস্থার হিসাবে ২৬৮ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ২০৪। এই দ্বৈত পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, আমাদের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা কত গভীর। প্রশ্ন উঠছে— এই মৃত্যুমিছিলের দায় কি কেবল সরকারের, নাকি সাধারণ মানুষ ও চালকদেরও সমান দায় রয়েছে?
প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এখানে অনস্বীকার্য। সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথ্য সংগ্রহেই যখন পিছিয়ে, তখন কার্যকর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নই বা কোথায়? কুমিল্লার পদুয়ার বাজারের মতো বড় দুর্ঘটনাও যখন সরকারি হিসাবে আসে না, তখন বোঝা যায় বাস্তবতা কতটা ভয়াবহ। ঈদের আগে কিছুদিন কড়াকড়ি থাকলেও, পরে নজরদারির ঢিলেঢালা অবস্থান পরিস্থিতিকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এই ‘অস্থায়ী কঠোরতা’ আসলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি একটি দায়সারা প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রতিফলন।
তবে দায় শুধু সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই বাস্তবতা ধরা পড়বে না। সড়কের এই নৈরাজ্যের বড় অংশীদার চালক ও সাধারণ মানুষও। লাইসেন্সবিহীন চালক, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা— এসব যেন এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। আইন প্রয়োগ না থাকলে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে—এটি যেমন সত্য, তেমনি আইন না মানার প্রবণতাও সমানভাবে দায়ী।
আরেকটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। দ্রুতগতির মহাসড়কে ধীরগতির, নিরাপত্তাহীন এই যানগুলোর উপস্থিতি এক ধরনের ‘মরণফাঁদ’ তৈরি করছে। এগুলোর কোনো মানসম্মত নকশা নেই, নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবুও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এগুলোর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধনের উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখনো দূরস্বপ্ন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— আমরা যেন দুর্ঘটনাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে শিখে গেছি। প্রতি ঈদেই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ে, প্রতিবেদন হয়, আলোচনা হয়, তারপর সবকিছু আবার আগের মতো চলতে থাকে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে ‘রেকর্ড’ শব্দটি শুধু পরিসংখ্যানেই নয়, শোকের ইতিহাসেও যুক্ত হতে থাকবে।
সমাধান কী? প্রথমত, সড়ক ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, লাইসেন্সবিহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত যান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি স্তরে।
রাষ্ট্র যদি আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হয়, আর নাগরিক যদি আইন মানতে অনিচ্ছুক থাকে— তাহলে সড়ক কখনোই নিরাপদ হবে না। এই সত্য যত দ্রুত আমরা উপলব্ধি করব, তত দ্রুতই হয়তো কমবে এই অপ্রয়োজনীয় প্রাণহানি। নইলে ঈদের আনন্দ বারবার ঢেকে যাবে শোকের কালো ছায়ায়।
আজিজুর রহমান কিরন, সাংবাদিক
ইমেইল: azizur.kiron@gmail.com
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)