‘৬’ সংখ্যাটার সঙ্গে পর্তুগালের একটা অদ্ভুত সংযোগ আছে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইউসেবিওর পর্তুগাল তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে উঠেছিল, শেষ পর্যন্ত হয়েছিল তৃতীয়। সেই বিশ্বকাপের ৪০ বছর পর ২০০৬ বিশ্বকাপে পর্তুগাল আরও একবার সেমিফাইনালে। তার ১০ বছর পর ২০১৬ সালে এসে পর্তুগাল জিতল প্রথমবারের মতো ইউরো। আরেকটি ‘৬’, ২০২৬ সালে এসে সেই ছয়ের আশীর্বাদে কি পর্তুগাল বড় কিছু করতে পারবে? যে যাত্রাটা শুরু হচ্ছে আজ রাতে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে।
‘বড়’ কিছু বলতে যে বিশ্বকাপ, তা না বললেও চলে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ বলে শুধু নয়, এই পর্তুগালের ২৬ জনের স্কোয়াড দেখলে আপনার তা মনে হতেই পারে। মজার ব্যাপার, ছয়ের এই সৌভাগ্যের কথা সংবাদ সম্মেলনে মনে করিয়ে দিয়েছেন পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ নিজেই। হয়তো জানেন, দল যতই ভালো হোক, বিশ্বকাপ জিততে একটু ভাগ্যের ছোঁয়া তো লাগেই!
ভাগ্যের ছোঁয়ায় হোক আর না হোক, রোনালদো বিশ্বকাপটা পেতে চাইবেন যেকোনো মূল্যে। এই একটি ট্রফিই যে অধরা থেকে গেছে তাঁর। আর ৪১ বছর বয়সে এবারই হয়তো তাঁর ‘লাস্ট ড্যান্স’। ‘হয়তো’ বলতে হচ্ছে, কারণ ৪১ বছর বয়সে এই বিশ্বকাপটাই তো তাঁর খেলার কথা ছিল না। অন্তত সাড়ে তিন বছর আগে ২০২২ বিশ্বকাপের কথা মনে করলে তো বটেই। সেবারের পর্তুগাল কোচ ফার্নান্দো সান্তোস শেষ ষোলোতে গিয়ে শুরুর একাদশেই রাখেননি, রোনালদোর জায়গা নিয়ে দুর্দান্ত খেলে নিজের আগমনী বার্তা জানিয়েছিলেন গঞ্জালো রামোস নামের তরুণ স্ট্রাইকার। পর্তুগালের বিদায়ের সঙ্গে রোনালদোর অশ্রু মিলে একটা যুগের শেষ বলে হয়তো ধরে ফেলেছিলেন কেউ।
কেউ কেউ পর্তুগালের সেই প্রজন্মের চেয়ে এই প্রজন্মকেই বেশি এগিয়ে রাখছেন। বড় কারণ পর্তুগালের মিডফিল্ড।
কিন্তু অতীতের অনেকবারের মতো রোনালদো আরও একবার ফিরে এসেছেন স্বমহিমায়। রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ খেলছেন এবং এখনো স্ট্রাইকার হিসেবে পর্তুগালের প্রথম পছন্দ। আট গোল করে গত বছরের নেশনস লিগে হয়েছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে পাঁচ গোল করে হয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। কয়েক দিন আগে আল নাসরের হয়ে জিতেছেন নিজের প্রথম সৌদি লিগ। কে বলবে, রোনালদো ফুরিয়ে গেছেন! মার্তিনেজ তো তাঁকে ‘ব্ল্যাংক চেক’ দিয়ে বলছেন, রোনালদো যত দিন চান, খেলে যেতে পারেন।
রোনালদোর জন্য প্রেরণা হতে পারে সাবেক জার্মান স্ট্রাইকার ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানের একটা কথা। ক্লিন্সমান ২০২২ সালের আর্জেন্টিনার সঙ্গে মিল পাচ্ছেন এবারের পর্তুগালের। সেবার যেমন মেসির জন্য পুরো আর্জেন্টিনা এককাট্টা হয়ে খেলেছিল, ক্লিন্সমান এবার তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছেন পর্তুগালের জন্য। রোনালদো অবশ্য এই কথা শুনে একটু স্মৃতিকাতরও হতে পারেন, এমন কিছু তিনিও দিতে চেয়েছিলেন ফিগো-ডেকোদের। ২০০৬ সালে তাঁর অভিষেক বিশ্বকাপে পর্তুগালের সোনালি প্রজন্ম আশা জাগিয়েও পারেনি। এবার কি আরেকটি সোনালি প্রজন্মের হাত ধরে সেই আক্ষেপ মিটবে?
কেউ কেউ পর্তুগালের সেই প্রজন্মের চেয়ে এই প্রজন্মকেই বেশি এগিয়ে রাখছেন। বড় কারণ অবশ্যই পর্তুগালের মিডফিল্ড। ব্রুনো ফার্নান্দেজ এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ইনফর্ম মিডফিল্ডারদের একজন, কয়েক দিন আগে ভেঙেছেন প্রিমিয়ার লিগে এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গোল করানোর রেকর্ড। ভিতিনহা ও জোয়াও নেভেস মাত্রই টানা দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন পিএসজির হয়ে। তা ক্লাবের ফর্মটা জাতীয় দলে টেনে আনতে পারলেই তো হয়। মিডফিল্ড এমনই তারায় তারায় খচিত যে বের্নার্দো সিলভার মতো খেলোয়াড়কেও বেঞ্চে বসে থাকতে পারে!
রোনালদো তো আছেনই, আক্রমণেও আছে অনেক সম্ভাবনাময় নাম। চেলসির পেদ্রো নেতো, এসি মিলানের রাফায়েল লেয়াও বা রোনালদোর আল নাসর সতীর্থ জোয়াও ফেলিক্স। আগের বিশ্বকাপে রোনালদোর বিকল্প গঞ্জালো রামোসও আছেন এবারও। রক্ষণে রুবেন দিয়াজ, জোয়াও কানসেলো আর নুনো মেন্দেসরা আছেন। এই পর্তুগাল কাগজে–কলমে দুর্দান্ত দল, তা নিয়ে তর্ক নেই।
আরও একজন অবশ্য থাকতে পারতেন এই স্কোয়াডে। দল ঘোষণার সময় মার্তিনেজ যাঁকে বলেছেন দলের ২৭তম সদস্য। দিয়োগো জোতার তো এই দলে থাকারই কথা ছিল। গত বছর মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় এই ফরোয়ার্ডের মৃত্যু এখনো কাঁদায় পর্তুগিজ দলকে। বিশ্বকাপ কে না জিততে চায়, জোতার জন্য হয়তো আরও বেশি করে চায় পর্তুগাল।