কর্নেল ডা. নাজমুল হুদা খান (অব.)
বাংলাদেশে পারমাণবিক যুগের সূচনা: আশীর্বাদ ও আশঙ্কা

দীর্ঘ ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ অবশেষে পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ করেছে। পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হওয়া শুধু একটি প্রযুক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। তবে এই অগ্রযাত্রার সঙ্গে যেমন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে, তেমনি কিছু গুরুতর আশঙ্কাও রয়েছে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত কয়েকটি প্রধান উৎসের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে তাপবিদ্যুৎ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা এবং ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাপবিদ্যুতের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে। মোট চাহিদার প্রায় ৪৩ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা হয়। এর পরেই রয়েছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, যা বর্তমানে মোট উৎপাদনের প্রায় ২৬ থেকে ২৭ শতাংশ জোগান দেয়। এছাড়া তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—বিশেষ করে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল—প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভূমিকা রাখে, যদিও এটি তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। অন্যদিকে, জলবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের অবদান এখনো সীমিত। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের একমাত্র বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে কাজ করছে, আর সৌরশক্তি ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করছে। সব মিলিয়ে এই খাত থেকে বর্তমানে মোট বিদ্যুতের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ উৎপাদিত হয়।
দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বিদ্যুৎ আমদানিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে সরাসরি গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি বহুমুখী ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যাতে তাপবিদ্যুৎ প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে, আর নবায়নযোগ্য শক্তি ও আমদানি সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক শক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎস হিসেবে বিবেচিত। প্রায় ৩৩টি দেশে ৪০০-এর বেশি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী মোট বিদ্যুতের প্রায় ৯ শতাংশ সরবরাহ করে । উন্নত প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে অনেক দেশই এখন এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং জ্বালানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে পারমাণবিক শক্তির দিকে হাত দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এ প্রকল্প দেশের বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ইতিমধ্যে প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে দেশের পারমাণবিক শক্তির যুগে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। জ্বালানি লোডিং শেষ হতে দেড় মাস লাগবে। এ প্রক্রিয়া শেষে জুলাইয়ের শেষ অথবা আগস্ট মাসের প্রথমদিকে প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এরপর চলতি বছরের শেষের দিকে বা আগামী বছরের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে এই ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এরপর দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমানে প্রধানত গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক; যার বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক বিদ্যুৎ একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে প্রায় ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে । পারমাণবিক শক্তি থেকে কার্বন নিঃসরণ অত্যন্ত কম, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে । অল্প পরিমাণ ইউরেনিয়াম থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদনের সক্ষমতা এটিকে অর্থনৈতিকভাবেও কার্যকর করে তুলেছে। পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় চুল্লির কার্যকর জীবনকাল সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ বছর হতে পারে। সঠিক ব্যাবস্থাপনায় এ মেয়াদ আরও বাড়ানো সম্ভব। এই দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা অন্যান্য শক্তি উৎপাদন প্রযুক্তির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একবার স্থাপিত হলে পারমাণবিক শক্তি দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম।
অর্থনৈতিক দিক থেকে, পারমাণবিক শক্তি একটি ব্যয় সাশ্রয়ী বিকল্প হতে পারে। যদিও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ অত্যন্ত উচ্চ, দীর্ঘমেয়াদে এটি অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়বহুল হতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থিতিশীল খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিচালনার খরচ সাধারণত অন্যান্য শক্তি উৎসের তুলনায় কম। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে এবং দেশের বিদ্যুৎ খাতে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়ক হতে পারে বলে আশা করা যায়
অনেক সুফল ও সুবিধার মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় বাংলাদেশের সামনে বহুবিধ বড় চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। প্রথমত, জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট প্রযুক্তিনির্ভর চুল্লির ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী না থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, উচ্চমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বড় একটি দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বর্জ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা একটি জটিল বিষয়। পারমাণবিক প্রযুক্তি, জ্বালানি ও অর্থায়ন প্রায়শই বৈশ্বিক শক্তির সাথে যুক্ত থাকায় যেকোনো কূটনৈতিক টানাপড়েন প্রকল্পে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে সফলতা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, স্বচ্ছ নীতি ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো দুর্ঘটনার আশঙ্কা। ইতিহাসে চেরনোবিল (১৯৮৬) এবং ফুকুশিমা (২০১১)-এর মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা প্রমাণ করেছে, একটি ছোট ত্রুটিও কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে । তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়লে তা বহু বছর ধরে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে, এমনকি কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত এর ক্ষতিকর প্রভাব বহন করতে হয়। পারমাণবিক বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জটিও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহৃত জ্বালানি হাজার বছর পর্যন্ত বিপজ্জনক থাকতে পারে, তাই এর নিরাপদ সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে, যার মাধ্যমে ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের জন্য ফেরত পাঠানো হবে। তবুও এই ব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে রূপপুর প্রকল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর, কোর ক্যাচার, ডাবল কনটেইনমেন্ট এবং স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক । এমনকি বিদ্যুৎ বা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই জরুরি পরিস্থিতিতে রিয়্যাক্টর বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, মানবিক ভুল বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানোর বিষয়ে উন্নত দেশগুলোও নিশ্চিত হতে পারেনি।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর প্রভাব ব্যাপক হতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং তথ্যের ঘাটতি উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে । জরিপে দেখা গেছে, অনেকেই পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় বিভ্রান্তিতে ভুগছেন এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই পরিস্থিতিতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় জনগণকে সঠিক তথ্য প্রদান, জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মহড়ার আয়োজন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে বিদেশি নির্ভরতা কমানো যায়। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বড় ধরনের বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সঙ্গে জড়িত এই প্রকল্পে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি থাকলে তা দেশের ভাবমূর্তি ও নিরাপত্তা উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে ।
সন্দেহ নেই, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে এবং পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য একদিকে আশীর্বাদ । তবে এর সাথে যুক্ত ঝুঁকিগুলোও সমানভাবে আশঙ্কার কারণ। তাই এগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ আজ পারমানবিক যুগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রা সফল করতে হলে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত নীতি, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জনসচেতনতা এবং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা। তাহলেই পারমাণবিক শক্তি আমাদের উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে—হয়ে উঠবে আশীর্বাদের প্রতীক।









































