প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ২২ ঘণ্টা আগে

হাঁড়িভাঙার সুনামে সমৃদ্ধ উত্তরের অর্থনীতি

প্রতি বছর এই আম জুনের ২০ তারিখে বাজারজাত শুরু হলেও, এবার আগাম আম পাড়তে শুরু করেছেন চাষিরা

উত্তরের বিখ্যাত সুমিষ্ট ও ভিন্ন স্বাদের রসালো হাঁড়িভাঙা আম বাজারে এসেছে। এই আম কিনতে বাজারগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসছে পাইকাররা। ভালো দাম পেয়ে আম চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে। সারি সারি আমগাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় আম। ‘হাঁড়িভাঙা’ আমচাষের মধ্য দিয়েই অর্থনীতির চাকা ঘুরেছে উত্তরাঞ্চলে। সমৃদ্ধ হচ্ছে একসময়ের অভাব অনটনে থাকা কৃষকরা।

ভিন্ন স্বাদের কারণে ভোক্তাপ্রিয় রংপুরের জিআইপণ্যখ্যাত ‘হাঁড়িভাঙা’ আম এ বছর একটু আগেই বাজারে এসেছে। গত সোমবার আম বাজারে আসার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিন। প্রতি বছর এই আম জুনের ২০ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত শুরু হলেও, এবার তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গাছ থেকে আগাম আম পাড়তে শুরু করেছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। সোমবার দুপুরে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকার বাগান থেকে ‘হাঁড়িভাঙা’ আম ছিঁড়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন। এরপরই পুরোদমে শুরু হয় ‘হাঁড়িভাঙা’, আম পাড়া ও বেচাবিক্রি।

শুধু পদাগঞ্জ হাটেই নয়, ‘হাঁড়িভাঙা’ আমের প্রধান উৎপাদন এলাকা খোঁড়াগাছ, পাইকার হাট, ময়েনপুর, চ্যাংমারী, বালুয়া, মাসুমপুর, কুতুবপুর, গোপালপুর, লোহানীপাড়া, রামনাথপুর, কালুপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আম বিক্রির হাঁকডাক শুরু হয়েছে। এসব এলাকায় এখন আম বিক্রির ধুম চলছে। হাটবাজারে মানুষের সমাগমে যে কারো মনে হতে পারে এসব এলাকা যেন ‘হাঁড়িভাঙা’ আমের রাজ্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, আম বাগানের মালিক, আমের ফড়িয়া, বাগানের পরিচর্যায় নিয়োজিত ব্যক্তি, মৌসুমি আম বিক্রেতা, অনলাইনে আম বিক্রেতা, পরিবহন ব্যবসায়ী, কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসায়ী সবাই যে-যার মতো করে আম কেনাবেচার জন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন।

পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষি মশিউর রহমান জানান, তিনি ১০ একর জমিতে আমের চাষ করেছেন। শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে বাগানের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তবে আমের ভালো দাম থাকায় ক্ষতি পুষিয়ে লাভের আশা করছেন তিনি।

স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী রাঙ্গা মিয়া জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক বড় বড় পার্টি এরই মধ্যে যোগাযোগ শুরু করেছেন। তিনি আশা করছেন, এবার আমের দাম ও চাহিদা দু’টোই সন্তোষজনক হবে।

এদিকে রংপুর নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সড়ক, সিটি বাজার, লালবাগ, মডার্ন মোড়, ধাপ বাজার, শাপলা চত্বরসহ নগরীর বিভিন্ন হাটবাজারেও মিলছে এই আম। হাটবাজার ছাড়াও পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে ফেরি করে ‘হাঁড়িভাঙা’ আম বিক্রি করতে দেখা গেছে। তবে প্রতিবারের মতো এবারও শুরুতেই আমের চড়া দাম চাইছেন বিক্রেতারা।

আমচাষি ও উদ্যোক্তা হানিফুর রহমান সজীব বলেন, এবার আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেকেই আগে থেকে আম পাড়তে শুরু করেছে। আমের আকার বা সাইজভেদে প্রতি মণ আম সর্বনিম্ন ১ হাজার ২০০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। সহনীয় তাপমাত্রা থাকলে আমের বাজার কিছুটা বেশি হয় বলেও জানান এই ব্যবসায়ীরা।

তিনি বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা’ আম খেতে সুস্বাদু। একেকটি আম ১৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম হয়। খুচরা বাজারে এর দাম আরো বেশি। কাঁচা আমের তুলনায় আবার পাকা আমের দাম কম।

এক্ষেত্রে গাছপাকা আম হলে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। কিন্তু এই আমগাছ থেকে সংগ্রহের চার-পাঁচ দিনের মধ্যে পেকে যায়। এ কারণে প্রতি মৌসুমে প্রচুর আম নষ্ট হয়।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, উত্তরের ৫ জেলা রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও লালমনিরহাটে এ বছর প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমিতে ‘হাঁড়িভাঙা’ আমচাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টন। প্রতি হেক্টরে ‘হাঁড়িভাঙা’ আম প্রায় ১০ থেকে ১২ টন ফলন হয়। সব কিছু ঠিক থাকলে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার ওপরে ‘হাঁড়িভাঙা’ আম বিক্রি হবে বলে জানিয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, গ্যাপ অনুসরণ করে বর্তমানে বাংলাদেশের আম ৩০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। আগামীতে আরো বেশি বেশি আম রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে।

রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমীন বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা’ আমকে জেলা প্রশাসনের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আম রপ্তানি বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার, ওয়াশ ব্লক নির্মাণ, ব্যাংক শাখা স্থাপন এবং ম্যাংগো ট্রেন চালুসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা’ আম যাতে প্রতি বছরই বেশি জমিতে চাষ হয় সে ব্যাপারে আমরা নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এই আম যাতে বিদেশে রপ্তানি হয় সে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। আশা করি চাষিরা লাভবান হবেন। তিনি বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা’ আম চাষে উত্তরের এই জেলাগুলোতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটেছে। আমচাষিরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমচাষের কারণে এ অঞ্চলে এ সময় যে অভাব অনটন থাকার কথা সেটি আর নেই। এই আমচাষই ভবিষ্যতে উত্তরের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়