২০২৬ সালের মে মাস পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পালাবদলের সাক্ষী। ৯ মে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীর দিনে কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী।
এই ক্ষমতা পরিবর্তন কেবল একটি দলের হাতবদল নয়; বরং প্রশাসনিক দর্শনেরও রূপান্তর। সরকার গঠনের পর থেকেই শুরু হয়েছে কঠোর উচ্ছেদ অভিযান, বেআইনি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার কর্মসূচি এবং গবাদি পশু জবাইয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত যোগী আদিত্যনাথের তথাকথিত ‘বুলডোজার মডেল’-এর পূর্ব ভারতে সম্প্রসারণ।
সরকার এসব পদক্ষেপকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জনস্বার্থের অংশ হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকদের মতে, এর ভেতরে রয়েছে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি, জনতাত্ত্বিক পুনর্বিন্যাস ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল; যার অভিঘাত বাংলাদেশের ওপরও পড়তে পারে।
পরিচয়বাদী রাজনীতির উত্থান
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কেবল অর্থনৈতিক সংকট বা শাসকবিরোধী ক্ষোভ নয়, বরং ধর্মীয় পরিচয় ও ‘অনুপ্রবেশকারী বনাম ভূমিপুত্র’ আখ্যান ভোটের বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে। বিজেপি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই পরিচয়বাদী রাজনীতিকে সামাজিক মনস্তত্ত্বের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
বুলডোজার সংস্কৃতির বিস্তার
ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই কলকাতা, হাওড়া ও বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। হাওড়া স্টেশনের বাইরে মধ্যরাতে পুলিশি পাহারায় সারিবদ্ধ দোকান ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষও ঘটে।
এই অভিযান শুধু হকার উচ্ছেদে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একটি অবৈধ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর সরকার অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। গড়িয়ায়
তৃণমূল আমলে নির্মিত একটি স্থাপনা এবং নৈহাটিতে বিরোধী দলের কার্যালয়ও ভেঙে ফেলা হয়।
ভারতের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে বুলডোজার এখন আর কেবল নির্মাণযন্ত্র নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও তাৎক্ষণিক শাস্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দৃশ্যমান প্রতীক ধ্বংসের মধ্য দিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বার্তা দেওয়া হচ্ছেÑরাষ্ট্রই চূড়ান্ত শক্তি।
তবে এর সামাজিক মূল্যও কম নয়। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায়। উন্নয়ন বা আইন প্রয়োগের নামে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা সামাজিক বিভাজনকে আরো তীব্র করে।
গো-রাজনীতি ও গ্রামীণ সংকট
ঈদুল আজহার আগে রাজ্য সরকার ১৯৫০ সালের পুরোনো পশুকল্যাণ আইন কঠোরভাবে কার্যকরের নির্দেশ দেয়। নতুন বিধিতে গবাদি পশু জবাইয়ের জন্য প্রশাসনিক ও পশু চিকিৎসকের যৌথ অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়। পশুটির বয়স ১৪ বছরের বেশি এবং কৃষিকাজে অযোগ্য প্রমাণিত না হলে জবাইয়ের অনুমতি মিলবে না।
আইনটি রাজনৈতিকভাবে মুসলিম সম্প্রদায়কে চাপে ফেললেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়েছে গ্রামীণ পশুপালন খাতে। ঈদের বাজারকে কেন্দ্র করে ঋণ নিয়ে পশু পালনকারী
কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। বাজারে ক্রেতা কমে যাওয়ায় বহু খামারি দেনার দায়ে পড়েছেন।
গরুর বয়স প্রমাণে ‘জন্ম সনদ’ চাওয়ার মতো বক্তব্য গ্রামীণ বাস্তবতার সঙ্গে প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতাকেই সামনে এনেছে।কৃষকদের দাবিÑসরকার যদি বিক্রি সীমিত করে, তবে অনুৎপাদনশীল পশু কেনার দায়ও সরকারের নিতে হবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন চাপ
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ক্ষমতায় এসে সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দ্রুত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে চরমপন্থি কিছু প্রস্তাবও জনপরিসরে এসেছে, যা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলা ভাষী মুসলিমদের জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে ঢাকা নীরব থাকবে না। কিন্তু এখনো দুই দেশের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক বোঝাপড়া গড়ে ওঠেনি।
এই পরিস্থিতি দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস আরো বাড়াতে পারে। কারণ ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশেও ধর্মীয় মেরুকরণকে উসকে দিতে পারে।
পানি রাজনীতি ও আঞ্চলিক সমীকরণ
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদল তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টন প্রশ্নেও নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকলেও তিস্তা চুক্তির অগ্রগতি এখনো অনিশ্চিত। কারণ পশ্চিমবঙ্গে পানির সংকট ক্রমেই বাড়ছে এবং কৃষকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো চুক্তি করা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বড় প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছে। এসব প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা ভারতীয় কৌশলগত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বলেও ধারণা রয়েছে।
এই বাস্তবতায় ভারত তার কূটনৈতিক কৌশলেও পরিবর্তন আনছে। কেবল আমলাতান্ত্রিক সম্পর্ক নয়, রাজনৈতিক যোগাযোগকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য কী বার্তা?
উত্তর প্রদেশের ‘বুলডোজার মডেল’ পূর্ব ভারতে প্রয়োগের এই প্রচেষ্টা কেবল প্রশাসনিক কড়াকড়ি নয়; এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের অংশ। এর লক্ষ্য আঞ্চলিক পরিচয়ের জায়গায় বৃহত্তর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু এই মডেলের প্রতিক্রিয়াও সমান বাস্তব। ভারতে ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়লে তার অভিঘাত বাংলাদেশেও পড়বে। উগ্রবাদ, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সামাজিক অস্থিরতাÑসবই নতুন করে মাথাচাড়া দিতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে ইতিমধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা আগামী এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ভারত যদি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আখ্যান ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পূর্ব ভারতের এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
