Logo
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্প-ইরান বাকযুদ্ধ : আসল সত্য কোথায়?

Icon

অপূর্ব রায়

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১৭:৪১

ট্রাম্প-ইরান বাকযুদ্ধ : আসল সত্য কোথায়?

তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী একটি বিলবোর্ডে ট্রাম্প এবং হরমুজ প্রণালির ছবির সামনে ইরানের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি। ছবি : রয়টার্স

দীর্ঘ সামরিক সংঘাত আর নজিরবিহীন নৌ-অবরোধের পর স্থায়ী শান্তি আলোচনার অচলাবস্থা যেন কাটছেই না। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক নাটকীয় ঘোষণা দুই দেশের মাঝে বরফ গলার আভাস দিলেও তার ঠিক পরপরই ইরানের সেটি তীব্র প্রত্যাখ্যানসব মিলিয়ে এই মুহূর্তে বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় আলোচনা, আসলে কী ঘটছে পর্দার আড়ালে? কে সত্য বলছেন? হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে বসা ট্রাম্প, নাকি ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তিতে বিশ্বাসী তেহরানের শীর্ষ মধ্যস্থতাকারীরা?

দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবি ও বিপরীতমুখী অবস্থানের চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের চিত্র সামনে আসে। মার্কিন অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো দাবি করছে, দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্রও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি রাজনৈতিক বোঝাপড়া অর্জিত হয়েছে। যদিও চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। কিন্তু জল ঘোলা হয়েছে ঠিক তখনই, যখন ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একে নিজের একটি একচ্ছত্র বিজয় হিসেবে জাহির করতে চেয়েছেন। ট্রাম্পের দাবি, তার জারি করা অভূতপূর্ব নৌ-অবরোধের কারণেই ইরান হাঁটু গেড়ে বসেছে এবং মাটির নিচে চাপা পড়া তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ ধ্বংস করবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি কোনো ধরনের শুল্ক ছাড়াই বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ সম্পূর্ণ ভুয়া বিজয় এবং সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইরানি সূত্রগুলোর স্পষ্ট দাবি, ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা বিনাশুল্কে জাহাজ চলাচলের মতো কোনো অপমানজনক শর্ত মূল খসড়া চুক্তিতে একেবারেই নেই। বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষই আসলে নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনগণের কাছে নিজেদের জয়ী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। মূলত খসড়া চুক্তির কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দিক বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় সত্য আসলে কার পক্ষে।

ইরানের জন্য এই আলোচনার প্রধানতম দাবিই ছিল হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া; যাকে তেহরান শুরু থেকেই জলদস্যুতা হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছিল। অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতিকে বাঁচাতে তেলের সরবরাহ সচল করা ট্রাম্পের জন্যও জরুরি ছিল। ফলে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং প্রণালিটি উভয়মুখী চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়ে দুই পক্ষই একমত হয়েছেএটিই বাস্তব সত্য। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ট্রাম্প একে ইরানের আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখাতে চাইলেও ইরান একে দেখছে তাদের অবরোধ ভাঙার কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে।

অর্থ ও অবরুদ্ধ সম্পদের বিষয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানকে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। অন্যদিকে ইরানি সূত্রগুলো বলছে, খসড়া চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্তই হলো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের শতকোটি ডলারের সম্পত্তি অবমুক্ত করা। রয়টার্সের রাজনৈতিক বোঝাপড়ার তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সম্পত্তি ছাড়ের বিষয়ে নীতিগত চুক্তি হলেও তার আইনি বা কারিগরি প্রক্রিয়াটি হয়তো ট্রাম্প সিচুয়েশন রুমে তার চূড়ান্ত অনুমোদনের পর কার্যকর করতে চান। ফলে ট্রাম্প কৌশলগতভাবে অর্থ ছাড়ের বিষয়টি তার দেশের জনগণের কাছে চেপে গেছেন।

এ ছাড়াও খসড়া চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সমীকরণে লেবাননে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ট্রাম্প তার পোস্টে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে নিজের মিত্র ইসরায়েলের স্বার্থের কথা চিন্তা করে ট্রাম্প হয়তো এই বিষয়টি এখনই প্রকাশ্যে এনে ঘরোয়া রাজনীতিতে কোনো চাপ নিতে চাননি। ট্রাম্প যখন চুক্তিটিকে মার্কিন শক্তির বিজয় হিসেবে দেখাচ্ছেন, ঠিক তখনই ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক হুঙ্কার দিয়ে পরিস্থিতি পুরো বদলে দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মুখের কথা বা গ্যারান্টির ওপর তাদের বিশ্বাস নেই এবং কেবল বাস্তব পদক্ষেপই আসল পরিমাপক।

গালিবাফ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মনে করিয়ে দেন, ইরান কোনো আলোচনার টেবিলে টেবিল চাপড়ে ছাড় আদায় করে না; বরং ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তির জোরে ছাড় বাধ্য করে। ইরানের এই অবস্থান প্রমাণ করে, পর্দার আড়ালে রাজনৈতিক বোঝাপড়া হলেও তারা কোনোভাবেই ওয়াশিংটনের সামনে নিজেদের দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন করতে রাজি নয়। তারা বিশ্বকে দেখাতে চায়, এই চুক্তি কোনো নতি স্বীকার নয়, বরং তাদের দীর্ঘদিনের সামরিক প্রতিরোধেরই যৌক্তিক ফল।

বাস্তবতা হলো, দুই দেশই এই মুহূর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে একটি চুক্তির টেবিলে বসতে বাধ্য হয়েছে। ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে বসে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। অন্যদিকে ইরানও তাদের সার্বভৌমত্ব ও সামরিক গৌরবের জায়গায় একচুল ছাড় দিতে নারাজ। খসড়া চুক্তিটি বাস্তব এবং দুই পক্ষই এর মূল কাঠামোর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কিন্তু সেই চুক্তির মোড়কটি কে কত আকর্ষণীয়ভাবে নিজের দেশের মানুষের কাছে বিক্রি করতে পারেন চলমান এই বাকযুদ্ধ মূলত তারই অংশ। আসল সত্য লুকিয়ে আছে দুই পক্ষের এই পারস্পরিক প্রচারণামূলক কৌশলের ঠিক মাঝখানটায়।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ফেয়ার দিয়া ১১/৮/ই, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট (লেভেল-৮), বক্স কালভার্ট রোড, পান্থপথ, ঢাকা ১২০৫