জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশ অনেক বছর ধরে ভালো কাজ করছে। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা শৃঙ্খলা ও মানবিক আচরণের জন্য সুনাম অর্জন করেছে। ছবি : সংগৃহীত
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কর্মরত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রশিক্ষণ জরুরি। বিশ্বের সংঘাতকবলিত স্থানগুলোতে শান্তিরক্ষীদের ওপর অপরাধীরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে হামলা করে। ফলে প্রথাগত অস্ত্র ব্যবহার করে তা থেকে আত্মরক্ষা করা কঠিন। বর্তমান বিশ্বে শান্তি রক্ষা কাজ শুধু অস্ত্র বা শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, প্রযুক্তির ব্যবহারও অনেক বেড়ে গেছে। এখন নিরাপত্তা পরিস্থিতি বোঝার জন্য ড্রোন, নজরদারি ক্যামেরা, তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়।
জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশ অনেক বছর ধরে ভালো কাজ করছে। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা শৃঙ্খলা ও মানবিক আচরণের জন্য সুনাম অর্জন করেছে। কিন্তু ভবিষ্যতে শুধু ভালো ব্যবহার বা সাহস থাকলেই হবে না, প্রযুক্তি সম্পর্কেও দক্ষ হতে হবে। এআই জানা থাকলে শান্তিরক্ষীরা দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবেন, ঝুঁকি আগে বুঝতে পারবেন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। তা ছাড়া এআই প্রশিক্ষণ না থাকলে বাংলাদেশিদের শান্তিরক্ষী হিসেবে নিয়োগ পাবার সংখ্যা কমে যেতে পারে।
অর্থের অভাবে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে সংকট বিরাজ করছে। বিগত এক দশকের তুলনায় বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষীর সংখ্যা অর্ধেকই কমে গেছে। জাতিসংঘের ১১টি মিশনের প্রায় ৫০ হাজার সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক সদস্য নিয়োজিত আছেন। এই সংখ্যা এক দশক আগের চেয়ে ৪৯ শতাংশ কম। কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান, লেবানন, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, আবেই অঞ্চল, হাইতি, মালি, লিবিয়া, সাইপ্রাস, কসোভো ও পশ্চিম সাহারাসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তিরক্ষী মোতায়েন করা আছে। ইরাক-ইরান যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে গঠিত মিশনের মধ্য দিয়ে ১৯৮৮ সালে মাত্র ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক দিয়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে ৯টি মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের চার হাজার ২১২ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে শান্তিরক্ষী পাঠানো দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় দুই লাখ ছয় হাজার শান্তিরক্ষী বিশ্বের ৪৩টি দেশে ৬৩টির বেশি মিশনে দায়িত্ব পালন করেছে। এ পর্যন্ত ১৭৫ জন বিশ্বশান্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। চলতি বছরের ৬ জুন সুদানের কাদুগলিতে জাতিসংঘের আবেই অঞ্চলের অন্তর্বর্তীকালীন নিরাপত্তা বাহিনীতে দায়িত্ব পালনকালে নিহত ছয় বাংলাদেশিকে মরণোত্তর জাতিসংঘের মর্যাদাপূর্ণ ‘দ্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক’-এ ভূষিত করা হয়, যা বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশিদের বেশি চাহিদার মূল কারণ হলো পেশাদারি ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করা। সংঘাতকবলিত এলাকায় এমন দায়িত্ব পালন সহজ নয়। দুষ্কৃতকারীদের অতর্কিত হামলার আশঙ্কা অন্যদিকে ম্যালেরিয়ার মতো বিভিন্ন রোগের প্রকোপ থেকে আত্মরক্ষাÑদুই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা কাজ করেন। এমনও দেখা গেছে যে, যেখানে পশ্চিমা দেশের শান্তিরক্ষীরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছেন; কিন্তু বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের বিশেষ অবদানের কারণে আফ্রিকা মহাদেশের দেশ সিয়েরা লিয়নে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বে বিশেষ কিছু কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তি সৃষ্টি হচ্ছে বা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ। এই প্রচারের সুযোগ কাজে লাগানোর জন্যে কূটনৈতিকভাবে ফলোআপ কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত। যেসব দেশের সঙ্গে শান্তি রক্ষার মাধ্যমে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি সহজ।
জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ফলে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা উন্নত প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। তারা যে সমরাস্ত্র শান্তি রক্ষায় ব্যবহার করছেন, কার্যক্রম শেষে সেগুলো বাংলাদেশ পেয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের শান্তি রক্ষা মিশনে অর্জিত আয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ শান্তিরক্ষীরা পেয়ে থাকেন। গত তিন যুগে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশন থেকে প্রায় ৩১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা দেশের অর্থনীতিতে সংযোজিত হয়েছে।
সম্প্রতি ডিফেন্স জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিজাব) বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অবদান শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে। সেখানে প্রধান অতিথির ভাষণে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অবদান আমরা যথাযথ উপলব্ধি করি না, যা তারা উপার্জন করে আনেন সেটা জীবনের চেয়ে বড় না। উনারা জীবনবাজি রেখে শান্তি রক্ষার কাজ করে যাচ্ছেন। আমি উনাদের স্যালুট জানাই।’
ওই সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিশ্বে প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলোর যথাযথ অর্থায়ন নিশ্চিত হলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী সদস্যরা আরো সুনাম ও সাফল্য অর্জন করতে পারবেন।’
লেখক : অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর, দেশকাল নিউজ ডটকম
