Logo
×

Follow Us

ফিচার

লক্ষ্মীপুরে বিকশিত হচ্ছে ট্রলার শিল্প

Icon

জুনায়েদ আহম্মেদ

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৬:৪৫

লক্ষ্মীপুরে বিকশিত হচ্ছে ট্রলার শিল্প

ছবি : সংগৃহীত

কানো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা আধুনিক ডকইয়ার্ড নেই, তবুও শুধু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে লক্ষ্মীপুরে গড়ে উঠেছে ট্রলার নির্মাণ শিল্প। উপকূলীয় এই জেলায় এখন বছরে প্রায় চারশ সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলার ও নৌকা তৈরি হচ্ছে, যাতে বার্ষিক বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকায়। এক সময় সমুদ্রগামী বড় ফিশিং ট্রলারের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হলেও এখন স্থানীয় কারিগরদের নিপুণ ছোঁয়ায় লক্ষ্মীপুরেই তৈরি হচ্ছে এসব যান। এতে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো মানুষের।

লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার টাংকি বাজার, চরগাজী, আসলপাড়া, আলেকজান্ডার মাছঘাট, কমলনগর উপজেলার মতিরহাট, ভাঙ্গাপুল, জারিরদোনা, লুধুয়া, ফলকন, পাটোয়ারিরহাট, সদর উপজেলার মজুচৌধুরীরহাট, বেড়ির মাথা ও রায়পুর উপজেলার চরবংশী, হাজীমারাসহ জেলার প্রায় ১৩টি স্থানে ছোট-বড় নৌকা ও সমুদ্রে চলাচলকারী ফিশিং ট্রলার তৈরি করেন কারিগররা। বংশপরম্পরায় পাওয়া অভিজ্ঞতায় কারিগররা কাঠ ও লোহার সমন্বয়ে নিখুঁতভাবে তৈরি করছেন এসব ট্রলার।

একটি বড় ফিশিং ট্রলার তৈরিতে আকারভেদে কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। বর্তমানে এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রশিক্ষণ পেলে এই শিল্প আরো বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইনফোগ্রাফিক : লক্ষ্মীপুরের ক্রমবর্ধমান ট্রলার নির্মাণ শিল্প

বার্ষিক বিনিয়োগ : প্রায় ২০০ কোটি টাকা

বার্ষিক উৎপাদন : প্রায় ৪০০টি জলযান (১০০+ সমুদ্রগামী ট্রলার ও ৩০০+ নৌকা)

প্রধান নির্মাণ কেন্দ্র : ১৩টি স্থান (রামগতি, কমলনগর, সদর ও রায়পুর উপজেলা)

কর্মসংস্থান : এক হাজার প্লাস প্রত্যক্ষ এবং কয়েক হাজার পরোক্ষ কর্মী।

নিবন্ধিত ফিশিং ট্রলার : লক্ষ্মীপুর জেলাধীন মেঘনায় প্রায় তিন হাজারটি।

রামগতি উপজেলার টাংকি বাজারের কারিগর আবুল হোসেন (৪৫) বলেন, ‘অভিজ্ঞতা দিয়ে কাজ করি ঠিকই, কিন্তু আধুনিক মেশিনের কাজ শিখতে পারলে আরো ভালো ট্রলার বানাতে পারতাম। সরকারি সাহায্য পেলে আমাদের জীবনটা একটু গুছিয়ে নিতে পারতাম। নিরাপত্তার অভাব সব সময়ই ভোগায়।’

একই উপজেলার আসলপাড়ার ট্রলার মেকানিক আবুল খায়ের জানান, একসময় 

থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে ট্রলার আমদানি করা হতো। এখন স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়ায় অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, একটি সমুদ্রগামী ট্রলার তৈরিতে প্রায় পাঁচ মাস সময় লাগে এবং এতে এক হাজার ২০০ ঘনফুট পর্যন্ত কাঠ লাগে। একজন দক্ষ ট্রলার নির্মাণকর্মী প্রতিদিন এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা ও সহকারী কর্মীরা প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করেন।

রামগতি উপজেলার চররমিজ এলাকার হোসেন মিস্ত্রির সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ট্রলার ও নৌকা তৈরির মৌসুম। শুকনো মৌসুম ছাড়া নৌকা তৈরি করা যায় না।

ফিশিং ট্রলার তৈরির কয়েকজন কারিগর জানায়, সমুদ্রে চলাচলকারী একটি ফিশিং ট্রলার তৈরিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে কমপক্ষে ১০ জন কারিগর লাগে। আর তাদের সঙ্গে ৬০০ থেকে ৭০০ শ্রমিক কাজ করে। একজন কারিগরের সঙ্গে চার-পাঁচজন শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করেন। কারিগররা চুক্তিভিত্তিক কাজ নেন। পরে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে তারা ট্রলার তৈরি করেন। একটি বড় ফিশিং ট্রলার তৈরিতে আকারভেদে কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়।

কারিগররা জানায়, নৌকা ও ট্রলার বানানোর কাজ প্রথমে শুরু করেন কাঠমিস্ত্রি। কাঠ মিস্ত্রি গলুই, চান্দিনা, ছই, রান্নাঘর, ওয়াশরুম তৈরি করেন। কাঠের জোড়ার ফাঁকে সুতার সলতে ঢুকানো বা ‘গাইনির কাজ’ করেন আরেক দল। গাইনির কাজের পর কেরোসিন তেলের সঙ্গে ধূপ ও পানি মিশিয়ে শুরু হয় পুটিংয়ের কাজ। পরে ট্রলারের নিচের অংশে আলকাতরা লাগাতে হয়। এরপর ইঞ্জিনের সঙ্গে লাগানো হয় পেছনের পাখা। সবশেষে করা হয় রঙের কাজ। এসব ট্রলার তৈরিতে আমদানি করা বিদেশি লোহা কাঠ, ওক এবং চাপালিশ কাঠ ব্যবহৃত হয়।

রায়পুর উপজেলার হাজীমারা এলাকার জসিম মাঝি নামের মিস্ত্রি জানান, ছোট নৌকা তৈরিতে দেশীয় মেহগনি, চাপালিশ, রেইনট্রি কড়ই, নলকড়ই, পুনাল, নাড়াই, গর্জন, চাম্বল, ত্রিশূল শিশুগাছ ব্যবহৃত হয়। ছোট কিংবা মাঝারি নৌকা তৈরিতে সময় লাগে এক থেকে দুই মাস। এতে প্রায় তিনশ শ্রমিক লাগে। আর জাল, ইঞ্চিনসহ খরচ পড়ে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা।

ট্রলার মিস্ত্রি ও নৌকার কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরে তিন শতাধিক মাছ ধরার নৌকা ও সমুদ্রে চলাচলকারী শতাধিক ফিশিং ট্রলার লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়।

মতিরহাট মাছ ঘাটের মাছ ধরার নৌকার মালিক এমরান জানান, দেশীয় কাঠের তৈরি ট্রলার ৮ থেকে ১০ বছর টিকে। আর আমদানীকৃত কাঠের তৈরি ট্রলার প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর অনায়াসে ব্যবহার করা যায়।

ট্রলার তৈরির কারিগর বেলায়েত মাঝি জানান, ৩০ বছর ধরে এ পেশায় কাজ করছেন তিনি। আগে ভোলায় কাজ করলেও এখন লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে ট্রলারের কারিগর হিসেবে প্রতিদিন এক হাজার ২০০ টাকা মজুরি পেয়ে থাকেন।

ট্রলার শ্রমিক ও জেলেরা জানালেন, সমুদ্রের ট্রলারগুলো দ্রুত গতিসম্পন্ন হয়। উত্তাল সমুদ্রের মাঝে ঘণ্টায় ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার এবং অনুকূলে ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে এটি। চায়নাসহ বিদেশি আমদানি করা কোম্পানির নতুন ও রিকন্ডিশন ১৪০ থেকে ২৯০ হর্স পাওয়ারের শক্তিশালী ইঞ্জিন ট্রলার ও নৌকাতে বসানো হয় বলে জানালেন তারা। লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন জানান, জেলায় বর্তমানে মেঘনা নদীতে চলাচলের জন্য প্রায় তিন হাজার অনুমোদিত ফিশিং ট্রলার রয়েছে। তবে জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বা বেসরকারি অনুমোদিত ডকইয়ার্ড গড়ে ওঠেনি। মূলত স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আগ্রহেই এই কর্মযজ্ঞ চলছে।

এদিকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কারিগরদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনলে সম্ভাবনাময় এ শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ফেয়ার দিয়া ১১/৮/ই, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট (লেভেল-৮), বক্স কালভার্ট রোড, পান্থপথ, ঢাকা ১২০৫