মাটিয়ান হাওরে ধান চাষ এবং মাছ ধরাই গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও হাওরাঞ্চলীয় সংস্কৃতির জন্য সুপরিচিত বড়দল গ্রাম। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব দিকের জেলা সুনামগঞ্জ। জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে ৫টি উপজেলা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা। তার মধ্যে তাহিরপুর উপজেলা একটি। এই উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়ন একটি। আর এই ইউনিয়নের ৬ ও ৭ নং ওয়ার্ডের কয়েকটি মহল্লা বা হাটি নিয়ে বড়দল গ্রামটি গঠিত। এটি জেলার সবচেয়ে বড় গ্রাম। এখানে শতভাগ মুসলিম পরিবার বসবাস করে। তবে গ্রামটির নামকরণ ও কারা প্রথমে বসতি স্থাপন করেছে, তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
বড়দল গ্রামটি পশ্চিমে বিশাল মাটিয়ান হাওর, পূর্বে বলদার হাওর, দক্ষিণে তারাজান বিল ও উত্তরে কাউকান্দি গ্রাম ও ভারতের মেঘালয় পাহাড়। হাওর বিলের ওপারে রয়েছে গ্রাম। বড়দল (দক্ষিণ) ইউনিয়নটি তাহিরপুর উপজেলার অন্তর্গত একটি এলাকা, যা হাওরবেষ্টিত।
এই গ্রামের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মূলত হাওরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে আছে বংশপরম্পরায়। তবে উপজেলার সঙ্গে বর্ষায় নাও (নৌকা) এবং হেমন্তে পা-এর (পা বা পায়ে হাঁটা) বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। পানি বেষ্টনীতে থাকায় পানির দেশে হাওরপারের শিশুদের স্বপ্ন ভাসিয়ে দেওয়ার গ্রাম হিসেবে এখন পরিচিতি পেয়েছে। এই হাওর শুধু জীবিকার উৎসই নয়, এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। বর্ষাকালে এর অথৈ জলরাশি এবং শুকনা মৌসুমে ফসলের মাঠ এক অপরূপ দৃশ্য তৈরি করে, যা যে কারো মনে জায়গা করে নিতে পারে।
দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন না-হওয়া, সামাজিক অসচেতনতা, জলাবদ্ধতা ও যাতায়াত সংকটসহ নানা কারণে বর্ষা ছয় মাস শুরু হলেই শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশে, আর শুষ্ক মৌসুমে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে। যোগাযোগব্যবস্থার এই মৌসুমি প্রতিবন্ধকতা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
গ্রামের বেশির ভাগ শ্রমজীবী মানুষ থাকায় শিক্ষাক্ষেত্রে খুব বেশি এগোতে পারছে না। তবে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা এগিয়ে এসেছে। পর্যাপ্ত স্কুল-কলেজ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সরকারের সুদৃষ্টি না থাকায় পিছিয়ে আছে ৯ হাজারের বেশি জনসংখ্যার উপজেলার সবচেয়ে বড় এই গ্রামের মানুষ। এর মধ্যে ভোটার রয়েছে চার হাজার।
এখানে হাওরের সান্নিধ্য ও ফসল চাষাবাদ করেই গড়ে উঠেছে গ্রামটি। সম্পূর্ণভাবে হাওর-বাঁওড় ও ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প আর কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় বর্ষায় নৌকা এবং শুকনা মৌসুমে হাঁটাই যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। ফলে দুর্ভোগের শেষ নেই।
ঐতিহ্যবাহী পেশা হিসেবে কৃষি ও মৎস্য আহরণই এখানকার প্রধান পেশা। শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান চাষের সময় হাওরে চারা রোপণ করা থেকে পাকা ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর সময় পুরো গ্রামের চিত্র উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বর্ষায় এখানকার মানুষেরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। তবে বসে না থেকে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্যে মাছ আহরণ করতে বিশাল হাওরে নেমে পড়ে। আর জীবন-জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন হয় তখন মাছ ধরা। মাছ ধরে স্থানীয় বাজার ও গ্রামে বিক্রি করেন জেলেরা।
বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়নের মধ্যে কাউকান্দি বাজার এখানকার স্থানীয় বাণিজ্য ও সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সেখানে ভালো মানের পণ্যসামগ্রীর কোনো দোকান নেই। তবে বিশেষ প্রয়োজনে এই গ্রামের মানুষ উপজেলা সদর অথবা বাদাঘাট বাজারে যায় চাহিদামতো পণ্য ক্রয় করতে। শুকনা মৌসুমে আশপাশের গ্রামের উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিপণ্য এই বাজারে নিয়ে আসে বিক্রি করার জন্য। আর এই বাজার থেকে চাহিদামতো পণ্য ক্রয় করে নেন গ্রামের বাসিন্দারা। তবে গ্রামের ভেতর কিছু বাসিন্দা নিজেদের বসতবাড়িতে দোকান তৈরি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাবেচা করে। এতে গ্রামের বাসিন্দাদের তাৎক্ষণিক চাহিদা মিটে যায়।
বিনোদনের কোনো সুযোগ-সুবিধা না থাকায় বেশির ভাগ সময় যুবকরা মোবাইল, ক্যারমবোর্ড আর হাওরপারে বসে আড্ডা; না হয় গ্রামের ভেতরে থাকা দোকানে চা খেয়ে আড্ডা, আর টেলিভিশনে ছবি-নাটক দেখে সময় পার করে। এ ছাড়া গ্রামে প্রতি বছর বর্ষার সময় ভাদ্র মাসে গানের আসর বসে, যা শা নুরের গান নামে পরিচিত। যে গান দেহত্ব ও আধ্যাত্মিক গানের মাধ্যমে সমাজের নানান দিক তুলে ধরে সচেতনতা সৃষ্টি করা হয়।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছে অবস্থিত হওয়ায় এই গ্রামের বাসিন্দারা আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলেমিশে বাস করে, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এই গ্রামে বিশিষ্টজনের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দ্বিতীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও অ্যাডভোকেট আব্দুল গাফফার। এ ছাড়া ডা. হারিস উদ্দিন, তার ছেলে ও ছেলের বউ ডাক্তার। তা ছাড়া নানা কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও সরকারি চাকরিজীবী রয়েছে বিভিন্ন সেক্টরে। যারা এই গ্রামের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। এর সঙ্গে রয়েছে প্রবাসী। যারা জীবন-জীবিকার তাগিদে নিজ দেশ ছেড়ে বিভিন্ন দেশে প্রবাসে অবস্থান করেছেন, তারা এলাকা ও দেশের উন্নয়নে কাজ করছেন।
একনজরে বড়দল গ্রাম
জেলা : সুনামগঞ্জ
উপজেলা : তাহিরপুর
ওয়ার্ড : ৬ ও ৭ নং
জনসংখ্যা : ৯ হাজার+
ভোটার : ৪ হাজার
পেশা : কৃষক ও জেলে
হাট : কাউকান্দি (ছোট বাজার)
মানুষের কথা
জুয়েল মিয়া
মেম্বার, দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন পরিষদ
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ ও নজরদারি রাখা হচ্ছে যেন গ্রামে বাল্যবিবাহ না হয়। আর প্রতিটি পরিবার এই বিষয়ে সচেতন রয়েছে। আর সচেতন করতে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে নজরদারিও করা হয় এবং মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে গ্রামে প্রতিটি যুবকসহ সচেতন মহল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে। মাদক থেকে রক্ষা করতে উঠতি বয়সী যুবকদের নিয়ে খেলাধুলার আয়োজন করা হয় এবং প্রতিটি পরিবার থেকে নিজ নিজ সন্তানদের প্রতি নজরদারি রাখা হয়। কারণ আমাদের গ্রাম ভারত সীমান্তঘেঁষে এই কারণে কোনো না কোনোভাবে মাদক চলে আসে আর সে কারণে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযান চালায় তা আরো বাড়ানো উচিত মাদক নির্মূলে। আর পাশাপাশি পরিবারের অভিভাবকরা যদি লেখাপড়া ও খেলাধুলার প্রতি নিজ নিজ সন্তানদের আগ্রহী করে তুলে নজরদারি করে তাহলে মাদক নির্মূল সম্ভব হবে। হাওরপারের এই গ্রামে সরকারিভাবে সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় না থাকায় যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত হচ্ছে অসহায় গরিব পরিবারের সদস্যসহ সব স্তরের মানুষজন।
তাহমিদ হাসান
সহকারী শিক্ষক, বড়দল নতুন হাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
২০২৩ থেকে ২৬ সালে এসে শিক্ষাক্ষেত্রে প্যাটানগত পরিবর্তন এসেছে। তবে আগের চেয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে। দরিদ্রতার কারণে অনেক শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক অভিভাবক জীবিকার তাগিদে স্থানান্তরিত হচ্ছেন।
স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার উন্নয়নে বর্তমানে আমরা প্রতি মাসে প্রতি ক্লাসে একটি করে মূল্যায়ন পরীক্ষা নিচ্ছি, বার্ষিক সমষ্টি মূল্যায়ন হচ্ছে। এর পরও শিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে পারছি না। এর প্রধান কারণ অভিভাবকদের অসচেতনা, যার জন্য আমরা প্রতি মাসে মা সমাবেশ করছি। বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন, অভিভাবক সমাবেশ করা হয় যেন অভিভাবকরা সচেতন হন, নিজ নিজ সন্তানদের সুনাগরিক করে গড়ে তুলতে।
শুধু পুথিগত বিদ্যা কোনো সমাজ বা দেশকে উন্নতির শিখরে নিতে পারে না। কারিগরি শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আছে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সহযোগী বই সংগ্রহ করা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের অনেকটাই সহায়ক হবে। অনেক কিছু জানতে পারবে, যা পাঠ্যবই পড়ে বুঝতে ও জানতে পারে না।
মো. সাহাবুল মিয়া
কৃষক ও সচেতন অভিভাবক
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে আমাদের হাওরপারের সন্তানরা সুফল ভোগ করতে পারছে না। ফোনে আসক্তিতে রাত ১২-১টা পর্যন্ত মোবাইল গেইম, ছবি দেখাসহ নানাভাবে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। পড়াশোনা করছে কম। আমরা তো সারা দিন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ি, খোঁজখবর রাখতে পারি না। যদি এলাকায় বিনোদন কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় এবং সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো যায়, তাহলে হয়তো উঠতি বয়সী যুবকদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।
ফয়জুন নূর
কৃষক
৩০ বছর ধরে কৃষি পেশার সঙ্গে জড়িত আছি। বছরে একটি ফসল বোরোর ওপরই নির্ভর করতে হয়, আর কোনো ফসল উৎপাদন করা হয় না। কোনো সুযোগও নেই বিকল্প কর্মসংস্থানের উপায় না থাকায়। এই ফসল চাষাবাদ করতে গিয়ে অনেকে ঋণ করে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। তার মধ্যে অনেকে সরকারিভাবে ভর্তুকিতে দেওয়া মেশিন ক্রয়ে তিন-চার হাজার টাকা নিয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।
সজিব আহমেদ
কলেজ শিক্ষার্থী
আমাদের শিশুরা শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। সড়ক যোগাযোগ না থাকায় সময়মতো স্কুল-কলেজেও যেতে পারি না। গ্রামের পরিবেশ পড়াশোনার জন্য খুব বেশি ভালো না। আমাদের গ্রামে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা নেই, অতিরিক্ত শিক্ষা নিতে হয় প্রাইভেট পড়াশোনা করে। আমি ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষক হতে চাই। যেন আমার গ্রামের অসহায় গরিব পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে পারি।
