জিডিপির চমক নয়, বাজেটের আসল মাপকাঠি হোক কর্মসংস্থান
ড. মো. দীন ইসলাম
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ১৫:২০
অধ্যাপক ড. মো. দীন ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। বাজেট ২০২৬-২৭ এর নানা বিষয় নিয়ে তিনি সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে কথা বলেছেন। তার সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, করকাঠামো, কালো টাকা সাদা করার বিধান এবং মেগাপ্রকল্পসহ সামষ্টিক অর্থনীতির নানা জটিল ও প্রাসঙ্গিক দিক। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সম্পাদকীয় সহযোগী সৈয়দ রাইয়ান আমীর
শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে বাজেট মূল্যায়নের বদলে বৈষম্য নিরসনের জন্য আমাদের কি নতুন কোনো মানদণ্ড ভাবা উচিত?
অবশ্যই। শুধু জিডিপির হার দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিমাপ এখন ততটা প্রাসঙ্গিক নয়। এটি মানুষের জীবনমানের প্রকৃত অবস্থা বোঝার ভালো নির্দেশক নয়। উন্নত বিশ্বে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে তেমন চর্চা হয় না, কারণ এর হিসাব যাচাই করা কঠিন। এ কারণে উন্নত বিশ্বে অর্থনৈতিক সাফল্যের বড় নির্দেশক হিসেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে ধরা হয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে দেখা হয় বেকারত্বের হার কতটা কমল। বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক হওয়ায় কত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, তার নিখুঁত হিসাব বের করা দুষ্কর। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের জিডিপির ওপর নির্ভর করতে হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টির হিসাব নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা গেলে সেটি অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি বোঝা ও বৈষম্য নিরসনে অত্যন্ত কার্যকর একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হতো।
বাজেটে পরোক্ষ করের ওপর অতি নির্ভরতা নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
পরোক্ষ কর ধনী-গরিব সবার ওপর সমানভাবে বর্তায়। পণ্যের দামের ওপর নির্দিষ্ট হারে এ কর দিতে হয়। রাজস্ব বাড়াতে সরকার এমন পণ্যের ওপর কর আরোপ করে, যেগুলোর চাহিদা অস্থিতিস্থাপক। অর্থাৎ দাম বাড়লেও মানুষের কেনা ছাড়া উপায় থাকে না। মুশকিল হলো, আমাদের প্রয়োজনীয় মৌলিক পণ্যগুলোর চাহিদাই অস্থিতিস্থাপক। নিম্ন আয়ের মানুষ উপার্জনের বড় অংশ এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগে ব্যয় করে। ফলে আয়ের বড় অংশ পরোক্ষ কর হিসেবে চলে যায়। এটি রিগ্রেসিভ কর, যা আয়বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে মৌলিক খাদ্যে খুব বেশি কর না থাকলেও গরিবের ব্যবহার্য অনেক ভোগ্যপণ্যের ওপর কর আছে। বৈষম্য কমাতে করকাঠামো সাজাতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের পণ্যে কর না বাড়িয়ে বিলাসবহুল পণ্যে উচ্চহারে কর আরোপ করা উচিত। করের চূড়ান্ত বোঝা কার ওপর পড়ছে, তা নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে সময়োপযোগী নীতি প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া কি সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
বৈধ আয়ের ট্যাক্স না দিলে সেটি কালো টাকা হয়, আর দুর্নীতির আয় সম্পূর্ণ অবৈধ। অবৈধ আয় সাদা করার সুযোগ কোনোভাবেই দেওয়া উচিত নয়। গত এক দশকে জিডিপি যে হারে বেড়েছে, আয়কর সেভাবে বাড়েনি। ২০১০-১১ অর্থবছরে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ১১-১২ শতাংশ থাকলেও এখন তা ৮ শতাংশের নিচে। এর বড় কারণ কর ফাঁকি। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বারবার দেওয়া হলে সৎ করদাতাদের প্রতি অবিচার করা হয়। বড় করদাতারা মনে করেন, কর না দিয়ে জমানোই লাভজনক; পরে অল্প জরিমানা দিয়ে সাদা করা যাবে। এটি কাঠামোগত দুর্বলতা। এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন। শুধু এনবিআরের পুলিশিং দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। দীর্ঘ মেয়াদে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ সুযোগ চিরতরে বন্ধ করা দরকার। কর ফাঁকিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় এনে কঠোর অডিট নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে এই দুষ্টচক্র ও কর ফাঁকির নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে আমাদের অর্থনীতিকে বের করে আনা কঠিন হবে।
বাজেটের বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের চেয়ে বড় শিল্প খাতগুলোকেই কি তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা দিচ্ছে?
দেশে মূলত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি খাতে বড় ভর্তুকি দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য পণ্যের দাম সহনশীল রাখা। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এই ভর্তুকির বড় সুবিধাভোগী। শিল্প খাত এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে গুণগত কর্মসংস্থান তৈরি করে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী হিসেবে গড়ে উঠলে তা অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা তাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। অন্যদিকে কৃষিতে ভর্তুকি অপরিহার্য। এটি না থাকলে উৎপাদন খরচ ও খাদ্যের দাম বাড়বে, অনেকে পেশা ছাড়বেন। এতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে ভর্তুকি বৈষম্য কমায়। তবে জ্বালানির মতো খাতে ঢালাও ভর্তুকি যৌক্তিক নয়। কৃষকের ট্রাক্টরের জন্য ভর্তুকি প্রয়োজন, কিন্তু শহরের বিলাসবহুল গাড়ির জন্য এর যুক্তি নেই। তাই ভর্তুকি লক্ষ্যভিত্তিক হতে হবে। আধুনিক যুগে স্মার্ট কার্ড বা কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত প্রাপকদের হাতে সরাসরি ভর্তুকি পৌঁছে দিলে অর্থের অপচয় অনেকটাই কমবে এবং প্রান্তিক মানুষগুলো সরাসরি উপকৃত হবে।
আমাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক; এই খাতকে পুরোপুরি মূলধারায় না এনে বাজেটের লক্ষ্য অর্জন কতটা সম্ভব?
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক। এই বিশাল অংশকে প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিংয়ের আওতায় না আনলে কর-জিডিপি অনুপাত কখনোই বাড়বে না। সরকারের সক্ষমতা শক্তিশালী হবে না এবং শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষাও কঠিন হবে। অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি কাজ করে যে, টিন নিলে প্রতি বছর ট্যাক্সের ঝামেলায় পড়তে হবে। এই ভীতি দূর করতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বোঝাতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে এলে তারাই লাভবান হবেন। তারা সহজে ঋণ পাবেন ও দুর্যোগে সরকারি প্রণোদনা পাবেন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সহজ ও এককালীন ন্যূনতম করের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অর্থনীতির বিশাল অংশ কাঠামোর বাইরে থাকলে কোনো নীতি ঠিকমতো কাজ করে না। মুদ্রানীতি বা রাজস্ব নীতির প্রকৃত সুফল পেতে এই বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে পর্যায়ক্রমে মূলধারায় নিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাব বা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির হিসাবগুলো আমাদের বাজেটে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিফলিত হচ্ছে?
পরিবেশগত প্রভাব মোকাবিলায় বাজেটে কিছু বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপ দেখা যায়, যেমনÑসৌরবিদ্যুতের বরাদ্দ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা দেখা যায় না। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে কৃষি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে। তাই বাজেটে আর্থিক বাফার রাখা উচিত, যাতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে অর্থনীতি দ্রুত সামলে ওঠে। পাশাপাশি ব্লু-ইকোনমি ও গ্রিন-ইকোনমি আমাদের বড় সম্ভাবনার জায়গা। উন্নত বিশ্বে সমুদ্রনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতি না করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এর ভূমিকা অপরিসীম। এ খাতগুলোকে উৎসাহিত করতে বাজেটে প্রণোদনা ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ থাকতে হবে। পরিবেশবান্ধব এসব উদ্যোগ দেশে ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আমাদের অর্থনীতির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে।
মেগাপ্রকল্পের জন্য নেওয়া বিপুল ঋণ কি দীর্ঘ মেয়াদে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর কোনো অনাকাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে?
মেগাপ্রকল্প নিজে থেকে খারাপ কিছু নয়। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বিশাল অর্থায়ন সম্ভব হয় না বলেই ঋণ নিতে হয়। প্রকল্প নেওয়ার আগের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঋণের সুদের চেয়ে প্রকল্পের রিটার্ন অনেক বেশি। এসব প্রকল্প অর্থনীতিতে পরোক্ষ গতিশীলতা তৈরি করে। সমস্যা তৈরি হয় বাস্তবায়নের পর্যায়ে। যে প্রকল্পের বাজেট ১ টাকা, শেষ করতে ১০ টাকা লাগে। সময়ও বেশি লাগে। তখন লাভের হিসাব মেলে না। অতিরিক্ত খরচের কারণে আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব, দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার ফল। প্রকল্প মূল্যায়নে তৃতীয় পক্ষের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করতে হবে। প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে, সাশ্রয়ী খরচে বাস্তবায়িত হলে তা উৎপাদনশীলতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াবে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশীর্বাদ হবে। কিন্তু স্বচ্ছতার অভাব থাকলে ঋণ বড় অর্থনৈতিক চাপে পরিণত হবে।
