Logo
×

Follow Us

অন্যান্য

টেসলা মেইন রাস্তায়, বন্ধ করে কার লাভ

Icon

আফসান চৌধুরী

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১৭:৫০

টেসলা মেইন রাস্তায়, বন্ধ করে কার লাভ

ভদ্রলোক বাংলাদেশিদের কোন জিনিসটা দেখলে আজকাল মেজাজ খারাপ হয় সবচেয়ে বেশি? আশ্চর্য হবেন নাউত্তরটা হলো টেসলা বা ব্যাটারিচালিত রিকশা। যদিও এটা অনেক দিন ধরে আছে, তবে আগে প্যাডেল রিকশার তুলনায় কম ছিল, কিন্তু জুলাই ২৪-এর পর সংখ্যায় অনেক বেড়ে গেছে। এখন চারদিকে অজস্র টেসলা।  শুধু ঢাকা না, বাংলাদেশজুড়ে এই অবস্থা।

কিন্তু এই যে সরকার ঢাকার মেইন রাস্তায় টেসলা নিষেধ করে দিচ্ছে, তাতে কার লাভ কার ক্ষতি? তথ্য অনুসন্ধান, আলাপ-আলোচনা শেষে দেখলাম, যা বাইরে থেকে মনে হয় এক বেয়াদপ কিসিমের যানবাহনের চেহারা; তার এক বহুমাত্রিক চিত্র আছে, যা নাগরিক দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে বা অন্যতম সফল সেক্টর। চেষ্টা করে ঢাকায় কিছুটা দমন করা হয়তো যাবে, কিন্তু এর দাপট দেশব্যাপী। যদিও সুশীল ফেসবুক শ্রেণি একে ভীষণ অপছন্দ করে। তবে ভাই, একটু স্মরণ রাখলে হয় না যে ফুটপাত পরিষ্কারের নামে হকার তাড়িয়ে যা হলোহকার কিছুটা কমেছে হয়তো, অনেকে উঠে গিয়ে পিঁয়াজু আর মোজা বিক্রি না করে ইয়াবা-আইস বিক্রি করে। লাভ বেশি, ঝামেলা কম, ভাগ দিলেই হলো ঠিক  জায়গায়।


দুই 

ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ করেছে সরকার সড়ক নিরাপদ করতে। জন্ম থেকে নানা আদেশ দিয়েছে তারা, কিন্তু খুব একটা লাভ হয়েছে তার প্রমাণ নেই। যানজট আগেও ছিল এখনো আছে, বাড়ে প্রতি বছর। এআই দিয়ে সব ঠিক হবে শুনেছিলাম, কিন্তু তার বেশি আওয়াজ শোনা যায় না আজকাল, রাস্তার একই হাল। সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য যানজট ও দুর্ঘটনা কমানো। কিন্তু টেসলার আগে কি দুর্ঘটনা হতো না? তখন কী কারণে এসব হতো একটু বলুন? এত সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছে, কিন্তু তাতে কোনটায় লাভ হয়েছে শেষ পর্যন্ত? 

তবে টেসলা নিষিদ্ধকরণ আর একটু জটিল বিষয়। ঢাকার লাখ লাখ গাড়িহীন মানুষ নিত্যদিনের যাতায়াতের জন্য এর ওপর নির্ভর করে। অনেকের কাজের স্থল বড় রাস্তার বাইরে, তারা বাহনটি ব্যবহার করে। সেখানে পৌঁছাতে টেসলা লাগে, চলে দ্রুত। সস্তাও। অন্যটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও বলছি। সীমিত আয়ের যাত্রীদের ওপর এটা ব্যাপক প্রভাব ফেলবে সত্য, কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষকে বিরাট বিপদে ফেলবে। টেসলাকে ঘিরে লাখ লাখ চালক ও মেকানিকের জন্য প্রচণ্ড আর্থ-সামাজিক সংকট তৈরি হবে, সেটা কে সামাল দেবে তা জানা নাই। নাগরিক জীবিকার ওপর বড় ধাক্কা অবধারিত। গত কয়েক বছরে এত বড় ধাক্কা আসেনি।


তিন 

টেসলা বন্ধ হলে দুর্ঘটনা কমবে তার কি কোনো তথ্যভিত্তিক যুক্তি আছে? গবেষণা তথ্য বলেছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে মোটর বাইক থেকে। কিন্তু তাদের গায়ে হাত দেওয়ার সাহস বা ইচ্ছা হবে কি? আলাপে উঠে আসে যে খুচরা রাজনৈতিক কর্মীরা এটা চালায়। তাহলে এদের সামলাতে গেলে রাজনৈতিক দলের মনোবলের ওপর ধাক্কা লাগতে পারে। তা ছাড়া মিডল ক্লাস তো আছে, যারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয় সবচেয়ে বেশি।  নিচে দুর্ঘটনার হিসাবটা দেখুন।

মোটর বাইক ৩৬ থেকে ৪১ শতাংশ, বাস-মিনিবাস ১৫ থেকে ২০ শতাংশ, সিএনজি, টেসলা বা তিন চাকা ৫ থেকে ১০ শতাংশ, গাড়ি-মাইক্রোবাস ৭ থেকে ১০ শতাংশ। সূত্র :   (Road Safety Foundation 2024–2025 Annual Reports. 2.  Accident Research Institute (ARI) at BUET.)

তাহলে টেসলা কেন বেছে নেওয়া হলো বন্ধ করার জন্য, তথ্যনির্ভর না হলেও? এর কারণ যে শ্রেণি বাইকে চড়ে বা চালায় তাদের রাজনৈতিক মূল্য আছে, শ্রেণিমূল্য বলা যাক। কিন্তু নিম্নবিত্ত মানুষের হয়ে বলার কেউ নেই। ফলে সেদিক থেকে নগর সুন্দর করার প্রকল্পে টেসলা প্রতীকী ভূমিকা পালন করলেও তার দাম বেশি। তা ছাড়া প্রতিবাদকারীরা যেহেতু ছোটখাটো, তাদের পুলিশের লাঠি দিয়ে ঠিক করা যাবে। বাইক ওয়ালাদের পক্ষে বড় ভাইরা আছে, টেসলাচালকদের পক্ষে কেউ নেই।


চার

এই নিষিদ্ধকরণের আর্থ-সামাজিক দাম সামাল দেওয়ার দক্ষতা আছে সরকার বা কর্তৃপক্ষের? কয় লাখ পরিবার এর ওপর নির্ভরশীল তার হিসাব নেই, কিন্তু সেটা লাখ লাখ। এই নিষেধাজ্ঞা কেবল চালকদেরই নয়মেকানিক, ব্যাটারি সরবরাহকারী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদেরও বিরাট হুমকির মুখে ফেলবে।

কর্তৃপক্ষ বলছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এলাকাভিত্তিক অভিযান চালাবে। রিকশাগুলো কেবল নির্ধারিত সড়ক, গলিপথগুলোতে চলাচলের জন্য সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু  প্রধান সড়কগুলোতে কঠোর অভিযান চলবে। এ ছাড়া বুয়েটের সঙ্গে যৌথভাবে ডিজাইন করা হচ্ছে, যা আরো নিরাপদ, মানসম্মত ই-রিকশার মডেল। কিন্তু এদের কোনো প্রচেষ্টা সফল হয়েছে?

অবৈধ চার্জিং গ্যারেজগুলো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ৫০ থেকে ৯০ লাখ মানুষের সামগ্রিক জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশা খাতের সঙ্গে জড়িত। এত বড় একটা জনগোষ্ঠীর রুজি ক্ষতি করার যুক্তি কী? দুর্ঘটনা ঘটে বাইক থেকে, কিন্তু দাম দিচ্ছে টেসলা। এক অদ্ভুত সামাজিক বিরোধিতা কাজ করছে গাড়ি শ্রেণি ও বাইক শ্রেণির মাঝে। প্যাডেল রিকশা ঠিক আছে, কারণ ওটা নিম্নগ্রস্ত। কিন্তু টেসলা পাল্লা দেয়। অনেকের কেনএটা প্রায় কারোই সহ্য হয় না, যদিও নিজেরাও টেসলায় চড়ে।


পাঁচ

এই নিষেধাজ্ঞার ফলে কত রিকশা ও মানুষের রুজি আঘাতপ্রাপ্ত হবে? আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা প্রভাবিত করবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা সক্রিয়ভাবে চলছে। যেহেতু অনেক যানবাহন শেয়ারে বা দৈনিক ভাড়ায় একাধিক শিফটে চালানো হয়, তাই এই তিন চাকার যানগুলোর চলাচল সরাসরি ২৫ থেকে ৩০ লাখ চালকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, যাদের অনেকেই গ্রামীণ জেলা থেকে আসা নিম্ন আয়ের মানুষ। পাশাপাশি আছে পরোক্ষ জীবিকা। 

এই যানবাহনগুলোর দৈনিক অর্থনৈতিক চক্রের ওপর আরো ৫০ থেকে ৬০ লাখ নির্ভরশীল ব্যক্তি ও সহযোগী শ্রমিক নির্ভর করে। এরা হলেন গ্যারেজ মালিক ও সেখানে কাজ করা হাজার হাজার শ্রমিক। সঙ্গে আছে মেরামতের ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা দোকান, স্থানীয়ভাবে বানানো পার্টসের কারখানা। ব্যাটারি সরবরাহকারী, টেকনিশিয়ান ও বৈদ্যুতিক চার্জিং পয়েন্টগুলোযেটা হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসা মালিককে টিকিয়ে রাখে তারাও। এদের কী গতি হবে তা সরকারি নির্দেশনায় বলা নেই।

প্যাডেল রিকশায় আয় দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আর টেসলার আয় ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা। মানে বিত্তহীন শ্রেণির সবচেয়ে বড় নাগরিক কার্যক্রম। অবস্থা ফেরার শ্রেষ্ঠ পথ ছিল, কিন্তু যেটা সরকার চালু করেনি।


ছয়                   

এমন না যে সরকার বোঝে না কত বড় বিপদ দরিদ্র মানুষের ওপর আসছে, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া শ্রেণিকে খুশি করা এখন সবার উদ্দেশ্য।  তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লাইসেন্স দেওয়ার কসরত করছে এবং কিছু এনজিও চালকদের পর্যায়ক্রমিক প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স প্রদান ও যানবাহন মানসম্মত করার প্রকল্পে কাজ করছে, যাতে এগুলো একবারে বন্ধ না করে নিয়মের মধ্যে আনা যায়।

এতে কতটুকু লাভ হতে পারে সবার জানা। জন্ম থেকে দেখছি ঢাকার যানজট বাড়ছেই, কত চেষ্টা করে সরকার, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। মনে হয় সরকারগুলো অদক্ষ হওয়ার অধিকার আছে। তবে ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষের রুজি খেয়ে ফেলে সরকার কী ধরনের বার্তা দিল সমাজকে?

হাজার হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে বড়লোকদের মিল ফ্যাক্টরি চালু করতে, আর একই সঙ্গে বিত্তহীন মানুষের রুজি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এটা যদি দ্বৈতনীতি মনে হয় তাহলে তার জবাব সরকারকেই দিতে হবেচলেছে, চলবে, চলুক।

লেখক : সাহিত্যিক, গবেষক

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ফেয়ার দিয়া ১১/৮/ই, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট (লেভেল-৮), বক্স কালভার্ট রোড, পান্থপথ, ঢাকা ১২০৫