মনে করো আমি নেই
নান্দীপাঠ ছাড়া তো আর এ লেখার শুরু হতে পারে না। রেডিওতে হিন্দি সিনেমার গান মানে আব্বা। রেডিও সিলোন, বিনাকা গীতমালায় আমিন সায়ানির "ব্যাহনো অওর ভাইয়ো" আহ্বান, আর অল ইন্ডিয়া রেডিওর 'বিবিধ ভারতী'। সকালবেলা আমাদের বাড়িতে অবশ্যই বাজতেন- শামসাদ বেগম, কে এল সায়গল, গীতা দত্ত, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোসলে। নৌশাদ-রোশন-খৈয়াম বা এসডি বর্মনের নাম নিতে গিয়ে আব্বার চোখ আবেশে বুঁজে আসতো, চিকচিকে হাসিমুখে বলতো- "এইসব হইলো 'সদাবাহার' গীত!" তা চিরবসন্তের সেসব গান আব্বা শুনছে আর চকচকে হাত আয়নায় শেভ করছে, পাশ দিয়ে গেলেই গালে ঝাঁ করে ফেনা লাগিয়ে দেবে! বুঝতেই পারছি না এই "আপলাম চাপলাম" গানের চেঁচামেচিতে বসন্ত আসবে কী করে! আজো চোখে ভাসে সেই দৃশ্য। ঠাট্টাও করতো আব্বা, গানের ইস্কুল থেকে প্রথম ফিরে আসবার পর লতা মঙ্গেশকরের গান চালিয়ে দিয়ে বলেছিল- "তালে ভুল ধর তো বেটা!" (ছয় বছরের ছাত্রীর হনু-রে মনোভাব সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়ে জানাচ্ছি, অবিলম্বে ভুল ধরেছিলাম।) একবার মুচকি হেসে বল্লো- "যার গলা শুনতাছোস, সে কিন্তু লতা না। লতার চাইতে আমার প্রিয়। সুমন কল্যাণপুর। ঢাকার মাইয়া।"
-নামে কল্যাণপুর এইজন্য?
আব্বা ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বলতো- "হইতেই তো পারে, কল্যাণপুরে কত বড় গায়িকা জন্মাইছে ভাব একবার!" সেই থেকে ভাবতাম সুমন কল্যাণপুরের জন্ম আমাদের কল্যাণপুরে। এইসব ক্ষুদ্রান্ত্রসদৃশ কানা গলিতে তিনি ঘুরপাক খেতেন, এই কাঁচাবাজারে নিশ্চয় আনারসের দর জিজ্ঞেস করতেন, এই খালের ওপর অববাহিকাতূল্য বিশাল আকাশ ভরা বাঁশপচা ঘ্রাণে একদা তাঁর মন বিমর্ষ হতো!
তা কল্যাণপুরে হোক বা না হোক, জন্ম তাঁর কোলকাতায় হলেও কর্ণাটকের এই কন্যার বেড়ে ওঠা ঢাকায়, মিশনারী স্কুলের ছাত্রী ছিলেন এখানে। ভাইবোনদের ভিতর সবার বড়, সবকয়টি বোন গাইতে ভালোবাসতেন, সুমন তখন গাইতেন সুরাইয়ার ঢঙে। বাবা বড় চাকুরে। ছোট্টবেলায় রাইচাঁদ বড়াল, কে সি দে, সায়গল আর কানন দেবীর গানের গভীর প্রভাব পড়েছিল তাঁর মনে। মুম্বাইয়ে চলে যাবার পর তিনি রাগসঙ্গীতে দীক্ষা নিলেন, রেয়াজ শুরু হলো। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে আর্টস্কুলে ভর্তি হলেন- তার্পিন তেলে অ্যালার্জি ধরলো। পনেরো বছর বয়স অব্দি সিনেমার কোনো গান শোনেননি সুমন। তবে কলেজে নাকি সুমন শখের বশে নুরজেহান আর লতার গান গাইতেন। পরিবারের বাধার বিপরীতে গায়িকা হিসেবে গাইতে শুরু করলেন। বিয়ের পর প্রতিদিন স্বামী তাঁকে রেয়াজের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন- পাশে বসে শুনতেন- রেয়াজের ব্যস্ততায় না পারলে স্বামী চা-জলখাবার বানাতেন, প্রতিটি রেকর্ডিং-এ আগে বাবা যেতেন- বিয়ের পরে স্বামী সঙ্গে যেতেন, কে জানে সন্ধ্যা-আরতির মতো তিনিও স্বামীর তদারকির গহীন ছায়ায় থেকে শিল্পীজীবন কাটিয়ে গেছিলেন কিনা। ফিল্মফেয়ারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন- স্বামী তাঁর গানকে বলতেন- আমাদের গান (হামারা গানা)। আরেক সাক্ষাৎকারে মৃদুভাষিনী সুমন বলেছিলেন-বিয়ের পরপরই গান শেখা বন্ধ হয়ে গেল একান্নবর্তী পরিবারে থেকে সেটা সম্ভব নয় বলে। গান গাইতে এসে অস্বস্তি তো তাঁর হতোই, চারজন বড় জা আর দুজন দেবরের বউ- এঁরা সব্বাই সংসার সামলাতেন, এঁদের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে গাইতে হতো, সেই জমানায় গান তো আর সবাই গাইতো না! নাচ-গানের সঙ্গে ভদ্রপরিবারের সংশ্রব থাকতে পারে না এমনটাই ভাবা হতো। কোনোমতে গান রেকর্ড করেই ফিরে আসতেন সংসারে, কখনো সিনেমায় কোন নায়িকার গলায় তাঁর গলা কেমন ফুটলো সেটা দেখবার ফুরসত অব্দি পেতেন না।
হিন্দি সিনেমায় প্রথম গান তাঁর ১৯৫৪তে, ডুয়েট গেয়েছিলেন তালাত মেহমুদের সঙ্গে। তালাত মেহমুদই প্রধান অতিথি হিসেবে একটি কনসার্টে এসে তাঁর গান শুনে তাঁকে এইচএমভিতে পরিচয় করিয়ে দেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে ওপি নাইয়ার তাঁকে তিনটি গান রেকর্ড করিয়ে 'মঙ্গু' সিনেমায় একটি কেবল রাখলেন- বিভোর গলার একখানা লোরি। ভেবে দেখুন সুমনজী যখন এলেন গান গাইতে তখন আশা কেবল আশার আলো দেখছেন, লতা মঙ্গেশকর আগের বছর 'আনারকলি', 'দো বিঘা জমিন' বা 'আহ'-এর জবরদস্ত গানগুলো গেয়ে ফেলেছেন, 'নাগিন'-এ তাঁর গাওয়া "মন ডোলে মেরা তন ডোলে"র সঙ্গে দুলছে সারা ভারতবর্ষের প্রাণ। সেই ঘনঘোর ঝঞ্ঝাবহুল রাতে ফুটছেন আরেকটি পুষ্প, তিনি সুমন কল্যাণপুর। সুমন অর্থ তো ফুল। তাঁর কন্ঠ শুনে চমকে গেল দেশ, প্রকৃষ্ট সঙ্গীতশিক্ষার ছাপ গলায়, উচ্চারণ মুক্তোদানার মতো স্পষ্ট। ধীরে ধীরে তিনি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলেন।
এখানে আব্বার কথা আরেকটু বলি? ফাইনাল পরীক্ষার আগে একবার আমরা স্কুল থেকে গেছি ময়নামতি। ফিরে এসে ক্লান্ত শরীরে শুয়েছি, আব্বা এনে দিল এইচএমভি থেকে লতা মঙ্গেশকরের শ্রদ্ধাঞ্জলি। প্রথম গানটি কান জুড়ানো- সো যা রাজকুমারী। তদ্দিনে আমি মূল গায়কদের প্রায় সব্বার গলায় ওসব গান শুনেছি, ফলে গীতিগুচ্ছের চমক ছাড়া আর কিছু নেই ওতে। আরো পরে মনে হয়েছিল, লতা শ্রদ্ধাঞ্জলি দিচ্ছেন কাদের? শুধু পুরুষদের। সুরকাররা সবাই পুরুষ বুঝলাম। সহগায়করা শ্রদ্ধার যোগ্য, সহগায়িকারা নন? আর মরে যাবার পরে অঞ্জলি দিয়েই বা লাভ কি! নুরজেহান কিংবা শামসাদ বেগম যদিও তখনো বেঁচে, গীতা দত্ত তো নেই। রেকর্ডের দোকান থেকে গভীর নিপুণতায় বেছে বেছে আব্বা সুমন কল্যাণপুর, গীতা দত্ত, শামসাদ বেগম এমন সব গায়িকার আলাদা আলাদা ক্যাসেট করিয়ে আনতেন, যাঁরা লতার জ্যোতির্বলয়ের বাইরের, এই গায়িকারা কি পুষ্পাঞ্জলির যোগ্য নন? যাক গে, পুষ্পের (সুমনের) দুর্ভাগ্য এই যে লতার প্রসঙ্গ আসবেই, আমিও তার ব্যতিক্রম হলাম কই!
বড় চড়াই-উৎরাই প্লেব্যাকের পথে, এসডি বর্মন- নৌশাদ- মদনমোহন- শঙ্কর জয়কিষেন- সলিল…সুরকাররা সব্বাই লতা বলতে অজ্ঞান, ওপি নাইয়ার আশা-প্রেমে মত্ত। পুরুষতান্ত্রিক সুরের পৃথিবী, পুরুষ সুরকার কাকে বাছবেন তার উপর ভিত্তি করে গায়িকার উত্থান-পতন—"ইসকো মিটানা উসকো বানানা ইস নগরীকি রীত, গাও খুশিকে গীত" মজরুহ সুলতানপুরী যেমন লিখেছিলেন। সুমন প্রথম ব্রেক পেলেন এসডি বর্মনের সুরে গেয়ে। জয়কিষেনজী কথা দিয়েছিলেন, তাঁর প্রতিটি সিনেমায় অন্তত একটি গান তিনি সুমনকে দেবেন, সেই প্রতিজ্ঞা তিনি রেখেছিলেন। সুর-তাল-লয়ে সুমনজী কখনো নিজেই দক্ষ বেদেনী, কখনো বিষবৈদ্যের সুরভোলা সর্পিনী। মুহম্মদ রফি- এসডি বাতিশের সঙ্গে মিলে রাগ আদানায় "মনমোহন মনমেঁ হো তুমহি"তে রেয়াজে বসা শুভ্রবসনা নন্দার লিপে তিনি একরকম, "আজকাল তেরে মেরে পেয়ারকে চর্চে হর জবানপর"-এর পশ্চিমা টিউনে মুমতাজের উচ্ছ্বল নৃত্যে আরেকরকম- আজো শুনলে মনে হবে গানটার রঙ মুমতাজের পোশাকের মতো ফিকে কমলা। এই খলনায়িকার গলায় তিনি চপলা, পরক্ষণে নায়িকার গলায় তিনি মেদুর-বিধুর। "তুমসে ও হাসিনা" বা "তুমনে পুকারা অওর হাম চলে আয়ে" একরকম, আবার "না তুম হামেঁ জানো" বা "পর্বতোঁ কে পেড়ঁ-পর শাম কা বসেরা হ্যাঁয়" আরেকরকম। সবটাই ভারী মানানসই। কেউ তাঁকে পরাস্ত করতে পারবে না (অন্তত ন্যায়যুদ্ধে) এমনি সুমন কল্যাণপুরের গলা- যেমনি নরম তেমনি তেজী, তেমনি মিষ্টি, তেমনি ভাবের দ্যোতনায় বাঙ্ময়। লতাকন্ঠী বলে বদনাম আছে বটে, কান পেতে শুনলে লতা-তীত কিছু পেয়ে যাবেন একান্ত শ্রোতা। এমন প্রতিযোগী লতা কখনো পাননি। এ যেন সুপারম্যানের সামনে ক্রিপ্টোনাইট, যে গ্রহে তাঁর জন্ম সেই গ্রহের পাথরেই তাঁর পরাভবের তেজস্ক্রিয় ইন্ধন রয়েছে।
ত্রিভূবনদর্শী মায়া আয়না যে অন্য নাম বলছে, রাণী উদ্বেগে বিগতনিদ্র হলেন কি? কে জানে! লতাজী নিজে চিরদিন অপরাপর গায়িকার ক্যারিয়ার নস্যাৎ করার চক্রান্তে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করেছেন ("কে কী গুজব ছড়াচ্ছে তা খন্ডনের সময় কোথায় আমার, পূজার সময় চলে যায়—সেসব ছেড়ে গুজব খন্ডাতে যাবো কেন!"), সুমন কল্যাণপুরও সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন- ওসব নেহায়েত গুজব, লতার প্রতি তিনি আগের জন্মের আত্মিক যোগাযোগ বোধ করতেন, সরস্বতীর কাছে হয়তো তাঁরা একত্রেই প্রসাদ নিতে গেছিলেন- তাই আধখানা করে একই প্রসাদ জুটেছে, এমনটাই তাঁর বিশ্বাস। কিন্তু বাণী জয়ারাম, হেমলতা, আরতি, শারদা, এমনকি হালের অনুরাধা- অলকার ক্যারিয়ারের বেলাতেও ঘুরেফিরে কেন এসেছিল লতা মঙ্গেশকরের নাম? ভুলে গেলে চলবে না, এই ইন্ডাস্ট্রি কাস্টিং কাউচের মতো নোংরামোকেও চমৎকার আড়াল করতে জানে চিরদিন। আর অন্যায় সমর ছাড়া কি আর একচ্ছত্র সাম্রাজ্য বাড়ে, না দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে! সুমনকে দিয়ে গাওয়ালে লতা সেই নির্দেশক-নির্মাতার কোনো সিনেমায় গান গাইবেন না এমন কথাও বলেছেন বলে শোনা যায়। কে জানে কোনটা সত্য, আমরা তো বড় হয়েছি রুনা লায়লাকে দিয়ে দিলে ভারত ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেবে এমন সব আজব গল্প বিশ্বাস আর বিতরণ করে। হেমন্তকুমারের সুরে "কাভি আজ কাভি কাল কাভি পরশু" ছাড়া লতা আর সুমন কখনো একত্রে আর কোনো গান করেননি, এ গানটিতে দুজনের গলা আলাদা করাই মুশকিল। হেমন্তকুমার তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন, নিজের মতো করে গাইবে, লতার পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না, আর হাইপিচে গাইবার সময় সীমা রেখো। লতার চেয়ে সুমনের চার্জ কম, ডেট সুলভ, অথচ গলার কারুকাজ একই মানের—ফলে সুমনের দিকে নির্মাতারা ঝুঁকছিলেন তো। 'সাথী' সিনেমায় নৌশাদ তিনটি চমৎকার সলো গাওয়ালেন লতাকে দিয়ে, লতার ডেট না পেয়ে মুকেশের সঙ্গে একটি মর্মবিদারী ডুয়েট শুধু সুমনকে দিলেন- "মেরা পেয়ার ভি তু হ্যাঁয়", ভাগ্যক্রমে ঐ গানটিই সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় গান হয়ে উঠলো। কল্যানজী আনন্দজী মুকেশ-লতা ডেট না পেয়ে "আপ সে হমকো বিছড়ে হুয়ে" গাওয়ালেন মানহার উদাস আর সুমন কল্যাণপুরকে দিয়ে, সে গানও অত্যন্ত জনপ্রিয় হলো। কল্যাণজীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- এ গান সুমন পেলেন কী করে? তিনি জবাব দিয়েছিলেন- কেমন করে পেলেন সে কথা জরুরী নয়, পেয়ে সুমন সে গানকে কোন স্তরে নিয়ে গেলেন সেটা জরুরী।
এসডি বর্মনের সঙ্গে রিরেকর্ডিং নিয়ে লতার মনান্তরের সময় তিনি বাছলেন কাকে? সুমনকে। কে গাইলেন- "না তুম হামে জানো"? হায়, লোকে জানতে পেলো না এটা লতার গান নয়, লিরিকের কী আশ্চর্য ভেলকি। রফি-লতার অবনিবনার বছরগুলোয় চুটিয়ে মুহম্মদ রফির সঙ্গে সুমন প্লেব্যাক করলেন। রফি-লতায় সমঝোতা হয়ে যাবার পর 'গজল' সিনেমায় লতা আর সুমন গাইলেন- "উনসে নজরে মিলি অওর হিজাব আ গয়া", রিলিজ হলো, কিন্তু কিছুকাল পর দেখা গেল সুমনজীর কন্ঠ সিনেমায় নেই, আছে মীনু পুরুষোত্তমজীর কন্ঠ। রেকর্ড করার পরেও সিনেমা থেকে সুমনের গান বাদ পড়তে থাকলো। হিন্দি সিনেমায় তিনি প্রায় ৯০০+ গান গেয়েছিলেন, এছাড়া বাংলা, ভোজপুরী, মারাঠি, রাজস্থানী, গুজরাটি, পাঞ্জাবিসহ তেরটি ভাষায় বহু গান গেয়েছেন। তবু দ্বিতীয় শ্রেণীতে রয়ে গেলেন, সলোর চেয়ে ডুয়েটে তাঁকে ব্যবহার করার ঝোঁক রয়ে গেল, ডুপ্লিকেটের বদনাম ঘুচলো না তাঁর। লতার মতো কন্ঠ হবার বরে বা অভিশাপে তাঁর পুরো প্লেব্যাক ক্যারিয়ার ছায়াচ্ছন্ন হয়ে রইলো। বড় বড় মিউজিক ডিরেক্টর 'পুওরম্যানস লতা' হিসেবে সুমনকে এড়িয়ে চলতে চাইলেন, এইচএমভির ক্যাসেট-সংকলনে সবচেয়ে বেশি গান থাকা সত্ত্বেও কভার থেকে তাঁর ছবি গায়েব হতে লাগলো, উপস্থাপিকা তাঁর গানের গায়িকা হিসেবে প্রমাদবশতঃ লতাজীর নাম বলতে লাগলেন, রেডিওতে- দূরদর্শনে ভুল ঘোষণা দেয়া হলো। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গানের গুচ্ছে তিনি থাকলেন না। মীনাকুমারীর 'পাকিজাতে'ও সুমন গেয়েছিলেন একটি গান- "গির গয়ি রে মেরে মাথেকে বিন্দিয়া", মূল সিনেমা থেকে বাদ পড়েছিল সে গানটি, মুজরার ঢঙে রচিত হলেও কেমন মেঠো টোন তাতে, ভারী মিষ্টি গেয়েছিলেন তিনি, শুনে আমার আরেকটি গানের কথা মনে পড়েছিল- "ঝনঝন ঝনঝন পায়েল বাজে ক্যায়সে যাউ পী-সে মিলনকো" ('বুঝদিল'-এ নিম্মির লিপে গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর)। "অ্যায় মেরে ওয়াতানকে লোগোঁ" গাইবার কথা সুমনের, রিহার্সাল হয়ে গেছে, কার্যক্রম শুরু হবার আগে উপস্থাপিকা নাম করলেন লতার। একসময় তাঁর মনে হলো, এত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে কী লাভ! সরে এলেন। মহারাষ্ট্র সরকার তাঁকে ২০১০ সালে লতা মঙ্গেশকর পুরস্কারে ভূষিত করলো। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় একদা লিখেছিলেন- "তিমি মৎস্যই যে পৃথিবীর বৃহত্তম জীব, এ বিষয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিরা একমত। আমি কিন্তু নিতান্ত অজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও বলিতে পারি যে, তিমিঙ্গিল নামধারী আর একটি অতি বৃহদায়তন জীব আছে যাহারা তিমি মৎস্যকে গিলিয়া খায়।" লতাজী আর সুমনজী কখনো সুরসাগরের দুই তিমি হতে পারলেন না, লতা তিমিখেকো তিমিঙ্গিল হয়ে রইলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একবার সুমনজীকে নিয়ে শিরোনাম করলো- 'অন্য লতা এবং তাঁর প্রায়-বিখ্যাত ক্যারিয়ার'। (অন্য লতা শুনলে কেমন শূন্যলতার সঙ্গে মিল মনে হয়। সুবোধ ঘোষের ছোটগল্পের সেই মেয়েটির কথা মনে আছে তো, 'সুজাতা', লোকের সামনে যাকে সর্বদা পরিচয় করিয়ে দেয়া হতো—মেয়েটি আমাদের 'মেয়ের মতো', অর্থাৎ মেয়ে নয়।) লতাজী ভারতবর্ষের রত্ন, অথচ যাঁকে বাদ দিলে হিন্দি প্লেব্যাকের সমস্তটাই শ্রীহীন হয়ে উঠবে সেই মুহম্মদ রফি কেবল শ্রী, রত্ন না হোন- সুমন কল্যাণপুর তবুও তো ভূষণ অব্দি গেছেন।
এইচএমভির শারদ অর্ঘ্যে তিনি আপন জ্যোতিতে অম্লান, এক গভীর প্রসন্নতা তাঁর টোল-ফেলা হাসিতে। হেমন্তকুমার (মুখার্জি) তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বাংলা গানে। সুধীন দাশগুপ্ত- নচিকেতা ঘোষের মতো সঙ্গীতকার তাঁকে নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর বাংলা গানের সম্ভার সমৃদ্ধ। 'মনিহার'-এ "দূরে থেকো না", 'কৃষ্ণভক্ত সুদামা'য় "তোরা হাত ধর" এমনি সব প্লেব্যাক করেছেন বাংলা সিনেমায়। "আমার স্বপ্ন দেখার দুটি নয়ন" রীতিমতো হন্টিং মেলোডি, এ গান রেকর্ড করতে গিয়ে কেঁদেছিলেন তিনি, এতে যে তাঁর জীবনের আদর্শ লেখা আছে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় শুনে খুব প্রশংসা করেছিলেন তাঁর। "বাদলের মাদল বাজে", "আকাশ অজানা তবু", "কাঁদে কেন মন আজ", "দুরাশার বালুচরে", "পায়ের চিহ্ন নিয়ে" এমনি কত গান। অত চনমনে সুরের পরেও "মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে। কৃষ্ণচূড়ার বন্যায় চৈতালি ভেসে গেছে" কি ভীষণ বিষন্ন। সুমন একটি বাংলা গান গেয়েছিলেন "শুধু স্বপ্ন নিয়ে খেলা চলেছে", লিরিকের একাংশ তাঁর জীবনে সত্য- "সে যে লতার বাঁধন কেটে সারাদিন মনে মনে মুক্তির কথা আজ ভেবে চলেছে"।
ষাটের দশকে সারা পৃথিবীময় কনসার্টে গাইতে যাবার রীতির সূচনাশিল্পী সুমন কল্যাণপুর, একে একে বত্রিশটি শহরে ঘুরেছেন গান নিয়ে। মা মারা যাবার খবর তাঁর কাছে পৌঁছতে দেননি স্বামী, তখন সুমন কানাডায় শো করছিলেন। পরে যখন জানতে পারলেন, সুমন পৃথিবীময় মঞ্চে শো করা তো বটেই, গানই গাওয়া বন্ধ করে ফেললেন কিছুদিনের জন্য। একসময় তিনি প্লেব্যাকের ভ্রষ্ট দুনিয়াকে বিদায় জানিয়ে একান্ত শিল্পসাধনার একটি জীবনে পাড়ি জমালেন- সেখানে ছবি আঁকা আছে, পশম বোনার আর ক্রুশকাঁটার কাজ আছে, রান্নাবান্নাসহ সংসারের অজস্র কাজ আছে যাতে তিনি পারদর্শী (পারদর্শিতার কথা নিজমুখে স্বীকার করতে গিয়ে লজ্জা পেয়েছিলেন তিনি)। বঞ্চনার বিপরীতে একটি শব্দ নেই, ভাগ্যবিপর্যয় নিয়ে হাহাকার নেই। আশির দশকে শেষ প্লেব্যাক গেয়েছিলেন যে গানে তার লিরিক খেয়াল করুন- "জিন্দগি ইমতেহান লেতি হ্যাঁয়, লোগোঁকে জান লেতি হ্যাঁয়"। 'মমতা' মুভিতে প্রাণ ঢেলে গেয়েছিলেন- "রহে না রহে হাম মেহকা করেঙ্গে বনকে কলি বনকে সাবা বাগ-এ ওয়াফা মেঁ"। সেই আশ্বাস বুকে পুষেই হয়তো নিভৃতে চলে গেলেন, বড় অসময়ে। বলতেন- টকঝাল খেতাম ঠিকই, আইসক্রিমে কখনো হাত দিইনি আশির দশকের আগে, এখন এর স্বাদ উপভোগ করি- মন্দ কি! প্রায় পঁচিশ বছর পর সাক্ষাৎকারে আমিন সায়ানি প্লেব্যাক ছাড়বার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি অত্যন্ত সুমন-কায়দায় শুধু বললেন- "অত ব্যক্তিগত কারণ তো এভাবে বলতে পারিনে, তাতে আমার আপত্তি আছে।" ৮৯ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত রোগে চলে গেলেন সুমন কল্যাণপুর, শেষের দিকে নাকি দিন কাটাতেন নিজের রেকর্ড করা গান শুনে শুনে। এ নিঃশব্দ শিল্পচারণ আমাকে মনে করিয়ে দেয় মার্লন ব্রান্ডো কিংবা মন্টগমারি ক্লিফটের শেষ বয়সের কথা, যৌবনের ছবি দেখে অশ্রুপাত করে বলেছিলেন- বড় সুন্দর ছিলাম তো! সদাবাহার জগতে চৈত্রের বৈরাগ্য তিনি, নির্বিবাদ-নিরপরাধ এক শিল্পী এক সাধিকা। যত তাঁর গান শুনেছি, পরে যত তাঁর শিল্পীজীবনের সংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, সুকুমার রায়ের অনূদিত একটি বিদেশী গল্পের কথা মনে পড়েছে- 'ভাঙা তারা'।
কিন্তু যা নিয়ে তিনি অবিস্মরণীয়- সে কথাই তো হলো না। তাঁর গলায় আমাদের প্রিয় গান। আমার কাছে "মনমোহন মন মে", "আজহু না আয়ে বালমা", "গর্জত বারসাত সাওয়ান আয়ো রে" এই তিন রাগাশ্রয়ী সঙ্গীতে তিনি তুলনারহিত, মদনমোহনের সুরে লতার কন্ঠে তরঙ্গিত "যা রে বাদরা ব্যায়রি"র কথা মনে পড়ে যায়- কি নিটোল একটি গান, যদিও সুমনের এ তিনটি রাগাশ্রয়ী গানের একটিও সলো নয়। "চলে যা চলে যা চলে যা যাহাঁ পেয়ার মিলে" (বহতা ঝর্ণার মতো সুর আরোপ করেছিলেন জয়কিষেনজী, ব্যক্তিগতভাবে সুমনজীর প্রিয় গান), "আগার তেরি জালওয়া নুমায়ি না হোতি", "দিল এক মন্দির হ্যাঁয়", "হ্যাঁয় না বোলো বোলো", সুবীর সেনের সঙ্গে "বাহারেঁ লুটাকে নাজারে দিখাকে", "আপনে হুজুর মুঝে কেয়া সে কেয়া বানা দিয়া", "বেজুবান দিল শোর না মাচা", "দিল নে ফির ইয়াদ কিয়া", আর অবশ্যই ঝনঝনে মঞ্জীরের মতো গলায় "না না করতে পেয়ার তুমহিসে কর বয়ঠে" এবং "আজকাল তেরে মেরে পেয়ারকে চর্চে"। হেমন্তকুমারের সুরে গীতা দত্তর সঙ্গে সুমনের "ফুলওয়া বন্দ ম্যাহকে" সত্যিই যেন ফুলে ফুলে ভরা ডালিতে বাতাসের প্রলাপ। সলিল চৌধুরীর সুরে "রুপসায়রের বুকে আলোর মালা দোলে"র সুরে "তুমহে দিলসে চাহা" কি চমৎকার গেয়েছিলেন সুমন। "শরাবি শরাবি ইয়ে শাওয়ানকা মৌসম"- মীনাকুমারীর লিপে, ওয়াহিদার লিপে হতাশাময় "বুঝা দিয়ে হ্যাঁয় খুদ আপনি হাথোঁ" আর নতুন জীবনের আগ্রহে ভরা "পর্বতোঁ কে পেড়ঁ পর" অপূর্ব। এসডি বর্মনের সুরে "ছোড়ো ছোড়ো মোরি বাইয়া শাম রে" আর "না তুম হামে জানো" শুনে মনে হয়- আহা এই গায়িকাকে নিয়ে বর্মনসাব তেমন কাজ করলেন না অথচ কী না করতে পারতেন! "ইয়ুহি দিল নে চাহা থা" শুনলে সত্যি মনের অজানা ব্যথা আর জীবনযাপনের ব্যথা উভয় ডুকরে ওঠে। মহানায়ক উত্তমকুমারের 'ছোটি সি মুলাকাত'-এ রফির সঙ্গে সুরে ও বাণীতে মর্মস্পর্শী ডুয়েট গেয়েছিলেন সুমন কল্যাণপুর- "তুঝে দেখা তুঝে চাহা"। সুমনজীর শেষকৃত্যে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির তেমন কোনো গায়ক-গীতিকার-সুরকারকে দেখা গেল না, কেবল সুরেশ ওয়াদেকর শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন। বিখ্যাত সুরকার সাজ্জাদ হুসেইনের মৃত্যুতে শিল্পীবিরল শোকসভায় যেমন খৈয়াম হাজির হয়েছিলেন। তাতে কি! যৌবনে সুমন কল্যাণপুর নিজেই গেয়ে গেছেন- "না মানো তো কোয়ি শিকায়াত নেহি, মাগার ইয়ে না কেহনা মুহাব্বাত নেহি!" অস্বীকার করো ক্ষতি নেই, তবু বোলো না যে ভালোবাসোনি।
