ব্যবসার ওপর চাপ কমাতে কর আপিলের জমার হার ব্যাপকভাবে কমানোর প্রস্তাব বাজেটে
দেশের আপিল ফোরামগুলোতে ৩৩ হাজারেরও বেশি কর মামলা আটকে থাকায় এবং এতে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূলধন আটকা পড়ায়, সরকার অবশেষে আঞ্চলিক মানদণ্ডের দিকে অগ্রসর হয়ে আয়কর ও ভ্যাট আপিলের জমার হার যথাক্রমে ১৪ শতাংশ এবং ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর ও ভ্যাট আপিলের জমার হার ব্যাপকভাবে কমানোর সরকারি সিদ্ধান্তকে ব্যবসায়ীরা স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ এতে তাদের প্রয়োজনীয় নগদ প্রবাহ বাড়বে বলে তারা মনে করছেন। তবে রাজস্ব বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জমার হার অতিরিক্ত কমে গেলে অনিচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘমেয়াদি মামলার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে।
২০১৮ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি কোম্পানির চার বছরের আর্থিক রেকর্ড অডিট করে ৯২৫ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ তোলে। কোম্পানিটি এই দাবি অস্বীকার করে ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং পরবর্তীতে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং যুক্তি দেয়, অডিটটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। তবে তাদের আপিল শুনানি শুরু হওয়ার আগেই কোম্পানিটিকে দুই কিস্তিতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা জমা দিতে হয়।
আট বছর পরও ওই বিরোধের কোনো সমাধান হয়নি। যদিও কোম্পানিটিকে এখনো কর ফাঁকির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি, তবে আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে থাকা মূলধন অর্থায়ন ব্যয় ও সুদসহ হিসাব করলে প্রায় ৪০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
কোম্পানিটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-কে বলেন, 'আপিলের জমা দিতে আমাদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছিল। মামলাটি এখনো চলমান এবং কবে এর নিষ্পত্তি হবে তা আমরা জানি না। এদিকে বিপুল পরিমাণ মূলধন আটকে আছে, যা নগদ প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করছে।'
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই পদক্ষেপের ফলে কোটি কোটি টাকার কার্যকরী মূলধন অবমুক্ত হবে, মামলা পরিচালনার খরচ কমবে এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে।
প্রস্তাবিত অর্থ বিল অনুযায়ী, কমিশনার (আপিল) থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত আয়কর আপিলের ক্ষেত্রে বিরোধপূর্ণ করের ওপর মোট যে ৩৫ শতাংশ জমা দিতে হতো, তা কমিয়ে ১৪ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একইভাবে, ভ্যাট ও শুল্কসংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে আপিল জমার হার ২০–৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের কর প্রশাসনে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হতে পারে, যা সৎ করদাতাদের জন্য আইনি লড়াইকে সহজ করে তুলবে।
ভ্যাট এবং শুল্ক বিরোধের ক্ষেত্রে মোট জামানত (ডিপোজিট) জমার হার ২০-৩০ শতাংশ থেকে আরও কমিয়ে মাত্র ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।
কর ট্রাইব্যুনাল পর্যায়ে জমার হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে, আর হাইকোর্টে আপিলের ক্ষেত্রেও আগের তুলনায় জমার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হবে।
কর প্রশাসনকে সহজ করা, কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা কমানো এবং ব্যবসা সহজীকরণ পরিস্থিতির উন্নয়ন করতে সরকারের নেওয়া একটি বৃহৎ সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ভ্যাট ব্যবস্থাকে করদাতাদের জন্য আরও সহজলভ্য করতে এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়াতে সরকার বড় ধরনের সংস্কার হাতে নিয়েছে।
তিনি বলেন, 'কর বিরোধ নিষ্পত্তির জটিলতা ও ব্যয় কমালে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ও মানসিক বোঝা কমবে, যা শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।'
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই সংস্কারকে ব্যবসায়ীরা স্বাগত জানিয়েছেন
বিভিন্ন ব্যবসায়িক চেম্বার এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন, বাংলাদেশে আপিল জমার হার এই অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ ছিল এবং এর ফলে করদাতারা অনেক সময় যৌক্তিক কারণ থাকা সত্ত্বেও আপিল বা আইনি লড়াইয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হতেন।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)-এর নির্বাহী পরিচালক টিআইএম নুরুল কবির এই সংস্কারকে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, 'এটি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অন্যতম ধারাবাহিক দাবি ছিল। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় কোম্পানিগুলোকে বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ মূলধন আটকে রাখতে বাধ্য হতে হতো। জমার হার কমানোর ফলে নগদ অর্থ প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।'
গ্রামীণফোনের ট্যাক্সেশন ও ফিসকাল কমপ্লায়েন্স প্রধান মো. রেজওয়ান বিন রফিক আয়কর এবং ভ্যাট—উভয় আইনের অধীন আপিল জমার বাধ্যতামূলক হার কমানোর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত বিরোধগুলো প্রায়ই আইনি ফোরামে বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। আগের আপিল জমা দেওয়ার শর্তগুলো বিরোধ চলমান থাকা অবস্থায় করদাতাদের ওপর উল্লেখযোগ্য নগদ প্রবাহের চাপ সৃষ্টি করত।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রস্তাবিত এই হ্রাস একটি ইতিবাচক নীতিগত পদক্ষেপ, যা আপিল প্রক্রিয়ায় প্রবেশাধিকার উন্নত করবে, করদাতাদের আপিল করার আইনগত অধিকার প্রয়োগে সহায়তা করবে এবং আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামো গঠনে অবদান রাখবে।'
কর বিশেষজ্ঞরা এই সংস্কারকে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানালেও সতর্ক করেছেন, জমার হার কমে গেলে কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অযথা বিরোধ দীর্ঘায়িত করতে উৎসাহিত হতে পারে।
স্নেহাশীষ মাহমুদ অ্যান্ড কোং-এর পার্টনার স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, এই সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে করদাতাদের আচরণ এবং মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর।
তিনি বলেন, "এমন একটি সম্ভাবনা রয়েছে যে কিছু করদাতা কম জমা দেওয়ার শর্তকে ব্যবহার করে বিরোধ দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যেতে পারেন। ব্যবসায়ীদের উচিত নয় এই সংস্কারকে বৈধ কর পরিশোধ বিলম্বিত করার সুযোগ হিসেবে দেখা।'
তিনি আরও বলেন, 'সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপিল মামলাগুলো যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা।'
কর প্র্যাকটিশনারদের মতে, বর্তমানে কিছু মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে পৌঁছাতে ৭ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগের সমাধান করবে।
তিনি বলেন, 'পুঁজি ব্যবসার প্রাণ। কোনো কোম্পানিকে যখন মামলা শুনানির আগেই বছরের পর বছর বড় অঙ্কের অর্থ আটকে রাখতে হয়, তখন সেই অর্থ সম্প্রসারণ, উদ্ভাবন বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবহার করা যায় না। আপিল জমার হার কমানো আরও বিনিয়োগবান্ধব কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।'
তাসকিনের মতে, এই সংস্কার বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আরও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে।
যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বহু উন্নত অর্থনীতিতে করদাতারা বড় অঙ্কের অগ্রিম জমা ছাড়াই কর মূল্যায়নকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। এর বদলে কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিভিত্তিক প্রয়োগ, নিয়ম না মানলে শাস্তি এবং দ্রুত ও কার্যকরী বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।
কর নীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক কর ব্যবস্থা এখন উচ্চ জামানতকে আপিলের প্রতিবন্ধক হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সংস্কারের উদ্দেশ্য হলো রাজস্ব স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না করে ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
একজন কর্মকর্তা বলেন, 'উদ্দেশ্য হলো একটি আরও ন্যায্য আপিল প্রক্রিয়া তৈরি করা। অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ছাড়াই করদাতাদের কর মূল্যায়ন চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকা উচিত। একই সঙ্গে ভিত্তিহীন আপিল ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাও বজায় রাখা হয়েছে।'
ডিজিটালাইজেশন ও স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা হ্রাস
আপিল সংস্কারের পাশাপাশি, প্রস্তাবিত বাজেটে কর প্রশাসন আধুনিকীকরণ এবং স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা হ্রাসের লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে আয়কর রিটার্নের মতোই ইলেকট্রনিক ভ্যাট রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হবে।
সরকার ক্ষুদ্র করদাতাদের জন্য সহজ ভ্যাট রিটার্ন ফরম প্রস্তাব করেছে, যাতে সীমিত তথ্য ব্যবহার করে তারা অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করতে পারেন।
একই সঙ্গে কর কর্মকর্তা ও কমিশনারদের পূর্বে ব্যবহৃত স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা কমানোর বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এসব সংস্কার সম্মতি খরচ কমাতে, পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়াতে এবং করদাতাদের হয়রানি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলেছেন, কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা কমালে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অসংগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমবে।
