ফুটবলে সমর্থনের বাইরে: বাংলাদেশের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কে এগিয়ে কে, ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা?
আমার কর্মক্ষেত্রের দেয়াল ও পিলাওগুলোতে এখন ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার পতাকাই আধিপত্য বিস্তার করছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও বাজেটের সময়ে যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম বিনিয়োগ আর ব্যবসার নেতিবাচক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলত, এখন সেখানে আলোচনার শুরুটা হয় দলের খেলোয়াড় নির্বাচন, ট্যাকটিক্যাল বিতর্ক আর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ নিয়ে।
বাংলাদেশ মূলত ফুটবল পাগল এক দেশ। এ দেশের মানুষের দৈনন্দিন নীতি নির্ধারণী আলোচনায় অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার প্রভাব থাকলেও ফুটবল আবেগের জায়গায় তারা ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মধ্যে বিভক্ত।
কিন্তু স্লোগান, জার্সি আর বাড়তে থাকা এই উন্মাদনার মাঝে একটি প্রশ্ন নিরবেই উঁকি দেয়; বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী কে—ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা?
পরিসংখ্যান বলছে, বাণিজ্যের এই দৌড়ে পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ব্রাজিল। আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশ যতটুকু পণ্য আমদানি করে, ব্রাজিল থেকে করে তার প্রায় তিনগুণ। আর রপ্তানির ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও বড়; আর্জেন্টিনার তুলনায় ব্রাজিলে প্রায় আটগুণ বেশি পণ্য পাঠায় বাংলাদেশ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্রাজিল থেকে ২.৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কিনেছে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে ব্রাজিল বাংলাদেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম আমদানি উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার মোট আমদানিতে (৬৭.৩৩ বিলিয়ন ডলার) অংশীদারিত্ব ছিল ৩.৯০%।
বাংলাদেশ মূলত ব্রাজিল থেকে অপরিশোধিত চিনি, তুলা, সয়াবিন এবং শস্য আমদানি করেছে, যা এদেশের পোশাক শিল্প ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।
ব্রাজিলের এই বাণিজ্যিক আধিপত্যের কারণ মূলত দেশটির বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি। কেবল ফুটবল পরাশক্তিই নয়, এটি বর্তমানে বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম অর্থনীতি। লন্ডনের 'সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ' প্রকাশিত 'ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল ২০২৬' অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্রাজিলের জিডিপি ছিল প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, বিশ্বের ২৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের আমদানি মানচিত্রে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটি বাংলাদেশের ১৭তম বৃহত্তম আমদানি উৎস ছিল, যেখান থেকে আমদানি হয়েছে ৭৮৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য (অংশীদারিত্ব ১.২০ শতাংশ)। তাদের পাঠানো পণ্যগুলোও ছিল মূলত ভোগ্যপণ্য নির্ভর, বিশেষ করে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং শস্য।
এবার রপ্তানির দিকে নজর দেওয়া যাক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্রাজিলে ১৮৭.৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য বিক্রি করেছে বাংলাদেশ। রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে এটি বর্তমানে ২৭তম স্থানে থাকলেও এর প্রবৃদ্ধি বেশ আশাব্যঞ্জক। গত অর্থবছরে ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ২৬%, যার বড় অংশই ছিল তৈরি পোশাক—জার্সি, পুলওভার, শার্ট এবং ট্রাউজার।
আর আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে? সেখানে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ২১.৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের (৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলার) মাত্র ০.০৪% এবং তালিকায় দেশটির অবস্থান ৬৫তম।
বাংলাদেশের মানুষের ফুটবল কল্পনায় এই দুই দেশ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হলেও বাস্তবে দক্ষিণ আমেরিকার এই দুই জায়ান্ট দেশের মধ্যে একটি স্থিতিশীল ও মজবুত বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।
'অবজারভেটরি অফ ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটি'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্রাজিল আর্জেন্টিনায় প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যার বড় অংশই ছিল শিল্প ও উৎপাদনজাত পণ্য। এর মধ্যে শীর্ষে ছিল গাড়ি (২.১৯ বিলিয়ন ডলার), মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম (১.৩৩ বিলিয়ন ডলার) এবং পণ্যবাহী ট্রাক (৬১৭ মিলিয়ন ডলার)।
বিপরীতে, আর্জেন্টিনা ব্রাজিলে রপ্তানি করেছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা দুই দেশের অর্থনীতির মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রতিফলন। আর্জেন্টিনার শীর্ষ রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ছিল পণ্যবাহী ট্রাক (৩.০৭ বিলিয়ন ডলার), গাড়ি (২.১২ বিলিয়ন ডলার) এবং গম (১.১৫ বিলিয়ন ডলার)।
