বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি হত্যা অত্যন্ত দুঃখজনক, সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন: সালাহউদ্দিন
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, 'বিএসএফ কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট উদাহরণ।'
আজ বুধবার (১৭ জুন) জাতীয় সংসদে সরকারি দলীয় সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মণির (সংরক্ষিত আসন-১০)- এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'সীমান্তে বিএসএফের প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনায় বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে এবং কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে জবাবদিহি ও ক্ষতিপূরণের দাবি অব্যাহত রেখেছে।'
তিনি বলেন, 'সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফ প্রধানদের বৈঠকে এ বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ।'
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, 'সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত বাংলাদেশিদের পরিবারের জন্য ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা বা আনুষ্ঠানিক চুক্তি নেই।'
তিনি বলেন, আত্মরক্ষার অজুহাতে বিএসএফের প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বারবার কঠোর আপত্তি জানিয়েছে।
এই আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ এসব ঘটনার ক্ষতিপূরণ ও জবাবদিহির বিষয়ে পরোক্ষভাবে চাপ অব্যাহত রেখেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দুই দেশের সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনার অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ধারাবাহিক কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রচেষ্টার ফলে ভারতীয় পক্ষ থেকে কিছু ইতিবাচক অঙ্গীকার পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের চাপের মুখে বিএসএফ একাধিকবার প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করে বরং সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অপ্রাণঘাতী পদ্ধতি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তে মৃত্যু কমাতে এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকায় রাতের যৌথ টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে, যাতে নজরদারি বাড়ে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়।
মন্ত্রী সংসদকে আরও জানান, কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে সীমান্তে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তাৎক্ষণিক সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, 'সীমান্তে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেই সংশ্লিষ্ট কমান্ডারদের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ফ্ল্যাগ মিটিং আহ্বান করা হয়, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং উত্তেজনা না বাড়ে।'
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তে নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগকে অগ্রহণযোগ্য বলে আসছে এবং সীমান্ত 'হত্যা শূন্য নীতি' গ্রহণের জন্য ভারতকে বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
এদিন সংসদে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবদুল মালিকের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ৩৬টি পুশ-ইন চেষ্টা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ব্যর্থ করেছে।'
তিনি বলেন, '২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ জুন পর্যন্ত সময়ে বিএসএফ মোট ২ হাজার ৩৬৯ জনকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে। এদের মধ্যে ২ হাজার ১৭৫ জনকে স্থানীয় থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে, ১১ জনকে বিএসএফের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং ১৮৩ জনকে সীমান্তেই প্রতিহত করে ফেরত পাঠানো হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, '২০২৫ সালের মে থেকে নভেম্বরের মধ্যে সীমান্তে অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আরও ২ হাজার ৮৬০ জনকে গ্রহণ করা হয় এবং পরে তাদের স্থানীয় থানার কাছে হস্তান্তর করা হয়।'
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে বিজিবি-বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে নিয়মিতভাবে বিষয়টি উত্থাপন করে আসছে বাংলাদেশ।'
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ বারবার বিএসএফকে প্রাণঘাতী অস্ত্রের পরিবর্তে অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।'
মন্ত্রী বলেন, 'গত এক বছরে উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিজিবি ১ হাজার ৯৭৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য জব্দ করেছে। সীমান্ত এলাকায় গত এক বছরে পরিচালিত ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫১৯টি মাদকবিরোধী অভিযানে ১ কোটি ৮৩ লাখ ৭৭ হাজার ৪৩৬টি ইয়াবা ট্যাবলেট, ৫৫ হাজার ৯০৮ বোতল ফেনসিডিল, ১৮ হাজার ৪৬৩ কেজি গাঁজা এবং ১ লাখ ৬ হাজার ৭০৯ বোতল বিদেশি মদ আটক করা হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'এছাড়া বিজিবি ১৫.৭৭ কেজি ক্রিস্টাল মেথঅ্যামফেটামিন (আইস), ২.০৮ কেজি কোকেন এবং ৬২ বোতল এলএসডি উদ্ধার করেছে।'
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, 'এসব অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ২ হাজার ১৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৯১৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।'
