ট্রাম্প-মোদি বৈঠক কি ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েনে থাকা সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারবে?
গ্রুপ অব সেভেন (জি৭) শীর্ষ সম্মেলনে আগামী বুধবার মুখোমুখি বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ওমান উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহ পর হতে যাওয়া এই বৈঠক দুই দেশের মধ্যকার চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও টানাপোড়েনের সম্পর্ককে আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদি হয়তো সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইছেন, তবে তার জন্য এই কাজ অত্যন্ত কঠিন হবে। কারণ, ইরান যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া ভারতের পক্ষ থেকে যেকোনো আপত্তি বা অভিযোগ জানানো হবে এমন এক পরাশক্তির বিরুদ্ধে, যা নিজে এই যুদ্ধ শুরু করেছে এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে ভারতের প্রতি চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে।
রুশ তেল কেনার অপরাধে গত আগস্টে ভারতের ওপর ট্রাম্পের শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের পর ভারত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছিল। এর ওপর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অশোধিত তেল আমদানিতে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ও কড়াকড়ি আরোপের ফলে তেল আমদানিকারক দেশ ভারত বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে। দুই দেশের একটি কাঙ্ক্ষিত বাণিজ্য চুক্তিও এখনো অধরা রয়ে গেছে।
ওমান উপসাগরে নাবিকদের মৃত্যুর ঘটনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আশাও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। গত সপ্তাহে ওমান উপসাগরে ইরানের নৌ-অবরোধ লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কারে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত ও বেশ কয়েকজন উদ্ধার হন। এই ঘটনা ভারতে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
আগামী বুধবারের এই প্রত্যাশিত বৈঠকটি হবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর এই দুই নেতার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। সে সময় ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ উপলক্ষে অভিনন্দন জানাতে ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন মোদি। তখন দুই নেতার মধ্যে উষ্ণ হৃদ্যতা দেখা গিয়েছিল।
তবে গত ১৬ মাসে ট্রাম্পের খামখেয়ালি ও আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং মার্কিন বাজার উন্মুক্ত করার একতরফা চাপ ভারতের স্বার্থকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিক্ষার্থী ও কর্মীদের ওপর কঠোর অভিবাসন নীতি আরোপের ফলে ভারতের অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল।
ইউএস-ইন্ডিয়া বিজনেস কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট এবং ভারতে মার্কিন দূতাবাসের সাবেক চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স অতুল কেশপ বলেন, 'দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে গত ২৫ বছরের যে ঘনিষ্ঠতা ও মেলবন্ধন ছিল, তা একটা স্থবিরতার মধ্য দিয়ে গেছে এবং এখন তা ভিন্নমুখী বা দূরত্ব তৈরির দিকে ধাবিত হতে পারে বলে যৌক্তিক উদ্বেগ রয়েছে।' তিনি দুই দেশের চিরন্তন বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা দীর্ঘায়িত না করে ডিজিটাল অর্থনীতি ও পারমাণবিক শক্তির মতো অভিন্ন স্বার্থের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।
গত বছর ট্রাম্পের বেশ কয়েকটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের পর ভারতের সঙ্গেও নতুন বাণিজ্য চুক্তি ঝুলে আছে। তবে সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফরের সময় সম্পাদিত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ চুক্তি (ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ডিল) সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ট কর্মকর্তা জানান, বুধবার দুই নেতার আলোচনায় বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি উঠতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত করলেও চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের মেয়াদ এখনো অনিশ্চিত। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই বৈঠকে চূড়ান্ত কোনো বাণিজ্য চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এছাড়া ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তিনি দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে মধ্যস্থতা করেছেন। মোদি বারবার ট্রাম্পের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য তার নাম সুপারিশ করতে অস্বীকৃতি জানান, যা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন বিরোধের জন্ম দেয়।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক হাডসন ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ অপর্ণা পান্ডে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কটি ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক।' তার মতে, চীনের মতো বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনর্গঠন করার মতো বড় কোনো সুবিধা ভারতের হাতে না থাকায়, ভারতের উচিত কিছুটা নমনীয় হওয়া।
মার্কিন হামলার ঘটনায় ভারতে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। ভারত সরকার দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের শীর্ষ কূটনীতিকের কাছে 'তীব্র প্রতিবাদ' জানালেও বিরোধী দলগুলো সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেছে। ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী মোদির নীরবতার তীব্র সমালোচনা করে তাকে ট্রাম্পের 'বাধ্য অনুগত সেবক' বলে কটাক্ষ করেছেন।
বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে সম্পর্কের এমন টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই নেতার আনুষ্ঠানিক সৌজন্যপূর্ণ আচরণ অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প মোদিকে ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, 'এবং তিনি একজন মহান নেতা!'
মোদিও প্রায়শই ট্রাম্পের প্রশংসা ফিরিয়ে দিলেও নেপথ্যে সম্পর্ক বেশ শীতল রয়েছে। গত জুনে কানাডায় অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প বৈঠক থেকে আগে চলে যাওয়ায় মোদি তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং ট্রাম্পের দেওয়া ওয়াশিংটন সফরের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। উল্লেখ্য, ভারত জি৭-এর স্থায়ী সদস্য নয়, তবে অতিথি রাষ্ট্র হিসেবে এই সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছে।
