ফেনী-৩ আসনের সাবেক সাংসদ ও ওয়ান-ইলেভেনের খলনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারের খবরে তার নিজ জেলা ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় আনন্দের বন্যা বইছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ফাঁসি দাবি করে বেশ কিছু পোস্ট ভাইরাল হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সর্বস্তরের জনতার পক্ষ থেকে আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
সোমবার (২৩ মার্চ) রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার ২ নম্বর লেনের ১৫৩ নম্বর বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর বাজারে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। এ সময় প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়ে সোনাপুর বাজারে সর্বস্তরের জনতার পক্ষ থেকে আনন্দ মিছিল করা হয়।
মিছিলটি বাজারের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জিরোপয়েন্টে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে তার ফাঁসি দাবি করে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন আমিরাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাজল হক সোহেল, উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল আউয়াল সজিব, যুবদল নেতা হাবিব উল্যাহ, এনামুল হক শাহীন, সারোয়ার হোসেন, নুর করিম সুমন প্রমুখ।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের সুলাখালী গ্রামের খোন্দকার বাড়ির মৃত নুর উদ্দিনের ছেলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মাসুদ উদ্দিন এক-এগারোর পর কথিত দুর্নীতিবিরোধী গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন। ওই বছরের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা-নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সামরিক কর্মকর্তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি।
জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পর্দার আড়াল থেকে জেনারেল মাসুদই যৌথ বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন। সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করত। পরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দেওয়া হতো। অনেক ক্ষেত্রে বিত্তশালী ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগও ছিল।
তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (পরে চার তারকা জেনারেল) মইন ইউ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে জেনারেল মাসুদই কার্যত সেই প্রভাবশালী কমিটি পরিচালনা করতেন, যার নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সিনিয়র রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষ অনেক ব্যবসায়ীও আটক হন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সে সময় গ্রেপ্তার করে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়েছিল।
সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে কথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে রাজনীতিকে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। ওই সময় তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের পর সামরিক গোয়েন্দা হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এমনকি হত্যাচেষ্টার অভিযোগও উঠে। নির্যাতনের একপর্যায়ে ওপরে তুলে শূন্য থেকে ফ্লোরে ফেলে তার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার কথাও সে সময় জানা যায়।
জেনারেল (অব.) মাসুদের তত্ত্বাবধানে কতিপয় অতিউৎসাহী কর্মকর্তা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আলোচিত এই সেনা কর্মকর্তা পারিবারিক সূত্রে খালেদা জিয়া পরিবারের আত্মীয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ভাই মরহুম সাঈদ ইস্কান্দারের ভায়রা ভাই তিনি। সেই সুবাদে খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে পদোন্নতি পান এবং গুরুত্বপূর্ণ নবম ডিভিশনের দায়িত্ব পান।
মঈন-ফখরুদ্দিন সরকারের দেড় বছরের মাথায় সেনাপ্রধানের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হলে ২০০৮ সালের জুনে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার করে পাঠানো হয়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও তাকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত ওই দায়িত্বে বহাল রাখে। ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনী গঠিত হলে তিনি ওই বাহিনীতে ছিলেন, পরে তাকে সেনাবাহিনীতে আত্তীকরণ করা হয়।
সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ২০১৮ সালে তিনি এইচএম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির মনোনয়নে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর জনশক্তি রপ্তানি, অভিজাত রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে কারসাজি ও বহু মানুষকে প্রতারিত করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় ফেনীর মহিপালে আওয়ামী অস্ত্রধারীদের গুলিতে অন্তত ১১ জন নিহত হন। ওই ঘটনার মামলাগুলোর অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন জেনারেল মাসুদ। তবে প্রায় দুই বছরেও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
অবশেষে সোমবার রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার ২ নম্বর লেনের ১৫৩ নম্বর বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে মানবপাচার, হত্যাসহ ১১টি মামলা রয়েছে।
এ খবরে স্বস্তি প্রকাশ করে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়েছেন সোনাগাজী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন বাবলু, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক খুরশিদ আলম ভূঞাসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের অসংখ্য নেতাকর্মী।
কেকে/এসএ