চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের বেলতলী এলাকার বদরপুরে চলমান ১০৭তম লেংটার মেলাকে ঘিরে মাদক, জুয়া ও অশ্লীলতার অভিযোগে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মেলার আশপাশসহ তিন থেকে চার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কয়েক লাখ লোকের সমাগম হয়েছে। মেলা এলাকায় অন্তত ৩ শতাধিক গাঁজার দোকান বসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার (১ এপ্রিল) মেলায় সরেজমিনে গিয়ে এই চিত্র দেখা গেছে।
মেলায় দেখা যায়, মাজারের পশ্চিম-উত্তর পাশে পুকুরপাড় ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে গাঁজার দোকান বসিয়েছে পাগল ও ফকির পরিচয়ে আসা ব্যক্তিরা। দিনের বেলায়ই চলছে মাদক বিক্রি ও সেবন। আর রাত নামলেই মেলার বিভিন্ন স্থানে বসছে জুয়ার আসর, অশ্লীল গান-বাজনা ও নারী-পুরুষের একসঙ্গে নাচগানের আয়োজন।
এদিকে মেলার প্রথম দিন মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকালে লেংটার মেলায় মাজারের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে দুই গ্রুপের বিরোধ সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে বিরোধের জেরে মাজারের প্রধান খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়ার মাথায় দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে করে জখম করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছরই মেলাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের অনিয়ম হলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে। এবারের মেলায় জনসমাগম এতটাই বেশি যে পুরো এলাকা কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্কও ঠিকভাবে কাজ করছে না, ফলে যোগাযোগে ভোগান্তিতে পড়ছেন দর্শনার্থীরা।
পুকুরপাড়ে বসা একাধিক ফকির জানান, আমরা নিজেরা সেবন করি, তবে বিক্রি করি না। পুলিশের কারণে আগের মতো খোলামেলাভাবে বসা যায় না। সবসময় ভয়ে থাকতে হয়। পুলিশ এসে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা পয়সা চায়।
কুষ্টিয়া থেকে থেকে আসা মোকাব্বের আলী, জয়নব বেগম, দিলরুবা আক্তার ও মনজ্জুরুল হক ফকির জানান, আমরা প্রতিবছরই এখানে আসি। লেংটা বাবার দরবারে এসে জিকির-আজকার করি, গান-বাজনা করি। কেউ কেউ নেশা করে, তবে সেটা সবার জন্য নয়।
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা আশেকান নেয়ামত উল্ল্যা বলেন, ‘‘এই মেলা আমাদের জন্য আধ্যাত্মিক মিলনমেলা। আমরা মানত নিয়ে আসি। তবে কিছু লোকের কারণে পরিবেশ খারাপ হয়, প্রশাসন যদি কড়াকড়ি করে তাহলে ভালো হয়।’’
কুমিল্লা থেকে আসা ভক্ত রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমরা এখানে শান্তির জন্য আসি। কিন্তু মাদক আর জুয়ার কারণে অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। এসব বন্ধ হওয়া দরকার।’’
ফরিদপুর থেকে আসা রজ্জব আলী ফকির বলেন, ‘‘মতলবের শাহ সোলেয়মান লেংটা বাবার দরবারে আসা হয় ৪০ বছর ধরে। এ বছরই ব্যতিক্রম কিছু চোখে পড়লো। এখানে মাদক, জুয়া, আগেও ছিলো কিন্তু এবার নতুন করে বেশ কয়েকটি জায়গায় যোগ হয়েছে ভাসমান পতিতালয়। আল্লাহর ওলির দরবারের ওরশকে কেন্দ্র করে এগুলো বন্ধ করা উচিত।’’
শরীয়তপুর থেকে আগত গাফফার হোসেন ফকির বলেন, ‘‘এখানে আসলে মন ভালো হয়ে যায়। তবে যেগুলো খারাপ কাজ হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করলে মেলার পরিবেশ আরও ভালো থাকবে।’’
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, ঐতিহ্যবাহী এই ধর্মীয় আয়োজনকে ঘিরে যদি মাদক, জুয়া ও অশ্লীলতার মতো কর্মকাণ্ড বন্ধ না করা যায়, তাহলে এর সামাজিক প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
তারা দ্রুত প্রশাসনের কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘‘মেলায় বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পোশাকধারী পুলিশসহ সিভিল টিম কাজ করছে। মাদক ও জুয়ার বিষয়ে অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’’
কেকে/এসএ