এমএসসি পাস করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন শুধুমাত্র একটি চাকরির আশায়। কিন্তু ভাগ্যে জোটেনি সেই চাকরি। এরপর চাকরির আশা ছেড়ে নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। এক হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন বাড়িতে তৈরি করা খাবার বিক্রি। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। আজ তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। নিজে যেমন সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন, তেমনি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন আরও অনেক নারীর।
আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার এমন অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের গল্প পাবনার অনুজা সাহা এ্যানি’র। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আর দিবসটিতে এমন সফল মানুষের গল্প অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার। চাকরির পেছনে না ছুটে এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজ পায়ে দাঁড়ানো ও স্বাবলম্বী হওয়ার হাজারও গল্পে পাবনার অনুজা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তার দেখানো পথ ধরে আজ পাবনার অনেকেই ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার অমূল্য কুমার সাহা ও অঞ্জনা সাহার একমাত্র সন্তান অনুজা (৩৫)। ২০০৪ সালে এসএসসি পাস করার পর হঠাৎ করেই বিয়ে হয়ে যায় তার। কোলজুড়ে আসে একটি ছেলে সন্তান। স্বামী বিল্পব কুমারের ব্যবসায়ী অবস্থাতেও নেমে আসে মন্দাভাব। অর্থনৈতিক সংকটে সংসার জীবনে দিশেহারা হয়ে পড়েন অনুজা।
এর মাঝেই ২০০৬ সালে এইচএসসি এবং ২০১২ সালে এমএসসি পাস করেন তিনি। বিভিন্ন স্থানে চেষ্টা করেও জোটেনি একটি চাকরি। পত্র-পত্রিকায় দেশের বিভিন্ন স্থানের নারী উদ্যোক্তার গল্প পড়ে উদ্বুদ্ধ হন অনুজা। চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা করেন তিনি। মায়ের সহযোগিতায় এক হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে খাবারের হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালু করেন। তারপর থেকে ঘুরতে থাকে ভাগ্যের চাকা। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ১৪ বছরে আজ তিনি একজন সফল ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা। এই সময়ে তিনি আরও ৪০ থেকে ৫০ জন নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন।
বর্তমানে ধীরে ধীরে তার ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। পুঁজির পরিমাণও বেড়েছে। সংসার খরচ চালিয়ে, কর্মচারীদের বেতন দিয়ে মাস শেষে ভালো আয় করছেন তিনি। এখানেই থেমে নেই অনুজা। বিসিক, যুব উন্নয়ন, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এরমধ্যে ‘মায়ের পরশ নামের একটি রেস্টুরেন্ট করেছেন।
দরিদ্র মানুষের স্বল্প মূল্যে খাবার বিক্রি করে সবার কাছে পরিচিতিও লাভ করেছেন। আলাপকালে অনুজা বলেন, মা প্রথমে ব্যবসা করার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিলেন। সংসার জীবনের নির্মম বাস্তবতার কষাঘাতে মেয়ে যখন জর্জরিত, মা তখন সম্মতি দেন ব্যবসা করার। মা ছিলেন সুদক্ষ একজন রাঁধুনি। তার কাছে রান্না শিখে খাবারের হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালু করে বেশ পরিচিতি পাই। হোম ডেলিভারি সার্ভিস থেকে নানা ধরনের পিঠা, কেক, মিষ্টি, বেকারি আইটেম, সাদা ভাত, বিরিয়ানি সরবরাহ শুরু হয় পাবনার বিভিন্ন জায়গায়।
তিনি বলেন, গত ১৪ বছর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সবার দোয়া-ভালোবাসায় ব্যবসা করে যাচ্ছি। উদ্যোক্তা মেলা করেছি। নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছি, তেমনি আমার সঙ্গে এখন অন্তত দশজন শ্রমিক কাজ করে। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। ভবিষ্যতে ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাই। আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান করতে চাই। আর মেয়েদের বলব, কোনো কাজই ছোট নয়, ভয় পেয়ে বসে থাকলে চলবে না। পরিশ্রম করতে হবে, লেগে থাকতে হবে, তবেই সফলতা আসবেই।
অনুজার স্বামী বিপ্লব কুমার বলেন, আমার ব্যবসার অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় দু’জন দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। কী করব ভেবে পাইনি। তখন অনুজা সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবসা শুরু করে। প্রথমদিকে আমি ভয় পেয়েছিলাম, পারবে তো? ধীরে ধীরে ব্যবসা ভালো চলায় তার পাশে থেকে সহযোগিতা।
কেকে/ এমএস