মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,
২ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব      বাতিল হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের ‘বিশেষ সুবিধা’      ভারতের ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নতুন নির্দেশনা      ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এসএসসির ফল প্রকাশ: শিক্ষামন্ত্রী      দিল্লিতে রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করে দেশে ফিরলেন তথ্য উপদেষ্টা      দেশে ফিরেছেন ৫৬ হাজারের বেশি হাজি      
বেগম রোকেয়া
হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী বুলবুলি
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
ছবি: প্রতিবেদক

ছবি: প্রতিবেদক

একসময় ছিলেন গৃহিণী। সংসারের কাজ শেষ করে দিনের বেশিরভাগ সময় কাটত অবসরে। কিন্তু বসে থাকা তার স্বভাবে ছিল না। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমই আজ বুলবুলি বেগমকে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিণত করেছে। অলস সময় কাজে লাগিয়ে হাঁস পালন করে বুলবুলি মাসে আয় করছেন ৭৫ হাজার টাকা। 

বুলবুলির বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামে। উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে গ্রামটির কাঁচা-পাকা পথ ধরে যাওয়ার সময় অসংখ্য খামার চোখে পড়ে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আনাচকানাচ সবজি চাষ করা হয়েছে। বাড়ির পাশে খোলা জায়গায় সারি সারি হাঁসের খামার। সকালে পুকুর ও আশপাশের জলাশয়ে খাবারের খোঁজে ছড়িয়ে পড়ে হাজারো হাঁস। ডিম সংগ্রহ ও পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত গ্রামের মানুষ। 

বুলবুলির বাড়ি খুঁজতেই একজন দেখিয়ে দিলেন। বাড়ির পাশে খামারে ঢুকতেই দেখা গেল, বুলবুলি হাঁসের ডিম তুলতে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর খামার থেকে ডিমভর্তি খাঁচা নিয়ে বেরিয়ে এলেন। খামারের পাশে গাছের ছায়ায় বসতে দিয়ে দিনবদলের গল্প শোনান বুলবুলি।

বুলবুলি বেগম জানান, ২০০১ সালে এসএসসি পাসের পর তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর সংসারে এসে দেখেন মধ্যবিত্ত পরিবারের সীমিত আয়। সংসারের কাজ শেষ করার পর হাতে তেমন কোনো কাজ থাকত না। নিজের কিছু করার তাগিদ থেকেই হাঁস পালন শুরু করেন। 

তিনি জানান, ২০১০ সালের শুরুতে পানবাজার গ্রামে ননদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ওই গ্রামের এক গৃহবধূর কাছে হাঁস পালনের কৌশল শেখেন। এরপর স্বামীর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ির পাশে ঘর করেন। পরে ২০ হাজার টাকায় ৫০০ হাঁসের বাচ্চা কিনে খামার শুরু করেন। চার মাসের মধ্যে হাঁস ডিম দেওয়া শুরু করে। এক বছর ডিম বিক্রি করে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। তার আয় দেখে স্বামীও তার সঙ্গে যোগ দেন। ডিম বিক্রির টাকায় আরও এক হাজার হাঁসের বাচ্চা কেনেন। এভাবে তিনি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন।
 
বর্তমান বুলবুলির খামারে প্রায় তিন হাজার হাঁস আছে। হাঁসের ডিম ও হাঁস বিক্রি করে মাসে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে। শুধু হাঁসের খামারই নয়, পরিবারের জন্য দুটি পুকুর খনন করেছেন। সেখানে মাছ চাষের পাশাপাশি কৃষিকাজও করছেন। পাশাপাশি একটি ছোট দোকান চালান। সব মিলিয়ে এখন সচ্ছলতা ফিরেছে সংসারে। দুজন শ্রমিক তার খামারে কাজ করেন। আয়ের টাকায় জমি কিনেছেন। বাড়ি পাকা করেছেন। এলাকার অনেকে এখন তার কাছে পরামর্শ নিতে আসেন।

বুলবুলির শুরুর দিকটা অনেক কষ্ট ছিল। মানুষ হাসাহাসি করত। তিনি ভেবেছিলেন, বসে থাকলে কিছু হবে না। ধীরে ধীরে হাঁসের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। এখন নিজের আয় আছে। সন্তানদের ভালোভাবে পড়াতে পারছেন। এটাই সবচেয়ে বড় সুখ।

বুলবুলির স্বামী আবদুস সালাম বলেন, ‘বউ যখন হাঁস পালন শুরু করে, তখন ভাবিনি এত বড় হবে। কিন্তু ওর পরিশ্রম আর আগ্রহ দেখে আমি পাশে দাঁড়াই। এখন সংসারের বড় একটা অংশ তার আয়ে চলে। আমি তার জন্য গর্বিত।’ 

বুলবুলি নিজের সংসারে সচ্ছলতা আনার পাশাপাশি গ্রামের অন্য গৃহবধূর নানা পরামর্শ দেন। তার দেখাদেখি ইকরচালী ইউনিয়নের অনেক গৃহবধূ হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। শুধু নারীরা নন, গ্রামের অনেক বেকার তরুণও বুলবুলির দেখানো পথে হাঁস পালন করে বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন।

বালাবাড়ি গ্রামের সাইফুল ইসলাম একসময় বেকার ছিলেন। ধারদেনা করে চলতেন। বাবার কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা নিয়ে ঘর তুলে ৪০০ হাঁসের বাচ্চা কিনে খামার শুরু করেন। বর্তমান তার খামারে এক হাজার হাঁস আছে। খামারের আয় দিয়ে তিনি ৬০ শতক জমি কিনেছেন। 

সাইফুল বলেন, হাঁস পালন করে তার সুদিন ফিরে এসেছে। বুলবুলি বেগমের পরামর্শে হাঁস পালন করে অনেকের সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। হাঁসের খামার করে তার মতো আরও অনেকে দারিদ্র্যকে জয় করেছেন।

বালাবাড়ি গ্রামের গৃহবধূ ছাবিয়া বেগম বলেন, ‘দিনমজুর স্বামীর আয় দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। এখন বুলবুলির খামারে কাজ করি, বাড়িতে ২০০ হাঁস পালি। এসব দিয়ে তেল-সাবানের খরচ হয়ে যায়। সংসারে কোনো ঝামেলা নাই।’

ইকরচালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তাজউদ্দিন বলেন, বুলবুলি শিক্ষিত ও পরিশ্রমী গৃহবধূ। তার হাত ধরে ইউনিয়নের অনেকেই দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

তারাগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল বলেন, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে যে সীমিত সুযোগ দিয়েও সফলতা অর্জন করা যায়, হাজীপাড়ার বুলবুলি বেগম তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখন তিনি শুধু একজন গৃহিণী নন, একজন সফল উদ্যোক্তা। এলাকার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার নাম।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

বেগম রোকেয়া- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close